বহু দশক ধরে এই গ্রামের ঘরে-ঘরে তৈরি হয় পরচুলা। মেয়েদের কেটে ফেলা লম্বা চুল, মন্দিরে মানত করে ফেলে দেওয়া চুল— এই শিল্পের প্রধান উপকরণ এগুলোই। চুল সংগ্রহ করে ধুইয়ে, শুকিয়ে, আলাদা করে, ছেঁটে দীর্ঘ প্রক্রিয়ার মধ্য দিয়ে তৈরি হয় কৃত্রিম চুল। আর সেই কাজে ব্যস্ত থাকেন অসংখ্য নারী পুরুষ।

শেষ আপডেট: 16 December 2025 18:00
দেবাশিস গুছাইত,হাওড়া: রুপোলি পর্দার সেই রঙিন দিনগুলি মনে পড়ে? যখন পর্দাজুড়ে ঝলমল করতেন ‘ড্রিম গার্ল’ হেমা মালিনী, বা ভয়ের আবহ তৈরি করতেন অভিনেতা প্রাণ! কিংবা স্মার্ট কেশবিন্যাসে মুগ্ধ করতেন বাংলার চিরসবুজ নায়ক সৌমিত্র চট্টোপাধ্যায়! বলিউড হোক, আর টলিউড, তাঁদের প্রত্যেকের এক জায়গায় মিল—স্টাইল ধরে রাখতে তাঁরা যে পরচুলা ব্যবহার করতেন, তা তৈরি হত উলুবেড়িয়ার জগদীশপুরের মোল্লাপাড়ায়। এখনও সেই ধারা চলছে জগদীশপুরে।
বহু দশক ধরে এই গ্রামের ঘরে-ঘরে তৈরি হয় পরচুলা(Wig))। মেয়েদের কেটে ফেলা লম্বা চুল, মন্দিরে মানত করে ফেলে দেওয়া চুল(Hair)— এই শিল্পের প্রধান উপকরণ এগুলোই। চুল(Hair) সংগ্রহ করে ধুইয়ে, শুকিয়ে, আলাদা করে, ছেঁটে দীর্ঘ প্রক্রিয়ার মধ্য দিয়ে তৈরি হয় কৃত্রিম চুল। আর সেই কাজে ব্যস্ত থাকেন অসংখ্য নারী পুরুষ। বিশেষত মহিলারা। তবে সময়ের সঙ্গে বদল এসেছে বাজারে। আগে যে চুল তৈরি হত মূলত সিনেমা-থিয়েটার-যাত্রার কথা মাথায় রেখে, তা এখন তৈরি হয় সাধারণ মানুষের কথা ভেবে। কারণ সৌন্দর্য সচেতন এখন আর কেবল মেয়েরা নয়, পুরুষরাও সমানতালে রূপ নিয়ে চর্চায়। তাই মাথার চুল পাতলা হতে দেখলেই সচেতন হয়ে পড়েন তাঁরা। ছুটে যান নামী-অনামী নানা পার্লারে। স্বাভাবিকভাবেই এই সমস্ত পার্লারে কৃত্তিম চুলের চাহিদা বাড়ছে।
জগদীশপুরের পরচুলা(Wig) শিল্পের সঙ্গে জড়িতরাও বুঝতে পারছেন এই পরিবর্তন। জগদীশপুরের(Jagadishpur) ব্যবসায়ী আলামিন আলি সারেন বলেন, “দাদুর সময় থেকে এই ব্যবসা চলছে। তখন বেশিরভাগ চুল যেত যাত্রাপালা আর সিনেমায়। এখন বাজার বদলেছে, চাহিদা আরও বাড়ছে। পার্লারে চুল বসানোর প্রবণতা বেড়েছে বলেই আমাদের ব্যবসা আরও জমজমাট।” আরেক ব্য়বসায়ী পরিমল বাগ বলেন, "যাঁর টাক আছে তিনিও খুশি চুল লাগিয়ে, আর যার ঘরে অভাব তিনিও খুশি এই চুল তৈরি করতে পেরে। এই ব্যালেন্সের উপরেই চলছে জগদীশপুরে পরচুলা শিল্প।"
মাথায় টাক পড়ে কেন?
