একবারের জন্যও রাজ্যের মুখ্যমন্ত্রী মমতা বন্দ্যোপাধ্যায় বা তৃণমূলের সর্বভারতীয় সাধারণ সম্পাদক অভিষেক বন্দ্যোপাধ্যায়ের নাম উচ্চারণ করলেন না মোদী।

গ্রাফিক্স: দ্য ওয়াল
শেষ আপডেট: 17 January 2026 17:41
দ্য ওয়াল ব্যুরো: মালদহের জনসভা থেকে শনিবার ফের তৃণমূল (TMC) সরকারকে আক্রমণ করলেন প্রধানমন্ত্রী নরেন্দ্র মোদী (Narendra Modi)। তবে লক্ষণীয় ব্যাপার, এদিন প্রায় পৌনে এক ঘণ্টার ভাষণে একবারের জন্যও রাজ্যের মুখ্যমন্ত্রী মমতা বন্দ্যোপাধ্যায় (Mamata Banerjee) বা তৃণমূলের সর্বভারতীয় সাধারণ সম্পাদক অভিষেক বন্দ্যোপাধ্যায়ের (Abhishek Banerjee) নাম উচ্চারণ করলেন না তিনি। নাম না করেই গোটা বক্তৃতা জুড়ে শাসকদলকে নিশানা করে গেলেন প্রধানমন্ত্রী (PM Modi)।
সভায় কেন্দ্রীয় প্রকল্পগুলির প্রসঙ্গ তুলে মোদী বলেন, বাংলার মানুষ ঘর, পানীয় জল, বিনামূল্যের রেশন— সব কিছুরই অধিকারী। কেন্দ্র গরিব মানুষের জন্য যে সব যোজনা চালু করেছে, তার সুবিধা বাংলার মানুষ পাওয়ার কথা। কিন্তু বাস্তবে তা হচ্ছে না। তাঁর অভিযোগ, তৃণমূল সরকার নির্মম ও নির্দয়। কেন্দ্র যে টাকা গরিবদের জন্য পাঠায়, তা শাসকদলের লোকজন লুট করে নেয়। তাই তৃণমূলের নেতারাই বাংলার গরিব মানুষের শত্রু।
আয়ুষ্মান ভারতের প্রসঙ্গ টেনে প্রধানমন্ত্রী বলেন, দেশের কোটি কোটি মানুষ পাঁচ লক্ষ টাকা পর্যন্ত বিনামূল্যের চিকিৎসার সুযোগ পেয়েছেন। অথচ বাংলা একমাত্র রাজ্য, যেখানে এই প্রকল্প চালু হতে দেওয়া হয়নি। তাঁর বক্তব্য, ‘‘আমি চাই বাংলার গরিব মানুষও পাঁচ লক্ষ টাকার চিকিৎসা পাক। কিন্তু তৃণমূল সরকার তা আটকে রেখেছে।’’
এর পর সরাসরি সরকার পরিবর্তনের ডাক দেন মোদী। বলেন, ‘‘বাংলায় কুশাসন নয়, সুশাসনের সময় এসেছে। ত্রিপুরা, অসম বিজেপির উপর ভরসা রেখেছে। বাংলাতেও সেই সময় আসবে। বিহারে জয়ের পর বলেছিলাম, মা গঙ্গার আশীর্বাদে বাংলায় উন্নয়নের গঙ্গা বইবে।’’
বিদ্যুৎ প্রকল্পের প্রসঙ্গেও তৃণমূলকে আক্রমণ করেন প্রধানমন্ত্রী। জানান, কেন্দ্রের সৌর বিদ্যুৎ প্রকল্পে দেশের লক্ষ লক্ষ পরিবার উপকৃত হচ্ছে। ছাদে সৌর প্যানেল বসিয়ে বিদ্যুৎ বিল শূন্য করার সুযোগ পাচ্ছেন মানুষ। বাংলার মানুষও সেই সুবিধা পাওয়ার অধিকার রাখে। কিন্তু তৃণমূল সরকার গরিবের ভাল হয়— এমন কোনও কাজ করতে দেয় না বলে অভিযোগ তাঁর।
