৭১ বছর বয়সে প্রয়াত প্রবীণ রাজনীতিক মুকুল রায় (Mukul Roy Passes Away)। গভীর রাতে সল্টলেকের বেসরকারি হাসপাতালে শেষ নিঃশ্বাস। মমতা বন্দ্যোপাধ্যায়, অভিষেক বন্দ্যোপাধ্যায় ও প্রধানমন্ত্রী নরেন্দ্র মোদীর শোকবার্তা ঘিরে রাজনৈতিক মহলে আবেগঘন পরিবেশ।

একসঙ্গে পথ চলার দিন। ফাইল ছবি।
শেষ আপডেট: 23 February 2026 11:56
দ্য ওয়াল ব্যুরো: বাংলা রাজনীতির আকাশে গভীর শোকের ছায়া। প্রবীণ রাজনীতিক মুকুল রায় প্রয়াত হয়েছেন (Mukul Roy Died)। বয়স হয়েছিল ৭১। রবিবার গভীর রাতে, প্রায় দেড়টা নাগাদ সল্টলেকের এক বেসরকারি হাসপাতালে শেষ নিঃশ্বাস ত্যাগ করেন তিনি। দীর্ঘদিন ধরে অসুস্থ ছিলেন। প্রায় দু’বছর হাসপাতালেই চিকিৎসাধীন ছিলেন এই বর্ষীয়ান নেতা। অবশেষে জীবনের লড়াই থেমে গেল নিঃশব্দে।
খবর ছড়িয়ে পড়তেই রাজনৈতিক মহলে নেমে আসে শোকের ছায়া। হাসপাতালের বাইরে জড়ো হতে থাকেন অনুরাগীরা। ছেলে শুভ্রাংশু রায় গভীর রাতে বাবার প্রয়াণের খবর নিশ্চিত করেন। তিনি জানান, কাঁচরাপাড়া থেকে কলকাতায় এসে পরবর্তী কর্মসূচি জানানো হবে।
সহযোদ্ধার বিদায়ে আবেগঘন মমতা
মুকুল রায়ের মৃত্যুতে গভীর শোকপ্রকাশ করেছেন পশ্চিমবঙ্গের মুখ্যমন্ত্রী মমতা বন্দ্যোপাধ্যায় (Mamata Banerjee)। তাঁর বার্তায় ব্যক্তিগত স্মৃতি ও রাজনৈতিক সহযাত্রার দীর্ঘ ইতিহাস উঠে এসেছে।
তিনি লিখেছেন, হঠাৎ এই মৃত্যুসংবাদ তাঁকে বিচলিত ও মর্মাহত করেছে। দীর্ঘদিনের সহকর্মী, বহু রাজনৈতিক সংগ্রামের সঙ্গী—এই পরিচয়েই তিনি মুকুল রায়কে স্মরণ করেছেন। তৃণমূল কংগ্রেসের প্রতিষ্ঠালগ্ন থেকে দল গড়ে তোলার ক্ষেত্রে মুকুলের অবদান ছিল অসামান্য, এ কথাও উল্লেখ করেন তিনি। কেন্দ্রীয় মন্ত্রী হিসেবে দায়িত্ব সামলানো থেকে শুরু করে সংগঠনের ভিত মজবুত করা, সব ক্ষেত্রেই তাঁর গ্রহণযোগ্যতা ছিল সর্বজনস্বীকৃত।
রাজনৈতিক পথচলায় মতভেদ এসেছে, ভিন্ন দলেও গিয়েছেন, আবার ফিরেও এসেছেন, তবু বাংলার রাজনীতিতে তাঁর সাংগঠনিক দক্ষতা ও অবদান অম্লান থাকবে বলেই মত মুখ্যমন্ত্রীর। ব্যক্তিগতভাবে শুভ্রাংশুকে উদ্দেশ করে তিনি সাহস রাখার বার্তাও দিয়েছেন এবং পরিবারের পাশে থাকার আশ্বাস জানিয়েছেন।
প্রবীণ রাজনীতিবিদ মুকুল রায়ের সহসা প্রয়াণের সংবাদে বিচলিত ও মর্মাহত বোধ করছি। তিনি আমার দীর্ঘদিনের রাজনৈতিক সহকর্মী ছিলেন, বহু রাজনৈতিক সংগ্রামের সহযোদ্ধা ছিলেন। তাঁর বিদায়ের খবর আমাকে বেদনাহত করেছে।
প্রয়াত মুকুল রায় তৃণমূল কংগ্রেসের প্রতিষ্ঠা-লগ্ন থেকে দলের জন্য প্রাণপাত…— Mamata Banerjee (@MamataOfficial) February 23, 2026
তৃণমূলের উত্থানে এক ‘ভিত্তিস্তম্ভ’
তৃণমূল কংগ্রেসের সর্বভারতীয় সাধারণ সম্পাদক অভিষেক বন্দ্যোপাধ্যায়ও (Abhishek Banerjee) তাঁর শোকবার্তায় মুকুল রায়কে দলের অন্যতম ভিত্তিস্তম্ভ হিসেবে উল্লেখ করেছেন। তাঁর কথায়, তৃণমূলের জন্মপর্ব থেকে সংগঠন বিস্তারে এবং রাজ্যের প্রান্তে প্রান্তে শক্ত ভিত তৈরি করতে মুকুলের ভূমিকা ছিল অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ।