মাথায় টাক পড়া বা অ্যালোপেসিয়া একটি সাধারণ সমস্যা। কিছু ক্ষেত্রে তা বংশগত। কিছুক্ষেত্রে আবার হরমোনের পরিবর্তন, পুষ্টির অভাব, মানসিক চাপ, মাথার ত্বকের কোনও সংক্রমণেও এই সমস্যা দেখা দেয়। এর লক্ষণগুলি হল চুল পাতলা হয়ে যাওয়া বা নির্দিষ্ট জায়গায় চুল উঠে যাওয়া। বিশেষজ্ঞরা মনে করেন, টাক পড়া সম্পূর্ণ বন্ধ করা না গেলেও, সঠিক যত্ন ও চিকিৎসার মাধ্যমে এর প্রকোপ কমানো এবং নতুন চুল গজানোর সম্ভাবনা বাড়ানো যায়। তবে কোনওভাবেই যদি টাক পড়া বন্ধ না করা যায়, সেক্ষেত্রে তো পরচুলাই একমাত্র ভরসা।
মাথা ঢাকার এই ব্যবস্থা কবে চালু হয়েছিল?
পরচুলার ইতিহাস বহু প্রাচীন। মনে করা হয় প্রায় ৪০০০ বছর আগে প্রাচীন মিশরে সূর্য থেকে মাথাকে রক্ষা করতে এবং ফ্যাশন হিসেবে পরচুলার চল শুরু। প্রাচীন গ্রিস ও রোমের নাটকে এর বহুল ব্যবহার দেখা যায়। অভিজাতদের মধ্যেও এই পরচুলা ব্যবহারের প্রচলন ছিল। মধ্যযুগে পরচুলার কদর কমলেও ১৬শ শতকে ইউরোপে নতুন করে এর ব্যবহার শুরু হয়। ফরাসি রাজা চতুর্দশ লুইয়ের সময় এই পরচুলার ব্যবহার সামাজিক মর্যাদা ও ফ্যাশনের প্রতীক হয়ে ওঠে। তবে পরবর্তীতে উনিশ ও বিশ শতকে মাথার টাক ঢাকতে পরচুলার ব্যবহার জনপ্রিয় হয়।
জগদীশপুরে প্রায় ৬০ জন ব্যবসায়ীর প্রত্যেকের অধীনে কাজ করেন গড়ে ১৫০ জন কারিগর। সারা বছরই তাঁরা ব্যস্ত থাকেন এই কাজ নিয়ে। তাঁদের তৈরি চুল কলকাতা ছাড়িয়ে পৌঁছে যায় দিল্লি, মুম্বই, চেন্নাই, হায়দরাবাদ-সহ দেশের নানা প্রান্তে। ২০ বছর ধরে এই কাজে যুক্ত রিনা রাউত জানান, “এই চুলের কাজ করেই সংসার চলে। ঘরের কাজ সারার পর এই কাজে বসি। আমাদের মতো অনেক মহিলা এই কাজে যুক্ত।”
আরেক কারিগর রাকিয়ান মোল্লাও জানান, বছরের পর বছর এই কাজ করেই জীবিকা নির্বাহ করছেন। সকাল আটটায় কাজ শুরু করেন। বিকেল পাঁচটা পর্যন্ত চলে কাজ। মাঝে শুধু খাওয়ার বিরতি। সারাবছর কাজের চাপ। তবে তুলনায় শীতকালটা একটু কম কাজ থাকে। কারিগরদের হাতের নিপুণ কাজে ঢাকা পড়ে টাক পড়া মাথা। ফেরে আত্মবিশ্বাস। সেই ভরসাতেই বছরের পর বছর টিকে রয়েছে জগদীশপুরের ঐতিহ্যবাহী এই কুটিরশিল্প।