লক্ষ্মীর ভাণ্ডার, কন্যাশ্রী, রূপশ্রী - এই নামগুলি এখন আর শুধু প্রকল্প নয়, বাংলার ঘরে ঘরে পরিচিত শব্দ। রাজ্য সরকারের দাবি, এই প্রকল্পগুলি শুধু জনপ্রিয় নয়, কার্যত জীবন বদলে দিয়েছে বহু মহিলার। তার সঙ্গে যুক্ত হয়েছে আশা কর্মী, অঙ্গনওয়াড়ি কর্মী ও সহায়কদের ভাতা।

ছবি - দ্য ওয়াল
শেষ আপডেট: 5 February 2026 20:02
বাংলার রাজনীতিতে ভোটের (West Bengal Elections 2026) অঙ্ক কষতে গেলে এক সমীকরণ বারবার সামনে আসে - মহিলা ভোট। ২০২১-এর বিধানসভা নির্বাচন হোক কিংবা ২০২৪-এর লোকসভা নির্বাচন, তথ্য একটাই গল্প বলে - বাংলার মহিলা ভোটাররা (Women Voters) ঢেলে ভোট দিয়েছেন তৃণমূল কংগ্রেসকে (TMC)। সেই বাস্তবতাকে মাথায় রেখেই ২০২৬ সালের বিধানসভা নির্বাচনের (West Bengal Elections 2026) আগে বৃহস্পতিবারের অন্তর্বর্তী বাজেটকে (State Budget 2026) দেখছেন রাজনৈতিক বিশ্লেষকরা। তাঁদের অনেকেরই মত, এই বাজেট আসলে তৃণমূল সরকারের মহিলা ভোটব্যাঙ্ক অটুট রাখার কৌশলগত নকশা।
পরিসংখ্যানেই তার ইঙ্গিত স্পষ্ট। ২০২৫ সালের ভোটার তালিকা অনুযায়ী, পশ্চিমবঙ্গে মোট ভোটারের সংখ্যা ৭ কোটি ৬৩ লক্ষের বেশি। তার মধ্যে প্রায় ৩ কোটি ৮৮ লক্ষ মহিলা ভোটার। অর্থাৎ রাজ্যের মোট ভোটারের প্রায় অর্ধেকই মহিলা। ফলে যে কোনও নির্বাচনে তাঁদের ভূমিকা শুধু গুরুত্বপূর্ণ নয়, অনেক সময় নির্ণায়কও হয়ে ওঠে। আর সেই ভোটের মানচিত্রে চোখ রাখলে দেখা যায় রাজ্য সরকারের একের পর এক প্রকল্পের অভিমুখ বেশ স্পষ্টভাবেই মহিলামুখী।
লক্ষ্মীর ভাণ্ডার, কন্যাশ্রী, রূপশ্রী - এই নামগুলি এখন আর শুধু প্রকল্প নয়, বাংলার ঘরে ঘরে পরিচিত শব্দ। রাজ্য সরকারের দাবি, এই প্রকল্পগুলি শুধু জনপ্রিয় নয়, কার্যত জীবন বদলে দিয়েছে বহু মহিলার। তার সঙ্গে যুক্ত হয়েছে আশা কর্মী, অঙ্গনওয়াড়ি কর্মী ও সহায়কদের ভাতা। এবারের অন্তর্বর্তী বাজেট লক্ষ্য করলে দেখা যায়, ভোট বছরের ঠিক আগেই এই সব খাতেই বরাদ্দ বেড়েছে। ফলে প্রশ্ন উঠছে - এ কি নিছক প্রশাসনিক সিদ্ধান্ত, না কি নিখুঁত রাজনৈতিক কৌশল?
