এদিন দুপুরে 'দ্য ওয়াল'ই সবার আগে লিখেছিল যে রাজ্যের একটি শিল্পাঞ্চল থেকে বিজেপির প্রার্থী হচ্ছেন অবসরপ্রাপ্ত আইপিএস রাজেশ কুমার। সে খবর প্রকাশের পর নবান্নের পোড়খাওয়া আমলারাও যেন বিশ্বাস করতে পারছিলেন না— এমনও হতে পারে!

রাজীব কুমার ও রাজেশ কুমার। এআই দিয়ে বানানো প্রতীকী ছবি।
শেষ আপডেট: 19 March 2026 19:41
কবেকার কথা! হারানোর সুর ছবির জন্য গীতিকার গৌরীপ্রসন্ন মজুমদার লিখেছিলেন— ‘আজ দু’জনার দুটি পথ ওগো দুটি দিকে গেছে বেঁকে...!’ বৃহস্পতিবার বিজেপির দ্বিতীয় প্রার্থী তালিকা (BJP Candidate list 2026 West Bengal) ঘোষণা হয়েছে। তার পর প্রায় ৭ দশকের পুরনো সেই হারানো সুরটাই যেন প্রাঞ্জল ভাবে ফিরে এল বাংলার রাজনীতিতে। যেন এ ছাড়া আর কোনও উপমা, আর কোনও বিশেষণই এখানে খাটে না।
রাজ্য পুলিশে পরম বন্ধু ছিলেন দুই দুঁদে পুলিশ অফিসার রাজীব কুমার (Rajeev Kumar) ও রাজেশ কুমার (Rajesh Kumar)। রাজীবের জন্ম উত্তরপ্রদেশের চান্দৌসিতে। রুরকি আইআইটি থেকে কম্পিউটার ইঞ্জিনিয়ারিংয়ে স্নাতক। তিনি ১৯৮৯ ব্যাচের আইপিএস অফিসার। আর রাজেশের জন্ম রাজস্থানের ঝুনঝুনুতে। চার্টার্ড অ্যাকাউন্ট্যান্ট ছিলেন। তিনি ১৯৯০ ব্যাচের আইপিএস। দু’জনের অবসরও নিয়েছেন একইদিনে। বাংলার এই ভোট মরশুমে (West Bengal Assembly Election 2026) সেই দুই পরম বন্ধু রাজীব ও রাজেশ সত্যিই বড় চমক দিলেন।
রাজীব কুমার বরাবরই মমতা বন্দ্যোপাধ্যায়ের আস্থাভাজন পুলিশ অফিসার বলে পরিচিত ছিলেন। তিনি অবসর নেওয়ার পর পরই মমতা বন্দ্যোপাধ্যায় তাঁকে রাজ্যসভার ভোটে প্রার্থী করেন। সেদিন মমতার ঘোষণার পর নবান্নর আমলা ও পুলিশ মহলে যেন বিস্ময়ের ঘোর কাটতেই চাইছিল না।
তেমনটাই ঘটল বৃহস্পতিবারেও। এদিন দুপুরে 'দ্য ওয়াল'ই সবার আগে লিখেছিল যে রাজ্যের একটি শিল্পাঞ্চল থেকে বিজেপির প্রার্থী হচ্ছেন অবসরপ্রাপ্ত আইপিএস রাজেশ কুমার। সে খবর প্রকাশের পর নবান্নের পোড়খাওয়া আমলারাও যেন বিশ্বাস করতে পারছিলেন না— এমনও হতে পারে! কিন্তু হল সেটাই। উত্তর ২৪ পরগনার জগদ্দল বিধানসভা থেকে রাজেশকে প্রার্থী করল বিজেপি।
