বিজেপির তৃতীয় তালিকায় মহাচমক! কৃষ্ণনগর উত্তর আসনে কি প্রার্থী হচ্ছেন খোদ প্রধানমন্ত্রীর অর্থনৈতিক উপদেষ্টা সঞ্জীব সান্যাল? বাঙালির 'আঁতেল' মানসিকতা নিয়ে একসময় বিতর্কিত মন্তব্য করা এই অর্থনীতিবিদ কি এবার বাংলার জন্য নতুন ভিশন রোডম্যাপ দেবেন? পড়ুন এক্সক্লুসিভ ইনসাইড স্টোরি।

অশোক লাহিড়ী ও সঞ্জীব সান্যাল।
শেষ আপডেট: 22 March 2026 12:12
রাজনীতি সম্ভাবনার খেলা। শেষ মুহূর্তে পৌঁছেও অনেক কিছু বদলে যায়। তবে সেরকম অঘটন না ঘটলে বিজেপি-র তৃতীয় প্রার্থী তালিকায় (BJP Candidate list 2026 West Bengal) বড় চমক থাকতে পারে। সেই সম্ভাব্য মুখের নাম সঞ্জীব সান্যাল (Sanjeev Sanyal)।
বিজেপির প্রথম তালিকায় বিশিষ্ট অর্থনীতিবিদ ও বর্তমান বিধায়ক অশোক লাহিড়ীর (Ashok Lahiri) নাম না থাকাটাই ছিল অন্যতম বিষ্ময়। একুশ সালে বিধানসভা ভোটে বালুরঘাটে তাঁকে যখন প্রার্থী করা হয়, তখন অনেকেই ধরে নিয়েছিলেন, বিজেপি সরকার গড়তে পারলে ইনিই হবেন রাজ্যের পরবর্তী অর্থমন্ত্রী। অথচ এবার ভোটে সেই ছবিটাই উল্টে গেছে। বরং খবর হল, শেষমেশ অশোক লাহিড়িকে এবার হয়তো প্রার্থী নাও করতে পারে বিজেপি।
প্রশ্ন হল, তা হলে সেই শূন্যস্থান পূরণ করবেন কে?
সূত্রের খবর, সম্ভাব্য সেই বিকল্প নাম হল সঞ্জীব সান্যাল। গত চার বছর ধরে প্রধানমন্ত্রী নরেন্দ্র মোদীর অর্থনৈতিক উপদেষ্টা পর্ষদের সদস্য সঞ্জীব। তার আগে পাঁচ বছর অর্থমন্ত্রী নির্মলা সীতারামনের অর্থনৈতিক উপদেষ্টা ছিলেন। পদাধিকারে তিনি এখন কেন্দ্রের সরকারের সচিব পদের কর্তা।
বিজেপি সূত্রে এও খবর, সঞ্জীব সান্যালকে কৃষ্ণনগর উত্তর (Krishnangar Uttar BJP Candidate) বিধানসভা আসনে প্রার্থী করা হতে পারে। পারিবারিক সূত্রে নদিয়া জেলার সঙ্গে এই বঙ্গ সন্তানের নিবিড় যোগ রয়েছে। সেই কারণেই কৃষ্ণনগর উত্তর আসনের কথা ভাবা হয়েছে।
এই কৃষ্ণনগর উত্তর বিধানসভা থেকে একুশের ভোটে বিজেপি-র টিকিটে জিতেছিলেন মুকুল রায়। পর্যবেক্ষকদের মতে, বাংলায় বিজেপির জন্য যদি একটি নিরাপদ আসন থাকে, তাহলে সেটি হল কৃষ্ণনগর উত্তর।
সঞ্জীবের পারিবারিক পরিচয়ও গৌরবময়। তাঁর বাবা জয়ন্ত সান্যাল ছিলেন ১৯৬৫ ব্যাচের আইএএস অফিসার। সিকিমের ভারতে সংযুক্তিকরণে তাঁর বিশেষ অবদান ছিল। তাঁর পিতামহ শচীন্দ্রনাথ সান্যাল ছিলেন অগ্নিযুগের প্রখ্যাত স্বাধীনতা সংগ্রামী। গদর আন্দোলন-সহ একাধিক চরমপন্থী বৈপ্লবিক সংগ্রামের সঙ্গে জড়িত শচীন্দ্রনাথের নেতৃত্বেই উত্তর ভারতে ভগৎ সিং, চন্দ্রশেখর আজাদের মত বীর বিপ্লবীদের উত্থান ঘটে।
আবার তাঁর মায়ের ঠাকুরদা নলীনাক্ষ সান্যাল ছিলেন বিশিষ্ট অর্থনীতিবিদ, রাজনীতিক ও স্বাধীনতা সংগ্রামী। তিনি বিংশ শতাব্দীর গোড়ায় লন্ডন স্কুল অফ ইকোনমিক্স থেকে অর্থনীতিতে স্নাতকোত্তর করেন ও লন্ডন বিশ্ববিদ্যালয় থেকে পিএইচডি করেন।
একদা ‘রোডস স্কলার’ সঞ্জীবের বাংলার বর্তমান আর্থ সামাজিক অবস্থা নিয়ে অতিশয় অসন্তোষও রয়েছে। একবার একটি সাক্ষাতে তো বলেই দিয়েছিলেন,বাঙালির উচ্চাকাঙ্ক্ষা নেই, সারাদিন সিগারেট ফুঁকে রাজা-উজির মারে।
বাঙালির যে উচ্চাকাঙ্খার অভাব রয়েছে বোঝাতে সঞ্জীব বলেছিলেন,“একটা গুরুত্বপূর্ণ ব্যাপার হল আকাঙ্ক্ষার বা চাহিদার দারিদ্র্য। যদি তোমার সমাজ ভাবে, জীবনের সর্বোচ্চ পর্যায় হল ইউনিয়নের নেতা হওয়া বা আড্ডার বুদ্ধিজীবী বা কলকাতায় যাকে বলে 'আঁতেল', সেরকম কেউ হওয়া, তাহলে তো আর কিছু করার নেই”।
তিনি এও বলেছিলেন, “তুমি যদি ভাবো, তুমি নিজে কিছু করার চাইতে সারাদিন পানীয় বা ধূমপান করতে করতে পৃথিবীর যাবতীয় ঘটনা নিয়ে নিজের বক্তব্য রাখবে; বা যেমন মৃণাল সেনের ছবিতে দেখানো হয়, সেটাই যদি সমাজের চাহিদা বা আকাঙ্ক্ষা হয়, তাহলে তুমি তো সেটাই পাবে। তাহলে আর অভিযোগ করা কেন?”
