নবম-দশম শ্রেণির শিক্ষকতার জন্য ইন্টারভিউতে ডাকা চাকুরিপ্রার্থীদের তালিকা প্রকাশ হলে আমার ধারণা সেখানে এই নবীন প্রার্থীদের অনেকেরই নাম থাকবে। তবে সেই সংখ্যাটিও বিপুল হওয়া অসম্ভব। এক্ষেত্রে, নবীন প্রার্থীদের এটিও মনে রাখতে হবে যে, অনেকেই একাদশ-দ্বাদশ এবং নবম-দশম শ্রেণির পরীক্ষার দু-টিতেই সফল হবেন এবং ইন্টারভিউয়ের জন্য ডাক পাবেন।

ফাইল ছবি
শেষ আপডেট: 18 November 2025 16:42
একাদশ দ্বাদশ শ্রেণির স্কুল সার্ভিস কমিশনের পরীক্ষায় (SSC Exam 2025) ইন্টারভিউতে কারা ডাক পাবেন সেই তালিকা প্রকাশ্যে আসার পর থেকেই আইন মোতাবেক ‘অনভিজ্ঞ’ নবীন চাকুরিপ্রার্থীদের (New Fresher Candidate) ক্ষোভ আর প্রশমিত হচ্ছেই না। এই ক্ষোভের সঙ্গত কারণ রয়েছে। কিন্তু যে-পথে হাঁটলে তাঁদের সমস্যার অনেকখানি সুরাহা হতে পারে, সেই পথে তারা হাঁটছেন কি? আমার তো তেমনটা মনে হচ্ছে না। ২০১৬-র যোগ্য চাকরিপ্রার্থীদের নিজেদের প্রতিদ্বন্দ্বী মনে করে তাঁরা আসলে পরিস্থিতিকে আরও ঘোরালোই করে তুলছেন। কেন এই কথা বললাম সেই প্রসঙ্গে প্রবেশ করার আগে দু-টি অন্য কথা বলে নেওয়া প্রয়োজন।
এখনও পর্যন্ত যে-সমস্ত তথ্য সামনে এসেছে তাতে এই কথা বলা যাবে না যে, ব্যাপক হারে ‘চিহ্নিত টেইনটেড’ প্রার্থীরা (SSC Tainted Candidates) এই পরীক্ষায় বসেছিলেন। যেহেতু অনলাইনে ফর্ম ফিলাপ (Online Form Fillup) করা হয়েছিল, তাই একজন দু-জন কারচুপি করে থাকতেও পারেন। কিন্তু, নথি যাচাই করার সময় তাঁদের অবশ্যই চিহ্নিত করা সম্ভব। একইভাবে এটিও বলা যাবে না যে, অভিজ্ঞতার নম্বর জোগাড় করার ক্ষেত্রে অনেকে অসাধু উপায় অবলম্বন করেছেন এবং তার ভিত্তিতে এই অংশটির জন্য নম্বর পেয়েছেন। এই ধরনের কাজ কোনো প্রার্থী করে থাকলে নথিপত্র যাচাইকরণের সময় তাঁরা চিহ্নিত হবেনই। আশা করব স্কুল সার্ভিস কমিশন (School Service Commission) এই ক্ষেত্রটুকুতে অন্তত স্বচ্ছতা বজায় রাখবেন। এক্ষেত্রে স্বচ্ছতা বজায় না রাখা হলে আরটিআই করার পথ বা কোর্টে মামলা (Calcutta High court) করার পথ তো খোলাই থাকছে।
