সংসার আর সন্তান দেখভালের দায়িত্বের ঘেরাটোপ থেকে অনেকটাই বাইরে বেরিয়ে গেছেন আজকের মেয়েরা। তবুও সনাতন ভাবনা পিছু ছাড়েনি পুরোপুরি। কিন্তু পারমিতার সাইকেলে যে ব্যালেন্স হুইল। নির্ভুলভাবে সামনে এগোচ্ছেন। হাততালি দেওয়ার লোকও মিলছে। এটাই ভরসা জোগাচ্ছে পারমিতাদের।

শেষ আপডেট: 10 November 2025 14:04
দেবাশিস গুছাইত, হাওড়া: কাঁধে ব্যাগ, একহাতে ফর্ম। অন্য হাতে ধরা পাঁচ বছরের সন্তানের হাত। প্রতি বিকেলেই দেখা যাচ্ছে তাঁকে। বাড়ি বাড়ি ঘুরে ভোটার তালিকা সংশোধনের কাজ করে চলেছেন শিবপুরের স্কুলশিক্ষিকা পারমিতা হালদার। মাতৃত্ব ও কর্তব্য— এই দুইয়ের ভারসাম্যে নজির গড়ছেন তিনি।
হাওড়ার শিবপুর বিধানসভা কেন্দ্রের ৯৮ নম্বর বুথের নবীন সংঘ এলাকায় নির্বাচন কমিশনের নিযুক্ত বুথ লেভেল অফিসার হিসেবে দায়িত্ব পালন করছেন পারমিতা। তিনি পেশায় এক স্কুলশিক্ষিকা। স্কুলের দূরত্ব বাড়ি থেকে প্রায় ২৫ কিলোমিটার। প্রতিদিন যতক্ষণ তিনি ক্লাসের দায়িত্ব সামলান, ততক্ষণ তাঁর সন্তানকে দেখাশোনা করেন কাজের দিদি। মা বাড়ি ফিরলেই তাঁর ছুটি। এখন ঘড়ির কাঁটা সাড়ে চারটের ঘর টপকে গেলেও বাড়ি ফেরা হচ্ছে না। ভোটার তালিকা সংশোধনের গুরুত্বপূর্ণ কাজ চলছে যে!
রবিবার বিকেলেও এনুমারেশন ফর্ম আর পাঁচ বছরের ছেলেকে নিয়ে পাড়ায় পাড়ায় ঘুরে বেড়াতে দেখা গেল তাঁকে। ভোটারদের হাতে পৌঁছে দিচ্ছেন ফর্ম, ব্যাখ্যা করছেন প্রয়োজনীয় তথ্য ভর্তির প্রক্রিয়া। পাশে খেলছে ছোট্ট ছেলে, কখনও মায়ের আঁচলে মুখ লুকোচ্ছে, আবার কখনও আবার হাসিমুখে দৌড়ে বেড়াচ্ছে এদিক ওদিক। স্থানীয় ভোটাররা অবাক হয়ে দেখছেন তাঁকে। এলাকার বাসিন্দা ভক্তিপদ মাঝি বললেন, “বড্ড ভালও লাগল বিএলও ম্যাডামকে। ছোট্ট ছেলে নিয়ে কীভাবে দায়িত্ব সামলাচ্ছেন। প্রত্যেকটা তথ্য সুন্দর করে বুঝিয়ে দিচ্ছেন। ছেলেটিও বড্ড মিষ্টি। মা-ছেলে দুজনকেই আমরা স্বাগত জানিয়েছি।”
আরেক বাসিন্দা সব্যসাচী করণ বলেন, “ওনার নিষ্ঠা, দায়িত্ববোধ দেখে অবাক হয়েছি। দেশের কর্তব্য পালন করছেন। আবার মায়ের দায়িত্বও ভোলেননি। এতটা অধ্যবসায় সহজ নয়।" পারমিতা জানালেন,তাঁর স্বামীও খুব ব্য়স্ত। স্কুল চলার সময় ছেলেকে দেখার লোক থাকে, কিন্তু বিকেল সাড়ে চারটার পর থেকে আর কেউ থাকে না। এখন তো কাজ করতে হচ্ছে সন্ধে পর্যন্ত। ভোটাররা যেন ফর্ম না পেয়ে অসুবিধায় না পড়েন, সেই চেষ্টাই করছেন। তাই ছেলেকে সঙ্গে নিয়েই ঘুরছেন দরকার মতো। বললেন, “আমি যেমন মা, তেমনই দেশেরও একজন দায়িত্বপ্রাপ্ত BLO। কাজটা সময়ের মধ্যে শেষ করতে হবে। তাই ছেলেকে নিয়েই ঘুরছি। চেষ্টা করছি দু-দিকই বজায় রাখার। ভোটারদের যাতে অসুবিধা না হয়, আবার ছেলেরও কষ্ট না হয়।"
রাজনৈতিক দলের প্রতিনিধিরাও প্রশংসায় পঞ্চমুখ। এক বিএলএ বিশ্বজিৎ ঘোড়ুই জানান, রবিবার সকাল থেকে সন্ধে পর্যন্ত তাঁকে কাজ করতে দেখেছি। ছোট বাচ্চাকে নিয়ে এমন দায়িত্বশীলভাবে কাজ করা সত্যিই সহজ নয়। সংসার আর সন্তান দেখভালের দায়িত্বের ঘেরাটোপ থেকে অনেকটাই বাইরে বেরিয়ে গেছেন আজকের মেয়েরা। তবুও সনাতন ভাবনা পিছু ছাড়েনি পুরোপুরি। কিন্তু পারমিতার সাইকেলে যে ব্যালেন্স হুইল। নির্ভুলভাবে সামনে এগোচ্ছেন। হাততালি দেওয়ার লোকও মিলছে। এটাই ভরসা জোগাচ্ছে পারমিতাদের।