পরে অবশ্য দ্য ওয়ালকে সঞ্জীব বলেছিলেন, ‘আমার আড্ডায় আপত্তি নেই, কিন্তু আঁতেলবাজিতে আছে। ওটা বাঙালির সংস্কৃতি নয় বলেই মনে করি’।
This is Sanjeev Sanyal, Economic Advisor of the PMO. I was quite shocked and aghast to see the kind of tirade of condescension he has passed on to portray Bengal's society at large. The implied sense here is the society is steeped in debauchery and alcoholism.
1/ pic.twitter.com/6ZWUG13nIa— Snehasis (@SnehasisMukhop4) March 27, 2024
সঞ্জীবের চরম রাগ রয়েছে বামপন্থীদের বিরুদ্ধেও। পশ্চিমবঙ্গে মোহিনী মিলস বন্ধ হওয়ার প্রসঙ্গে কলকাতায় এক বিতর্কসভায় সঞ্জীব বলেছিলেন, পাকিস্তানি সেনাও যা করতে পারেনি, আটের দশকের শুরু থেকে লোডশেডিং, শ্রমিক আন্দোলন মোটামুটিভাবে সেটা শেষ করে দিতে সক্ষম হয়! জ্যোতি বসুর বামফ্রন্ট সরকারের আমলে বেলঘরিয়ায় মোহিনী মিলস বন্ধ হয়ে যায়। সেটাই মোহিনী মিলসের কফিনে শেষ পেরেক ছিল।
তাঁর কথায়,“ফার্স্ট, ডেস্ট্রয়েড বাই পার্টিশন, অ্যান্ড লেটার, জ্যোতি বসু অ্যান্ড দ্য লেফট ফ্রন্ট ফিনিশড দ্য জব দ্যাট দ্য পাকিস্তানি আর্মি স্টার্টেড। বহু হিন্দু রিফিউজি পূর্ব পাকিস্তান ছেড়ে এপারে পালিয়ে এসেছিল। তাঁদের নির্মমভাবে হত্যা করা হয় মরিচঝাঁপিতে”।
সঞ্জীব শেষমেশ বিজেপির প্রার্থী হলে বাংলা নিয়ে তাঁর ভিশন বা রোডম্যাপের কথাও হয়তো জানাবেন নিশ্চয়ই। হতে পারে তিনি কোনও ভিশন ডকুমেন্টও পেশ করবেন।
জানিয়ে রাখা ভাল, পশ্চিমবঙ্গে বিধানসভা ভোটের জন্য বিজেপি এখনও দুটি প্রার্থী তালিকা প্রকাশ করেছে। রাজ্যে ২৯৪টি বিধানসভার মধ্যে ২৫৫টি আসনে প্রার্থী তালিকা ঘোষণা করা হয়েছে। বাকি ৩৯টি আসনে এখনও প্রার্থীর নাম ঘোষণা করা হয়নি। তার মধ্যে উল্লেখযোগ্য কিছু আসন হল, কৃষ্ণনগর উত্তর, হাওড়া দক্ষিণ ইত্যাদি।
বিজেপির দ্বিতীয় প্রার্থী তালিকায় অন্যতম বিষ্ময় ছিল অবসরপ্রাপ্ত আইপিএস রাজেশ কুমারের নাম। দ্য ওয়ালেই সেই খবর সবার আগে প্রকাশ করা হয়েছিল। সূত্রের খবর, আগামী সপ্তাহের মাঝামাঝি সময়ে বিজেপি তাদের নির্বাচনী ইস্তেহার প্রকাশ করবে। তার আগেই তৃতীয় তালিকা প্রকাশ হয়ে যাবে।