বাংলায় ভোটার তালিকায় (West Bengal Voter list) বিশেষ নিবিড় সংশোধন তথা এসআইআর (SIR) এখনও শুরু হয়নি। তার আগে মূলত দুটি ছবি এখন প্রকট ভাবে ধরা পড়ছে।
.jpeg.webp)
শুভেন্দু অধিকারী, মমতা বন্দ্যোপাধ্যায়
শেষ আপডেট: 2 August 2025 14:50
দ্য ওয়াল ব্যুরো: বাংলায় ভোটার তালিকায় (West Bengal Voter list) বিশেষ নিবিড় সংশোধন তথা এসআইআর (SIR) এখনও শুরু হয়নি। তার আগে মূলত দুটি ছবি এখন প্রকট ভাবে ধরা পড়ছে। একদিকে বিজেপি (BJP)- যারা খুবই উচ্ছ্বসিত, বলা যায় রাজনৈতিক ভাবে এখনই লাফালাফি শুরু করে দিয়েছে। এবং কারও কারও অতি উৎসাহী ভাব এমনই যে ভোটার তালিকায় সংশোধন হলেই বিজেপি ভোটে জিতে যাবে।
বিপরীতে উদ্বেগভরা মুখ দেখা যাচ্ছে তৃণমূলে(TMC)। মমতা বন্দ্যোপাধ্যায় বুথ লেভেল অফিসারদের (BLO) উদ্দেশে পরিষ্কার ভাবে বলেছেন, একজন ভোটারের নামও যেন বাদ না যায়। শুধু তা নয়, জেলা শাসকদেরও তিনি সাফ জানিয়েছেন, ভোটার তালিকা থেকে কারও নাম বাদ যাচ্ছে কিনা ৫-৬ বার যাচাই করে দেখতে হবে।
এখন কৌতূহলের বিষয় হল, ভোটার তালিকায় নিবিড় সংশোধন একটি স্বাভাবিক প্রক্রিয়া। তা নিয়ে এই বিবদমান ছবিটা কেন উঠে আসছে? কার কী বক্তব্য?
নির্বাচনী প্রক্রিয়ায় সংস্কার তথা সচিত্র পরিচয়পত্রের দাবিতে এক সময়ে আন্দোলনে নেমেছিলেন মমতা বন্দ্যোপাধ্যায়। কারণ, তখন বাংলার রাজনীতি বড় অভিযোগ ছিল, ভোটার তালিকায় প্রচুর ভুয়ো ভোটারের নাম ঢুকিয়ে রেখেছে সিপিএম তথা বামেরা। ভোটের সময়ে সেই সব ভুতুড়ে ভোট সিপিএমের ক্যাডাররাই ভোট বাক্সে ফেলে দেয়। সচিত্র পরিচয়পত্র চালু হলে সেই অনাচার ঠেকানো যাবে।
বাংলাদেশি অনুপ্রবেশ নিয়ে মমতা বন্দ্যোপাধ্যায়ের বিরোধিতার মূল কারণও ছিল এই সংক্রান্ত। তৃণমূল ও বিজেপি সেই সময়ে মনে করত, বাংলাদেশের সঙ্গে সীমান্তবর্তী জেলাগুলোতে প্রচুর অনুপ্রবেশকারী রয়েছে। তাদের রেশন কার্ড ও ভোটার কার্ডের ব্যবস্থা করে দিয়েছে সিপিএম। ভোটার তালিকায় এই সব ভুয়ো ভোটার থাকার সুবিধা তখন ক্ষমতাসীন দল হিসাবে সিপিএমই পেত বলে অভিযোগ। কারণ, মমতা বন্দ্যোপাধ্যায়ের বিপুল জনপ্রিয়তা থাকলেও বুথ স্তরে সেই সময়ে তৃণমূলের সংগঠন ছিল দুর্বল। সিপিএমের বাহিনীর সামনে দাঁড়ানোর ক্ষমতা ছিল না। তাই ছাপ্পা ও রিগিং ঠেকাতেও পারত না তৃণমূল।
এখন একই ভাবে বুথ স্তরে সংগঠন দুর্বল বিজেপির। গত বিধানসভা ও লোকসভা ভোটের নিরিখে বাংলায় বিজেপির ৩৮ শতাংশ ভোটার রয়েছে। অথচ অন্তত ৫০ শতাংশের বেশি তথা ৪০ হাজারেরও বেশি বুথে বিজেপির সংগঠন নেই বললেই চলে। শুভেন্দু অধিকারী-শমীক ভট্টাচার্যরা মনে করেন, ভোটার লিস্টে মৃত বা ভুয়ো ভোটারদের যে নাম রয়েছে সেই ভোট দিনের শেষে তৃণমূলই ফেলে দেয়। আধা সামরিক বাহিনী মোতায়েন করেও তা ঠেকানো যায় না। সুতরাং ভোটার লিস্ট থেকে যদি মৃত ভোটার, ভুয়ো ভোটার, বাংলাদেশি অনুপ্রবেশকারী বা স্থায়ী পরিযায়ী শ্রমিকদের নাম যদি বাদ যায়, তবে ভোটে এই ভুয়ো ভোট ফেলার খেলা বন্ধ হয়ে যাবে।
