কোচবিহার জেলায় গত কয়েক বছর ধরেই রাজনৈতিক হিংসার বেশ কিছু ঘটনা ঘটেছে। এদিন শুভেন্দুর কনভয়ে গাড়ির কাচ ভাঙার ঘটনা নবতম সংযোজন।

শেষ আপডেট: 5 August 2025 13:27
দ্য ওয়াল ব্যুরো: মঙ্গলবার কোচবিহারে আক্রান্ত হয়েছে বিরোধী দলনেতা শুভেন্দু অধিকারী কনভয় (Attack on Suvendu Adhikari Convoy)। কোচবিহার জেলায় গত কয়েক বছর ধরেই রাজনৈতিক হিংসার বেশ কিছু ঘটনা ঘটেছে। এদিন শুভেন্দুর কনভয়ে গাড়ির কাচ ভাঙার ঘটনা নবতম সংযোজন। অথচ শুভেন্দুর নিরাপত্তা যাতে নিশ্ছিদ্র থাকে সে ব্যাপারে আগে থেকেই নবান্নের কাছে বার্তা ছিল স্বরাষ্ট্র মন্ত্রকের তরফে। এদিন শুভেন্দুর কনভয়ে হামলার ঘটনা নতুন করে কৌতূহল তৈরি করেছে যে, ঠিক কোন গোত্রের বা শ্রেণির নিরাপত্তা (Suvendu Adhikari Security category) পান এই বিজেপি নেতা।
রাজনৈতিক উত্তাপ ও নিরাপত্তার আশঙ্কা—এই দুইয়ের কারণে গোটা দেশে ‘Z’ ক্যাটাগরির নিরাপত্তা দেওয়া হয়েছে পশ্চিমবঙ্গের বিরোধী দলনেতা শুভেন্দু অধিকারীকে। ২০২৪ সাল পর্যন্ত শুধু রাজ্যের মধ্যেই তাঁর জন্য ‘Z’ ক্যাটাগরির নিরাপত্তা ব্যবস্থা ছিল, অন্য রাজ্যে তিনি পেতেন তুলনামূলকভাবে কমজোরি ‘Y+’ ক্যাটাগরি সুরক্ষা। গত নভেম্বর মাস থেকে গোটা দেশেই সর্বোচ্চ স্তরের কেন্দ্রীয় নিরাপত্তা কভার পান শুভেন্দু।
কেন্দ্রীয় স্বরাষ্ট্র মন্ত্রকের (MHA) সিদ্ধান্ত অনুযায়ী, সিআরপিএফ-এর (CRPF) একটি বিশেষ প্রশিক্ষিত দল শুভেন্দুর নিরাপত্তার দায়িত্বে থাকবে। মোট ২২ জন সশস্ত্র আধাসামরিক বাহিনীর সদস্য থাকবেন তাঁর কনভয়ে। থাকবে বুলেটপ্রুফ গাড়ি, পাইলট ভেহিকল ও এসকর্ট গাড়িও। তাঁর চলাফেরা, রাজনৈতিক জনসভা, আবাসস্থল ও অফিস—সবকিছুতেই এই নিরাপত্তা বলয় থাকবে অটুট।
কোন গোত্রের নিরাপত্তা?
শুভেন্দু অধিকারী এখন ‘Z’ ক্যাটাগরির নিরাপত্তা পান। এটি ভারতে ভিআইপিদের জন্য কেন্দ্রীয় স্বরাষ্ট্র মন্ত্রক অনুমোদিত অন্যতম উচ্চস্তরের নিরাপত্তা ব্যবস্থা। 'Z' ক্যাটাগরির অধীনে সাধারণত ৪ থেকে ৫ জন সশস্ত্র নিরাপত্তারক্ষী থাকে ব্যক্তির সঙ্গে, তবে রাজ্যের রাজনৈতিক প্রেক্ষাপটে এবং হুমকির মাত্রা বিচার করে এই সংখ্যা অনেকটাই বাড়ানো হয়। শুভেন্দুর ক্ষেত্রে তা বাড়িয়ে ২২ জন করা হয়েছে, যা কার্যত ‘Z+’ ক্যাটাগরির সমতুল্য।
কে দেয় এই নিরাপত্তা?