মুকুল রায়ের আস্থাভাজন অফিসার বলে পরিচিত ছিল রাজেশ কুমার। দিল্লিতে তাঁর যোগাযোগ রাজীবের তুলনায় ছিল একটু বেশিই। কারণ, ২০০৯ সালে কেন্দ্রে ইউপিএ সরকার গঠনের পর রাজেশ কুমার সৌগত রায়ের প্রাইভেট সেক্রেটারি তথা ব্যক্তিগত সচিব হয়েছিলেন। পরে মুকুল রায় যখন রেলমন্ত্রী হন তখন তাঁর প্রাইভেট সেক্রেটারি ছিলেন রাজেশ।
মনমোহন সরকারের পতনের পর বিজেপির মন্ত্রী চন্দ্রেশ কুমারী কাটৌচের ওএসডিও ছিলেন তিনি। সেই সাত বছরেই দিল্লির ক্ষমতার অলিন্দে বেশ পরিচিতি তৈরি করে ফেলেন এই চৌখস আইপিএস অফিসার। বিজেপি ও সঙ্ঘ পরিবারের অনেকের সঙ্গেও তাঁর চেনাশোনা বাড়ে।
রাজনৈতিক সূত্রের দাবি, ২০১৪ সালে লোকসভা ভোটের পর মমতা বন্দ্যোপাধ্যায়ের সঙ্গে যখন দূরত্ব বাড়ে মুকুল রায়ের, সেই সময়ে বিজেপি-র সঙ্গে তাঁর যোগাযোগ রাখায় রাজেশের ভূমিকা ছিল।
সে যাক। ২০১৬ সালে বিধানসভা ভোটের আগে তৃণমূলে প্রায় আগের ভূমিকায় প্রত্যাবর্তন ঘটে মুকুল রায়ের। সেই ভোটের পর তাঁরই সুপারিশে রাজেশ কুমারকে কলকাতায় ফিরিয়ে আনেন মুখ্যমন্ত্রী মমতা বন্দ্যোপাধ্যায়। তাঁকে রাজ্যের গোয়েন্দা বিভাগ সিআইডি-র এডিজি করা হয়।
কিন্তু ২০১৭ সালে মুকুল রায় বিজেপিতে যেতেই রাজেশকে গোয়েন্দা-দায়িত্ব থেকে সরিয়ে দেন মমতা। তাঁকে পাঠিয়ে দেওয়া হয় দূষণ নিয়ন্ত্রণ পর্ষদে। ২০১৯ সালে লোকসভা ভোটের সময়ে রাজীব কুমারকে সরিয়ে এই রাজেশ কুমারকেই কলকাতার পুলিশ কমিশনার করেছিল নির্বাচন কমিশন। তবে ভোট মিটতেই রাজীবকে কলকাতার পুলিশ কমিশনার পদে ফেরান মমতা আর রাজেশকে ফের পাঠিয়ে দেন দূষণ নিয়ন্ত্রণ পর্ষদে। সেখানে মেম্বার সেক্রেটারি ছিলেন রাজেশ।
এহেন রাজেশের আর পুলিশি দায়িত্বে ফেরা হয়নি। আবার একেবারে ত্যাজ্যও করে দেওয়া হয়নি তাঁকে। সৌজন্যে সম্ভবত তাঁর সেই পরম মিত্র রাজীব কুমার। যিনি হয়তো আগলে রেখেছিলেন রাজেশকে।
ঘটনা হল, এই সময়ে শুভেন্দু অধিকারীকে আবার পরিবেশ দফতরের দায়িত্ব দিয়েছিলেন মমতা বন্দ্যোপাধ্যায়। সেই থেকে শুভেন্দুর সঙ্গেও রাজেশের বোঝাপড়া ভাল। তবে আরও ভাল দিল্লিতে বিজেপি নেতৃত্বের সঙ্গে। সেই দিল্লি কানেকশনের কারণেই এবার সম্ভবত রাজেশকে প্রার্থী করা হল। তাতে সায় দিয়েছেন শুভেন্দুও।
এখন শুধু একটাই জিনিস দেখার। কখনও যদি রাজনৈতিক ভাবে তর্ক হয় রাজীব ও রাজেশের— কে কোন স্বরে কথা বলবেন, কে কোন সুরে!