মালদহের স্থানীয় সমস্যার প্রসঙ্গ তুলে প্রধানমন্ত্রী বলেন, তৃণমূলের দুর্নীতির খেসারত দিচ্ছে এই জেলা। প্রতি বছর নদীভাঙনে অসংখ্য ঘরবাড়ি তলিয়ে যায়। মানুষ বারবার পাড় বাঁধানোর আবেদন জানালেও সরকার গুরুত্ব দেয় না। সিএজি রিপোর্ট উদ্ধৃত করে মোদীর অভিযোগ, বাঁধ নির্মাণের টাকা যাঁদের প্রয়োজন ছিল, তাঁদের দেওয়া হয়নি। বরং তৃণমূলের ঘনিষ্ঠদের নামে বারবার টাকা পাঠানো হয়েছে। তিনি বলেন, ‘‘মালদহের মাটি থেকে বলছি, বাংলায় বিজেপির সরকার হলেই এই কালো দুর্নীতি বন্ধ হবে।’’
অনুপ্রবেশ ইস্যুতেও তৃণমূলকে কাঠগড়ায় তোলেন প্রধানমন্ত্রী। তাঁর দাবি, অনুপ্রবেশ বাংলার সামনে বড় চ্যালেঞ্জ হয়ে দাঁড়িয়েছে। বিশ্বের সমৃদ্ধ দেশগুলিও অনুপ্রবেশকারীদের ফেরত পাঠাচ্ছে। কিন্তু তৃণমূল সরকার থাকলে তা সম্ভব নয়। অভিযোগ করেন, শাসকদলের একটি সিন্ডিকেট দীর্ঘদিন ধরে অনুপ্রবেশকারীদের ভোটার বানাচ্ছে। এর ফলে গরিবদের অধিকার নষ্ট হচ্ছে, যুবকদের কাজ চলে যাচ্ছে, নারীদের নিরাপত্তা বিপন্ন হচ্ছে। মালদহ ও মুর্শিদাবাদের একাধিক এলাকায় হিংসা বাড়ার পিছনেও এই পরিস্থিতি দায়ী বলে দাবি তাঁর। বিজেপি সরকার গঠিত হলে অনুপ্রবেশকারীদের বিরুদ্ধে বড় পদক্ষেপ করা হবে বলেও আশ্বাস দেন মোদী।
শুধু তাই নয়, বেলডাঙায় সম্প্রতি এক মহিলা সাংবাদিক নিগ্রহের প্রসঙ্গ টেনে বলেন, তৃণমূল রাজ্যে স্কুল-কলেজেও মহিলারা সুরক্ষিত নন। অত্যাচার হলে তাঁদের কথা শোনা হয় না, আদালতের দ্বারস্থ হতে হয়। এই পরিস্থিতির বদল জরুরি বলে মন্তব্য করেন তিনি। শেষে ভোটের আবেদন জানিয়ে বলেন, একটি ভোটই বাংলার পুরনো গৌরব ফেরাতে পারে। তৃণমূলের গুন্ডাগিরি ও গরিবদের নিপীড়নের অবসান ঘটবে।
রাজনৈতিক মহলের একাংশের মতে, ভোটমুখী বাংলায় এসে মমতা বা অভিষেকের নাম না নেওয়াটা কৌশলগত। নাম না করে তৃণমূলকে নিশানা করে প্রধানমন্ত্রী আসলে শাসকদলকে ‘সরকার’ হিসেবে কাঠগড়ায় তুলতে চেয়েছেন, ব্যক্তিকেন্দ্রিক আক্রমণের বদলে প্রশাসনিক ব্যর্থতা, দুর্নীতি ও উন্নয়ন আটকে দেওয়ার অভিযোগকে সামনে রেখেছেন। এতে এক দিকে কেন্দ্র বনাম রাজ্য— এই লড়াইয়ের ছবি স্পষ্ট হয়েছে। অন্যদিকে মুখ্যমন্ত্রীকে সরাসরি ‘ভিকটিম’ হওয়ার সুযোগ না দেওয়ার রাজনৈতিক হিসেবও কাজ করেছে বলে মনে করছে রাজনৈতিক শিবির।