এই মুহূর্তে শুভেন্দু অধিকারীর নিরাপত্তার দায়িত্বে রয়েছে সেন্ট্রাল রিজার্ভ পুলিশ ফোর্স (CRPF)। তবে কিছু বিশেষ পরিস্থিতিতে CISF (Central Industrial Security Force)-এর একাধিক ইউনিটও নিরাপত্তার কাজে যুক্ত থাকতে পারে। গোটা বিষয়টি তত্ত্বাবধান করছে কেন্দ্রীয় স্বরাষ্ট্র মন্ত্রক এবং গোয়েন্দা সংস্থা ইন্টেলিজেন্স ব্যুরো (IB)।
কেন বাড়ানো হল নিরাপত্তা?
গোয়েন্দা সংস্থার রিপোর্টে উঠে এসেছে গুরুত্বপূর্ণ তথ্য। জানানো হয়েছে, বাংলাদেশের একটি মৌলবাদী গোষ্ঠী শুভেন্দু অধিকারীর উপর হামলার পরিকল্পনা করছে। এই গোষ্ঠীর চারজন সদস্য নাকি পূর্ব মেদিনীপুরের কাঁথিতে গিয়ে তাঁর বাড়ির আশপাশে রেকি করে গেছে। ছবি ও ভিডিও তুলে নিয়েছে, যা পরে সংশ্লিষ্ট গোষ্ঠীর কাছে পাঠানো হয়েছে।
এই ঘটনার পরেই কলকাতা পুলিশ এবং রাজ্য পুলিশের পাশাপাশি কেন্দ্রীয় গোয়েন্দা সংস্থাও সতর্ক হয়ে যায়। দ্রুত প্রতিক্রিয়া জানিয়ে কেন্দ্রীয় স্বরাষ্ট্র মন্ত্রক শুভেন্দুর গোটা দেশের নিরাপত্তা কভার বাড়িয়ে দেয়।
নিরাপত্তার নতুন নিয়ম কী?
প্রতি সভায় থাকবে D-জোন—এলাকা পুরোপুরি ঘিরে দেওয়া হবে, সাধারণের প্রবেশ নিষিদ্ধ থাকবে।
কোনও ব্যক্তি সেলফি তুলতে চাইলে তাঁকে পুঙ্খানুপুঙ্খ তল্লাশি করতে হবে।
শুভেন্দুর প্রতিটি গতিবিধির উপর প্রতি ঘণ্টায় নজর রাখবে কেন্দ্রীয় গোয়েন্দা সংস্থা।
ঝুঁকিপূর্ণ এলাকাগুলিতে চলাফেরার সময় তাঁর জন্য ব্যবহার করা হবে বুলেটপ্রুফ গাড়ি।
কোন ঘটনার পর এই সতর্কতা?
সম্প্রতি বাংলাদেশে হিন্দু সম্প্রদায়ের উপর আক্রমণ, বিশেষ করে হিন্দু সন্ন্যাসী চিন্ময় কৃষ্ণ দাসের গ্রেফতারি নিয়ে প্রবল সমালোচনা করেন শুভেন্দু। তিনি সরাসরি আঙুল তোলেন বাংলাদেশের অন্তর্বর্তী সরকার তথা নোবেলজয়ী অধ্যাপক মহম্মদ ইউনুসের নেতৃত্বাধীন প্রশাসনের দিকে।
তাঁর মন্তব্য বাংলাদেশে ও সীমান্তবর্তী এলাকায় চাঞ্চল্য সৃষ্টি করে। তারপরেই একাধিক গোয়েন্দা ইনপুটে উঠে আসে আন্তর্জাতিক মৌলবাদী গোষ্ঠীর সম্ভাব্য হামলার ছক।
অনেকের মতে, শুভেন্দুর সিকিউরিটি বাড়ানো নিরাপত্তাজনিত পদক্ষেপ নয়, এর রাজনৈতিক ইঙ্গিতও স্পষ্ট। রাজ্যের রাজনৈতিক পরিস্থিতি যেভাবে উত্তপ্ত, বিরোধীদের উপর যেভাবে আক্রমণের অভিযোগ রয়েছে—তা কেন্দ্রীয় সরকারের নজরে এসেছে বলেই মনে করা হচ্ছে। আর সেই কারণেই এক বিরোধী নেতাকে এত উচ্চ স্তরের নিরাপত্তা দেওয়ার সিদ্ধান্ত নেওয়া হয়েছে।