লোকসভা ভোট অনুযায়ী তৃণমূল ও বিজেপির ভোটের ফারাক ছিল ৭.৩ শতাংশ। পশ্চিমবঙ্গে বর্তমানে মোট ভোটার রয়েছে ৭,৬৩,৯৬,১৬৫। সেই হিসাবে দুই দলের মধ্যে ভোটের ফারাক রয়েছে মাত্র ৫৬ লক্ষ। বিজেপি আশা করছে, ভুয়ো ভোটার বা মৃত ভোটারদের নাম বাদ গেলেই এই ফারাকটা কমে দাঁড়াবে ২০ লক্ষেরও কম। তা ছাড়া নতুন ভোটারদের নামও ঢুকবে। সব মিলিয়ে উত্তর ও দক্ষিণবঙ্গের বহু আসনে তৃণমূল ও বিজেপির লড়াইটা আরও টানটান হয়ে যাবে। বিশেষ করে গত বিধানসভা ভোটে বা লোকসভা নির্বাচনে যে যে বিধানসভায় শাসক দলের থেকে মাত্র ৩ থেকে ৫ হাজার ভোটে পিছিয়ে ছিল বিজেপি, সেই সব আসন তাঁরা জেতার জায়গায় চলে যাবেন বলে আশা করছেন শুভেন্দু-শমীকরা।
এ প্রসঙ্গে জানিয়ে রাখা ভাল, বিহারে ভোটার লিস্টে বিশেষ নিবিড় সংশোধনের পর ৬৫ লক্ষ ভোটারের নাম বাদ গিয়েছে। বিহারে বিধানসভার ২৪৪টি আসন রয়েছে। অর্থাৎ গড়ে প্রতিটা বিধানসভা পিছু প্রায় ২৭ হাজার ভোটারের নাম বাদ পড়েছে। এই সংখ্যাটাই উৎসাহ জোগাচ্ছে বিজেপিকে।
ভোটার তালিকায় বিশেষ সংশোধন নিয়ে এরই মধ্যে আপত্তি তুলেছে তৃণমূল। কংগ্রেসের সঙ্গে জোটবদ্ধ হয়ে সংসদ ভবনে রোজ এর প্রতিবাদও করছে। তৃণমূল সাংসদ কল্যাণ বন্দ্যোপাধ্যায়ের কথায়, বিজেপির কথাতেই ভোটার তালিকা সংশোধন করছে নির্বাচন কমিশন। বিজেপি ও আরএসএস একটা তালিকা তৈরি করে দিয়েছে। সেই মোতাবেক বিধানসভা ধরে ধরে ভোটারদের নাম বাদ দেওয়া হচ্ছে।
তৃণমূল নেতাদের কথায়, প্রান্তিক, গরিব ও সংখ্যালঘুদের নাম ভোটার তালিকা থেকে বাদ দেওয়ার ষড়যন্ত্র চলছে। আর তার মাধ্যমেই বিপক্ষকে পরাস্ত করার স্বপ্ন দেখছে বিজেপি।
তৃণমূলের একাংশ নেতার উদ্বেগ, বাংলাদেশ সীমান্তবর্তী জেলার বহু মানুষের নাম ভোটার তালিকা থেকে বাদ দেওয়ার চেষ্টা হতে পারে। তা ছাড়া সরকারি হিসাবে বাংলার ২২ লক্ষ পরিযায়ী শ্রমিক ভিন রাজ্যে কাজ করে। ভোটার তালিকা সংশোধনের সময়ে তাঁদের পাওয়া না গেলে তালিকা থেকে তাঁদের নাম বাদ দেওয়া হতে পারে।
এ ব্যাপারেও আবার তৃণমূলকে খোঁচা দিচ্ছে বিজেপি। সেই সঙ্গে তারা কমিশনের উপর চাপ তৈরি করছে— যে সব পরিযায়ী বছরের বেশির ভাগ সময়ে বাড়িতেই থাকেন না, অন্যত্র ভোটার কার্ড রয়েছে যাঁদের তাঁদের নাম বাদ দিতে হবে। কারণ, ভোটের সময়ে এঁদের ভোটটাও ব্যালট বাক্সে ফেলে দেয় তৃণমূল। এবং সেভাবেই তারা বাড়তি সুবিধা পেয়ে যায়।
বিবদমান এই পরিস্থিতির মধ্যেই প্রশ্ন উঠেছে, ভোটার তালিকায় সংশোধনের কাজ কতটা সুষ্ঠু হবে। দুই রাজনৈতিক দলের চাপের মুখে পড়ে একদিকে বিএলওরা উদ্বেগে পড়েছেন। সেই সঙ্গে উদ্বেগও তৈরি হয়েছে রাজনৈতিক দলের বুথ লেভেল এজেন্টরাই বিএলওদের উপর প্রভাব খাটাবেন না তো! সেদিক থেকে অবশ্য বিজেপি তৃণমূলের থেকে কিছুটা পিছিয়ে রয়েছে। কারণ, বুথ স্তরে তৃণমূলের শক্তি বিজেপির তুলনায় অনেক বেশি।
কমিশনও হয়তো এসব বিষয় নজরে রাখছে। শুক্রবারও জাতীয় নির্বাচন কমিশনের তরফে নবান্নকে চিঠি দিয়ে বলা হয়েছে, মুখ্য নির্বাচন আধিকারিকের জন্য আরও বড় দফতরের ব্যবস্থা করা হোক। এখন দেখার বাংলায় ঠিক কবে থেকে ভোটার তালিকায় নিবিড় সংশোধন শুরু হয় এবং তা শুরু হলে বাস্তবে কী ধরনের প্রতিক্রিয়া হয় গ্রামে গঞ্জে।