মোদ্দা কথা হল, মোটের উপর গেজেট নোটিফিকেশনে (Notification) যা যা বলা হয়েছিল সেই সমস্ত আইনকানুন মেনেই পরীক্ষা হয়েছে। ফলাফলও সেভাবেই প্রকাশ পেয়েছে। অনেকে বলার চেষ্টা করছেন যে, মুসলিম প্রার্থীদের (Minority Candidates) নির্দিষ্ট করে বঞ্চিত করার চেষ্টা হয়েছে এই পরীক্ষার ফলাফলে। এখনও পর্যন্ত যেসব তথ্যপ্রমাণ সামনে এসেছে তা থেকে এটিও আমার একেবারেই বিশ্বাসযোগ্য দাবি মনে হয়নি। প্রশ্ন উঠছে তাহলে এত বিপুল সংখ্যক তথাকথিত অনভিজ্ঞ এবং নবীন চাকুরী প্রার্থী একাদশ দ্বাদশ শ্রেণির চাকরির পরীক্ষার ইন্টারভিউতে (Job Interview) ডাক পেলেন না কেন? এর মূল কারণ দু-টি। এক, সমস্ত বিষয়ের পরীক্ষার প্রশ্নপত্রই অতিরিক্ত সহজ করা হয়েছিল, যার ফলে বিপুল সংখ্যক ছাত্রছাত্রী লিখিত পরীক্ষায় ৬০-এর মধ্যে ৫৫র ওপরে পেয়েছেন। অনেকেই ৬০-এ ৬০-ই পেয়েছেন।
নবীনরা হয়তো মনে করেছিলেন লিখিত পরীক্ষাতেই অভিজ্ঞ যোগ্য চাকুরিপ্রার্থীরা তাঁদের চেয়ে পিছিয়ে পড়বেন। কিন্তু, তাঁরা তা পড়েননি। বিপুল সংখ্যক ছাত্র-ছাত্রী লিখিত পরীক্ষায় যথেষ্ট ভালো ফল করার পরেও পরীক্ষায় ডাক না পেয়ে স্বভাবতই ক্ষুব্ধ। কিন্তু, এক্ষেত্রে মূল সমস্যাটি তৈরি হয়েছে গেজেট নোটিফিকেশনে থাকা একটি নিয়মের জন্য।
এই নিয়মটিতে বলা হয়েছে যে, মোট শূন্যপদের নিরিখে ১.৬:১ আনুপাতিক হারের চাকুরিপ্রার্থীদের ইন্টারভিউর জন্য ডাকা হবে। এই অনুপাতটিকে মান্যতা দিতে গিয়েই কাট অফ মার্কস (Cut off Marks) হয়ে গেছে অনেক উঁচু কারণ প্রায় সকল পরীক্ষার্থীই লিখিত পরীক্ষাতে মোটের ওপর ভালোই করেছেন। নিয়োগকর্তারা এই অনুপাতটি একেবারেই সঠিক নির্ণয় করেননি। অন্তত ২:১ এই অনুপাতে লিখিত পরীক্ষা, অ্যাকাডেমিক স্কোর এবং অভিজ্ঞতার নম্বরের ওপর ভিত্তিতে প্রার্থীদের ইন্টারভিউর জন্য ডাকলে, আজ যে-সমস্যার মুখে পড়েছে স্কুল সার্ভিস কমিশন সেই সমস্যার মুখে সংস্থাটি পড়ত না।
মনে রাখা উচিত ছিল এই তথ্যটিও যে, প্রায় দশ বছরের ব্যবধানে স্কুল শিক্ষক নিয়োগের আরেকটি পরীক্ষা হচ্ছে। প্রার্থীদের প্রত্যাশা থাকবে বিপুল। ১.৬:১টি অনুপাত তাই একেবারেই সঠিক ছিল না। যতটুকু আইন বুঝি তাতে গেজেট নোটিফিকেশনের এই অনুপাত এখন সহজে পরিবর্তন করা যাবে না।
তাহলে কি তথাকথিত অনভিজ্ঞ নবীন চাকরি প্রার্থীরা এবারে চাকরি পাবেনই না? এ-প্রসঙ্গে আমার মূল প্রস্তাবটি পেশ করার আগে একটি কথা বলে নিই। নবম-দশম শ্রেণির শিক্ষকতার জন্য ইন্টারভিউতে (Interview) ডাকা চাকুরিপ্রার্থীদের তালিকা প্রকাশ হলে আমার ধারণা সেখানে এই নবীন প্রার্থীদের অনেকেরই নাম থাকবে। তবে সেই সংখ্যাটিও বিপুল হওয়া অসম্ভব।
