কাঞ্চনজঙ্ঘা চূড়ার মাত্র এক হাজার মিটার নীচে এসে থামতে হয় চন্দননগরের ‘পাহাড় কন্যা’ পিয়ালী বসাককে। শারীরিক অসুস্থতা, এবং খারাপ আবহাওয়ার কারণে সামিটের ঠিক আগে সিদ্ধান্ত নিলেন ফিরে আসার।

পিয়ালী বসাক
শেষ আপডেট: 7 June 2025 19:07
দ্য ওয়াল ব্যুরো, হুগলি: কাঞ্চনজঙ্ঘা চূড়ার মাত্র এক হাজার মিটার নীচে এসে থামতে হয় চন্দননগরের ‘পাহাড় কন্যা’ পিয়ালী বসাককে (Piyali Basak)। শারীরিক অসুস্থতা, এবং খারাপ আবহাওয়ার কারণে সামিটের ঠিক আগে সিদ্ধান্ত নিলেন ফিরে আসার। বললেন, “জানতে হবে কোথায় থামতে হয়। পাহাড় থাকবে, চূড়াও থাকবে—আবার উঠব।”
পর্বতারোহণ শুধু পাহাড়ে চড়ার গল্প নয়, কখন কীভাবে এগোতে হবে আর কোথায় থামতে হবে, সেই বোধটাও থাকা দরকার। এবারের পিয়ালীর লক্ষ্য ছিল কাঞ্চনজঙ্ঘা, বিশ্বের তৃতীয় উচ্চতম শৃঙ্গ (Kanchajungha Expedition)। তার আগে অবশ্য পরিকল্পনায় ছিল চিনের শিশাপাংমা অভিযানের। কিন্তু সেই শৃঙ্গের অনুমতি না মেলায় পিয়ালী অভিযানের মোড় ঘুরিয়ে কাঞ্চনজঙ্ঘার দিকে এগিয়ে যান।
গত ৭ এপ্রিল পিয়ালী রওনা দেন চন্দননগর থেকে। স্পনসর ছিল একটি বেসরকারি ব্যাঙ্ক। প্রায় ২০ লক্ষ টাকার সহায়তা করে তারা। যাত্রাপথ কঠিন, অভিযানের আবহাওয়াও বিরূপ। তারমধ্যেও ক্যাম্প ফোর পর্যন্ত পৌঁছে যান পিয়ালী। সেখান থেকেই সামিটের ঠিক আগে অসুস্থ হয়ে পড়েন। জ্বর, কাশি, উচ্চতায় শ্বাসকষ্টের লক্ষণ দেখা দেয়। ভারতীয় সেনার দেওয়া ওষুধে কিছুটা সুস্থ হলেও তাঁর শেরপারা অসুস্থ হয়ে পড়েন। পরবর্তীতে আবহাওয়ার হঠাৎ পরিবর্তন পরিস্থিতিকে আরও কঠিন করে তোলে।
পিয়ালী বলেন, “চূড়ার ১,০০০ মিটার নীচে থেকে ফিরতে হল। জ্বর এসেছিল। সঙ্গে প্রবল কাশি। সেনাবাহিনীর ডাক্তারকে দেখানোর জন্য আবার পিছনে ফিরতে শুরু করি। ডাক্তারের ওষুধে খুব ভাল কাজ হয়। সুস্থ হয়ে আবার এগোনোর ভাবনা করছি যখন তখন শেরপারা অসুস্থ হয়ে পড়েন। তারপর আবহাওয়া খুব খারাপ হয়ে গেল। বুঝেছিলাম, এবার থামা উচিত। কারণ আমি জানি, আবার পরে উঠতে পারব, কিন্তু জীবন চলে গেলে আর ফিরবে না।”
এই তাঁর ১৬তম অভিযান। ইতিমধ্যেই জয় করেছেন আট হাজার মিটার উচ্চতার সাতটি শৃঙ্গ—মানাসুলু, ধৌলাগিরি, লোৎসে, অন্নপূর্ণা, মাকালু, এভারেস্ট। এছাড়াও সাতটি ছোট শৃঙ্গও জয় করেছেন তিনি। ২০২২ সালের ২২ মে পিয়ালী জয় করেছিলেন এভারেস্ট।
পাহাড়ের চূড়া ছোঁয়ার জেদ থাকলেও, জীবনের মূল্য বোঝেন পিয়ালী। অন্নপূর্ণা ও মাকালু অভিযানের সময় মৃত্যুর মুখ থেকে ফিরেছেন তিনি। নিউমোনিয়ায় আক্রান্ত হয়ে নেপালের কাঠমাণ্ডু হাসপাতালে কাটাতে হয়েছিল এক মাসেরও বেশি। তবুও হাল ছাড়েননি। বলেন, “জীবন থাকলে পাহাড়ে আবার ফেরা যাবে। জয় না করতে পারলেও, থামা তো হার নয়।”
গত এক বছরে হারিয়েছেন বাবা তপন বসাক এবং মা স্বপ্না বসাককে—যাঁরা ছোটবেলা থেকেই তাঁকে পাহাড়ের সঙ্গে পরিচয় করিয়েছিলেন। সেই শূন্যতা নিয়েই ফিরে এসেছেন এবার। বাড়িতে একটু বিশ্রাম, স্কুলে যাওয়া আর শরীরচর্চা—এই তাঁর আপাতত রুটিন। পিয়ালীর স্বপ্ন, বিশ্বের সাতটি মহাদেশের সর্বোচ্চ শৃঙ্গ জয় করা। হতে চান বিশ্বের শ্রেষ্ঠ পর্বতারোহীদের একজন। আপাতত কাঞ্চনজঙ্ঘা অধরা হলেও, লড়াই জারি রেখেছেন পিয়ালী বসাক।