মমতার তিন তির
লক্ষ্মীর ভাণ্ডার (Lakshmir Bhandar)। এই প্রকল্পে এবার মাসিক ভাতা আরও ৫০০ টাকা বাড়ানো হয়েছে। বর্তমানে রাজ্যে প্রায় ২ কোটি ৪২ লক্ষ মহিলা এই প্রকল্পের সুবিধা পান। অন্যদিকে, আশা কর্মীদের (Asha Workers) জন্য মাসিক ভাতা ১০০০ টাকা বৃদ্ধি, ১৮০ দিনের মাতৃত্বকালীন ছুটি এবং কর্মরত অবস্থায় মৃত্যু হলে পরিবারকে এককালীন ৫ লক্ষ টাকা আর্থিক সাহায্যের ঘোষণা করা হয়েছে। পাশাপাশি অঙ্গনওয়াড়ি কর্মী ও সহায়কদের ক্ষেত্রেও মাসিক সম্মানিক ১০০০ টাকা বাড়ানো হয়েছে, একইভাবে কর্মরত অবস্থায় মৃত্যু হলে ৫ লক্ষ টাকা ক্ষতিপূরণের সিদ্ধান্ত নেওয়া হয়েছে।
সংখ্যার হিসেব বলছে, রাজ্যে অঙ্গনওয়াড়ি কর্মীর সংখ্যা ১ লক্ষ ৪ হাজার ৩২১ জন, অঙ্গনওয়াড়ি সহায়কের সংখ্যা ৯৫ হাজার ২৪১ জন। আর আশা কর্মী প্রায় ৭২ হাজার। এই বিপুল সংখ্যক কর্মী ও তাঁদের পরিবার মিলিয়ে একটি বড় সামাজিক গোষ্ঠী তৈরি হয়, যার রাজনৈতিক গুরুত্ব অস্বীকার করার জায়গা নেই।
পরিসংখ্যান বলছে, বর্তমানে আশা কর্মীরা মাসে ভাতা পান ৯,০০০ টাকা করে। আগে পেতেন ৮,২৫০ টাকা, ২০২৪ সালে সেটা বাড়িয়ে করা হয় ৯,০০০ টাকা। আজকের বাজেট ঘোষণার পর সেটা বেড়ে হল ১০, ০০০ টাকা। যদিও আশা কর্মীরা তাদের সাম্প্রতিক আন্দোলনের সময় এই ভাতা মাসিক ১৫,০০০ টাকা করার দাবি জানিয়েছিলেন।
এদিকে, পশ্চিমবঙ্গে অঙ্গনওয়াড়ি কর্মীদের মাসিক ভাতা ৯,০০০ টাকা এবং অঙ্গনওয়াড়ি সহায়কের মাসিক ভাতার পরিমাণ ৭,২৫০ টাকা। আজকের বাজেট ঘোষণার পর দুটো ক্ষেত্রে মাসিক ভাতা যথাক্রমে বেড়ে হল ১০,০০০ টাকা এবং ৮,২৫০ টাকা। প্রসঙ্গত, অঙ্গনওয়াড়ি কর্মীরা যে ভাতা পান সেটার একটা অংশ দেয় রাজ্য সরকার, আর কিছুটা অংশ দেয় কেন্দ্র। এই দুই মিলিয়েই তাদের মাসিক ভাতা হয়।
তবে রাজ্য বাজেটের এই ঘোষণায় মিশ্র প্রতিক্রিয়া দেখা গিয়েছে অঙ্গনওয়াড়ি কর্মীদের মধ্যে। তাদের দাবি ছিল ভাতা ২৬,০০০ আর সহায়কের ভাতা ১৮,০০০ করা হোক। সেটা না হওয়াতে এই বৃদ্ধিকে কেউ কেউ ললিপপ বলছেন, আবার কারও মতে কিছুটা তো বেড়েছে, এতেই খুশি হতে হবে।
সব মিলিয়ে বাজেটের ছবিটা অনেকটা পরিষ্কার। প্রশাসনিক ভাষায় একে বলা যেতে পারে সামাজিক সুরক্ষা। রাজনৈতিক ভাষায় কেউ কেউ বলছেন - ভোটের আগে ঘুঁটি সাজানো। ২০২৬ সালের বিধানসভা নির্বাচন আর বেশি দিন বাকি নেই। কিন্তু অন্তর্বর্তী বাজেট দেখে অনেকেই বলছেন, সেই লড়াইয়ের প্রস্তুতি শুরু হয়ে গেছে অনেক আগেই। আর সেই প্রস্তুতির কেন্দ্রে রয়েছেন বাংলার মহিলা ভোটাররা।