এক্ষেত্রে, নবীন প্রার্থীদের এটিও মনে রাখতে হবে যে, অনেকেই একাদশ-দ্বাদশ এবং নবম-দশম শ্রেণির পরীক্ষার দু-টিতেই সফল হবেন এবং ইন্টারভিউয়ের জন্য ডাক পাবেন। ইন্টারভিউতেও তাঁরা সফল হতে পারেন কিন্তু তাঁরা কেউই তো একইসঙ্গে দু-টি চাকরি করতে পারবেন না। কাজেই ঠিক কী হচ্ছে তা জানার জন্য কাউন্সেলিং শেষ হওয়া পর্যন্ত অপেক্ষা করতে হবে। কাউন্সেলিংয়ের শেষে নবীন তথাকথিত ‘অনভিজ্ঞ’ চাকুরিপ্রার্থীদের এতখানি ক্ষোভ নাও থাকতে পারে।
এ প্রসঙ্গে এই কথাটিও স্পষ্ট ভাবে বলতে চাই যে, তাঁরা যেভাবে ২০১৬র যোগ্য অভিজ্ঞ চাকুরিপ্রার্থীদের অভিজ্ঞতার জন্য ১০ নম্বর দেওয়ার বিরোধিতা করছেন, সেটিও ঠিক কাজ হচ্ছে না। মনে রাখা প্রয়োজন যে, এই চাকরির পরীক্ষার প্রথম লক্ষ্যই হচ্ছে কিন্তু যোগ্য চাকুরিপ্রার্থীদের একজনও যাতে নিজেদের যোগ্যতার ভিত্তিতে পাওয়া চাকরি থেকে বঞ্চিত না হন, সেটি দেখা। আমার ধারণা তথাকথিত ‘অনভিজ্ঞ’ চাকুরিপ্রার্থীরা যতই দাবি পেশ করুন, সুপ্রিম কোর্ট (Supreme Court) কোনোমতেই যোগ্য অভিজ্ঞ প্রার্থীদের অভিজ্ঞতার জন্য ১০ নম্বর দেওয়ার নিয়মটিকে বাতিল ঘোষণা করবেন না।
তাহলে কী করা যেতে পারে? শূন্যপদের সংখ্যা (Vacant Numbers) অবশ্যই বৃদ্ধি করা যেতে পারে। গেজেট নোটিফিকেশনে কোথাও বলা নেই যে, শূন্যপদের সংখ্যা বৃদ্ধি করা যাবে না। বরং উলটো ইঙ্গিতই করা আছে। সুপ্রিম কোর্টও তার রায়ে কোথাও জানায়নি যে, শূন্যপদের সংখ্যা ঠিক কত হতে হবে। রাজ্য সরকার এবং স্কুল সার্ভিস কমিশনের অবিলম্বে উচিত কাউন্সেলিংয়ের দিন পর্যন্ত পশ্চিমবঙ্গের সমস্ত বিদ্যালয়ে যতগুলি সংখ্যক শূন্যপদ থাকবে সেই সমস্ত শূন্যপদগুলিকেই এ-বছরের নিয়োগের আওতায় আনা।
তথাকথিত অনভিজ্ঞ নবীনদের মধ্যে যাঁরা আন্দোলন করছেন তাঁদেরও এই মুহূর্তে একটিই দাবি হওয়া উচিত। সেটি হল শূন্যপদের সংখ্যা বৃদ্ধি। সরকার যেন এই ক্ষেত্রে একটি শ্বেতপত্র প্রকাশ করে, সেই দাবিটিও জোরালোভাবে শিক্ষামন্ত্রীর কাছে পেশ করা উচিত। সামনে বিধানসভা নির্বাচন। আশা করব রাজ্য সরকার এবং উচ্চ শিক্ষা দপ্তর শূন্যপদ বৃদ্ধি করার প্রস্তাবটিকে গুরুত্ব দিয়ে বিবেচনা করবে। তা না হলে, এবারের স্কুল সার্ভিস কমিশনের পরীক্ষাটিও বিধানসভা নির্বাচনের একটি গুরুত্বপূর্ণ ইস্যু হয়ে উঠবে।