আধার কার্ড (Aadhar Card) কি নাগরিকত্বের প্রমাণ? না কি স্রেফ পরিচয়পত্র? আর যদি সেই পরিচয়পত্র তৈরিতেই জালিয়াতির কালো ছায়া পড়ে, তবে তার দায় কার?

গ্রাফিক্স: দিব্যেন্দু দাস
শেষ আপডেট: 24 February 2026 15:46
দ্য ওয়াল ব্যুরো: আধার কার্ড (Aadhar Card) কি নাগরিকত্বের প্রমাণ? না কি স্রেফ পরিচয়পত্র? আর যদি সেই পরিচয়পত্র তৈরিতেই জালিয়াতির কালো ছায়া পড়ে, তবে তার দায় কার? মঙ্গলবার পশ্চিমবঙ্গে (West Bengal SIR) ভোটার তালিকায় বিশেষ নিবিড় সংশোধন বা এসআইআর (SIR) সংক্রান্ত মামলার শুনানি চলাকালীন এই প্রশ্নগুলিই উঠে এল সুপ্রিম কোর্টে (Supreme Court)। প্রধান বিচারপতি সূর্যকান্ত, বিচারপতি জয়মাল্য বাগচি এবং বিচারপতি বিপিন পাঞ্চোলির বেঞ্চ স্পষ্ট করে দিল, আধার কার্ডের জালিয়াতি বা অপব্যবহার রোখার দায়িত্ব আদালতের নয়, বরং কেন্দ্রীয় সরকারের।
‘রোহিঙ্গাদের আধার’ ও আইনি সংঘাত
এদিন মামলার শুনানি চলাকালীন বিজেপি (BJP) নেতা তথা আইনজীবী অশ্বিনী উপাধ্যায় অভিযোগ করেন, পশ্চিমবঙ্গে দেদার ভুয়ো আধার কার্ড তৈরি হচ্ছে। তাঁর দাবি, বিশেষ করে রোহিঙ্গাদের জন্য ‘ইন্ডাস্ট্রিয়াল স্কেলে’ বা ব্যাপক হারে এই জালিয়াতি চলছে, যা পরবর্তীকালে ভোটার তালিকায় প্রভাব ফেলতে পারে। তিনি এ বিষয়ে আদালতের হস্তক্ষেপ ও স্পষ্ট নির্দেশিকা দাবি করেন।
পাল্টা পর্যবেক্ষণে বিচারপতি জয়মাল্য বাগচি জানান, এই ধরনের অভিযোগ গুরুতর হলে অশ্বিনী উপাধ্যায় কেন্দ্রীয় সরকারের দ্বারস্থ হতে পারেন। প্রয়োজনে ‘রিপ্রেজেন্টেশন অফ পিপলস অ্যাক্ট’ বা জনপ্রতিনিধিত্ব আইন সংশোধনের জন্য কেন্দ্রের কাছে আবেদন জানাতে পারেন তিনি। বিচারপতি বাগচির কথায়, “যদি আধার কার্ডের মতো নথি জাল করা হয়ে থাকে, তবে আইনগত ভাবেই তা নিয়ন্ত্রণ করতে হবে। আধার কার্ড পরিচয়পত্রের প্রমাণ হিসেবে আনা হয়েছিল এবং আমাদের সেটা স্বীকার করতে হবে। কিন্তু আধার কার্ডের মাধ্যমে নাগরিকত্বের দাবি প্রতিষ্ঠা করার কোনও অবকাশ নেই।”
তদন্তের এক্তিয়ার নিয়ে প্রশ্ন
আদালত এদিন মনে করিয়ে দিয়েছে যে, প্রতিটি বিষয়ের একটি নির্দিষ্ট প্রশাসনিক এক্তিয়ার থাকে। প্রধান বিচারপতি সূর্যকান্ত সোজাসুজি জানান, “এই বিষয়টির গভীর তদন্ত প্রয়োজন এবং আদালত সেই তদন্তের সঠিক মঞ্চ বা ফোরাম নয়।” অর্থাৎ, জালিয়াতির উৎস বা পদ্ধতি খুঁজে বের করার কাজ কেন্দ্রীয় তদন্তকারী সংস্থা বা প্রশাসনের, বিচারবিভাগের নয়।
প্রেক্ষাপট: আধার ও ভোটার তালিকা
প্রসঙ্গত, এর আগে ২০২৫ সালের সেপ্টেম্বর মাসে বিহারের ভোটার তালিকা সংশোধন প্রসঙ্গে সুপ্রিম কোর্ট নির্দেশ দিয়েছিল যে, নাম তোলা বা বাদ দেওয়ার ক্ষেত্রে পরিচয়পত্র হিসেবে আধার কার্ড গ্রহণ করতে হবে। ১৯৫০ সালের জনপ্রতিনিধিত্ব আইনের ২৩(৪) ধারা অনুযায়ী, পরিচয় প্রমাণের জন্য যে নথিগুলির তালিকা রয়েছে, আধার কার্ড তার মধ্যে অন্যতম।
আদালত এদিনও স্পষ্ট করেছে যে, আধার কার্ডকে তালিকায় ১২ নম্বর নথি হিসেবে গণ্য করা হবে। তবে ভোটার তালিকার দায়িত্বে থাকা আধিকারিকদের পূর্ণ অধিকার থাকবে ওই নথির সত্যতা যাচাই করার। যদি আধিকারিকদের মনে হয় আধার কার্ডটি সন্দেহজনক, তবে তাঁরা অতিরিক্ত প্রমাণ বা নথি দাবি করতে পারেন।
মঙ্গলবারের এই পর্যবেক্ষণের পর রাজনৈতিক মহলে নতুন করে আলোচনা শুরু হয়েছে। ভোটার তালিকা সংশোধনীকে ঘিরে পশ্চিমবঙ্গ ও বিহারের মতো রাজ্যগুলিতে যে তরজা চলছে, তাতে আদালতের এই নিরপেক্ষ অবস্থান অত্যন্ত তাৎপর্যপূর্ণ। একদিকে নথির সত্যতা যাচাইয়ের ক্ষমতা আধিকারিকদের হাতে রাখা হয়েছে, অন্যদিকে নীতিগত পরিবর্তনের দায় কেন্দ্রীয় সরকারের ওপর ছেড়ে দিয়ে শীর্ষ আদালত বুঝিয়ে দিয়েছে— প্রশাসনিক জটিলতার সমাধান রাজপথ বা সংসদেই খুঁজতে হবে, এজলাসে নয়।