দলের রাজনৈতিক উত্থানের যে অধ্যায় আজ ইতিহাসের অংশ, সেই নির্মাণপর্বে মুকুল রায়ের অবদান বিশেষভাবে স্মরণীয়—এ কথা উল্লেখ করে তিনি বলেন, জনসেবার প্রতি তাঁর দায়বদ্ধতা এবং দীর্ঘ অভিজ্ঞতা ভবিষ্যতেও শ্রদ্ধার সঙ্গে স্মরণ করা হবে। তাঁর প্রয়াণ রাজ্যের রাজনৈতিক পরিসরে এক অনিবার্য শূন্যতা তৈরি করল বলেও মন্তব্য করেন অভিষেক।
প্রধানমন্ত্রীর শোকবার্তা
মুকুল রায়ের মৃত্যুতে শোক জানিয়েছেন প্রধানমন্ত্রী নরেন্দ্র মোদী (Narendra Modi)। তিনি প্রাক্তন কেন্দ্রীয় মন্ত্রী হিসেবে মুকুল রায়ের রাজনৈতিক অভিজ্ঞতা ও সমাজসেবামূলক কাজের কথা স্মরণ করেন। পরিবারের সদস্য ও সমর্থকদের প্রতি সমবেদনা জানিয়ে তিনি প্রয়াত নেতার আত্মার শান্তি কামনা করেন।
শাসক-বিরোধী ভেদরেখা ভুলে একাধিক রাজনৈতিক ব্যক্তিত্ব তাঁর স্মৃতিচারণায় শামিল হয়েছেন। এতে স্পষ্ট, দলীয় বিভাজন থাকলেও ব্যক্তিগত সম্পর্ক ও রাজনৈতিক অভিজ্ঞতার প্রতি শ্রদ্ধা ছিল সর্বত্র।
রাজনীতির ‘চাণক্য’: উত্থান, বিতর্ক, প্রত্যাবর্তন
মুকুল রায়ের রাজনৈতিক জীবন ছিল ঘটনাবহুল। একসময় তিনি তৃণমূলের সেকেন্ড ইন কম্যান্ড হিসেবে পরিচিত ছিলেন। দল গঠনের প্রাথমিক পর্যায়ে সাংগঠনিক কৌশল নির্ধারণে তাঁর ভূমিকা ছিল গুরুত্বপূর্ণ। কেন্দ্রীয় মন্ত্রিত্বের দায়িত্বও পালন করেছেন তিনি।
তবে রাজনৈতিক পথচলায় আসে মোড়। ২০১৭ সালে রাজ্যসভার সাংসদ পদ থেকে ইস্তফা দিয়ে দিল্লিতে গিয়ে বিজেপিতে যোগ দেন। সেই সিদ্ধান্তে তোলপাড় হয় বঙ্গ রাজনীতি। পরবর্তী সময়ে ২০২১ সালের বিধানসভা নির্বাচনে কৃষ্ণনগর উত্তর কেন্দ্র থেকে বিজেপির প্রার্থী হয়ে জয়ী হন।
কিন্তু নির্বাচনের ফল ঘোষণার অল্পদিনের মধ্যেই, ১১ জুন, তিনি আবার পুরনো দল তৃণমূলে ফিরে আসেন। এরপর তাঁকে বিধানসভার পাবলিক অ্যাকাউন্টস কমিটির চেয়ারম্যান করা হলেও কিছুদিন পর পদত্যাগ করেন।
আইনি লড়াই এবং শেষ অধ্যায়
দলবদল ঘিরে তাঁর বিধায়ক পদ নিয়ে শুরু হয় আইনি টানাপড়েন। বিরোধী দলনেতা শুভেন্দু অধিকারী ও বিজেপি বিধায়ক অম্বিকা রায় দলত্যাগ বিরোধী আইনে তাঁর সদস্যপদ খারিজের দাবি তোলেন। স্পিকার সেই আবেদন খারিজ করলে বিষয়টি পৌঁছয় কলকাতা হাইকোর্টে। হাইকোর্ট বিধায়ক পদ খারিজের নির্দেশ দিলেও পরবর্তীতে সুপ্রিম কোর্ট মানবিক দৃষ্টিকোণ থেকে সেই রায়ে অন্তর্বর্তী স্থগিতাদেশ দেয়। ফলে মৃত্যুর সময় পর্যন্ত তিনি বিধায়ক হিসেবেই বহাল ছিলেন।
শেষ কয়েক বছর শারীরিক অসুস্থতার কারণে সক্রিয় রাজনীতি থেকে দূরেই ছিলেন তিনি। তবু তাঁর নাম ঘিরে আলোচনা থামেনি। কখনও কৌশলী সংগঠক হিসেবে, কখনও বিতর্কিত দলবদলের জন্য, কখনও বা আইনি লড়াইয়ের কেন্দ্রবিন্দুতে।
আজ তাঁর বিদায়ে এক যুগের সমাপ্তি ঘটল। রাজনৈতিক সমীকরণ বদলাবে, নতুন মুখ আসবে—কিন্তু সংগঠন গড়ে তোলার যে পরিশ্রমী অধ্যায়, তা ইতিহাসে থেকে যাবে। বাংলা রাজনীতির দীর্ঘ যাত্রাপথে মুকুল রায়ের নাম তাই স্মৃতির পাতা জুড়েই থাকবে—সমর্থন, বিতর্ক, সাফল্য আর সংগ্রামের মিশেলে।