সাধারণত দুধ-দইয়ের জন্য পরিচিত উত্তর ভারতের এই নিরামিষভোজী রাজ্য, তারাই এখন মাছ চাষে বিপ্লব ঘটিয়ে দেশের অন্যতম বড় মাছ উৎপাদক হিসেবে পরিচিত।

মাছচাষে বিপ্লব।
শেষ আপডেট: 7 June 2025 18:50
দ্য ওয়াল ব্যুরো: সাধারণত দুধ, দই, গম, মাখন, ঘিয়ের জন্য পরিচিত এই রাজ্য। এসব খেয়েই সেখান থেকে উঠে আসেন তাবড় কুস্তিগীরেরাও। কিন্তু আজ সেই রাজ্যটিই মাছ চাষে রীতিমতো বিপ্লব ঘটিয়ে, নতুন অর্থনৈতিক সম্ভাবনার দিগন্ত খুলে দিয়েছে। রাজ্যটির মৎস্য চাষ এখন দেশব্যাপী একটি সাফল্যের কাহিনি হয়ে উঠেছে। হরিয়ানা। বর্তমানে দেশের মধ্যে গড় মাছ উৎপাদনে দ্বিতীয় শীর্ষ রাজ্য সেটিই। প্রতি হেক্টর জমিতে ১১ হাজার কেজি মাছ উৎপাদিত হয় গড়ে। দেশের গড় হিসেব যেখানে ৩,০০০-৫,০০০ কেজি পর্যন্ত, সেখানে এই রাজ্য যে অনেকটা এগিয়ে, তা বলাই বাহুল্য।
হরিয়ানার বেশিরভাগ অঞ্চলেই কৃষি খাতে সমস্যার সৃষ্টি করেছিল নোনা জল। এই জল কৃষিকাজের জন্য উপযুক্ত ছিল না। কিন্তু এখন সেই একই জল মাছ চাষে এক আশীর্বাদ হিসেবে কাজ করছে। নোনা জলে চিংড়ি এবং অন্যান্য মাছের চাষে নতুন সম্ভাবনার সৃষ্টি হয়েছে, এবং কৃষকদের জীবনযাত্রার মানও উন্নত হয়েছে।
সুমিত্রা কুমারের গল্প
হরিয়ানার করমসানা গ্রামের বাসিন্দা সুমিত্রা কুমারের কথাই ধরা যাক। একসময় তাঁর কৃষি জমিই নষ্ট হয়ে গেছিল নোনা জলে। চাষবাস বন্ধ হয়ে, সংকটের মুখে পড়েছিল গোটা পরিবার। তখনই একটি ইউটিউব ভিডিও দেখে সাদা চিংড়ি চাষের কথা ভাবেন সুমিত্রা। ২০২১ সালে সুমিত্রা এবং তাঁর স্বামী রাজেন্দ্র শুরু করেন সেই চিংড়ি চাষ। আজ, তাঁর ১৫ একর জমির সাদা চিংড়ি চাষ থেকে প্রতি মরশুনে প্রায় ৩০ লক্ষ টাকা আয় হচ্ছে। তাঁদের দোতলা বাড়ি হয়েছে, ছেলেকে ভর্তি করেছেন ভাল ম্যানেজমেন্ট কলেজে।
চিংড়ি চাষের সুবিধা ও অসুবিধা
হরিয়ানার ভৌগোলিক পরিস্থিতি এবং জলবায়ু সাধারণত মাছ চাষের জন্য অনুকূল ছিল না। কিন্তু সেখানেই আজ হাজার হাজার কৃষক মাছ চাষের মাধ্যমে নিজেদের ভাগ্য বদলাচ্ছেন। রাজ্যটি এখন কাতলা, রুই, মৃগেল, পাঙাস, চিংড়ি এবং শিঙ্গি মাছ উৎপাদনে বেশ সাফল্য দেখাচ্ছে। হরিয়ানা চিংড়ি চাষে এখন পাঞ্জাবের চেয়েও এগিয়ে রয়েছে। বিশেষ করে সিরসা জেলায় ১,৭০০ একর জমিতে চিংড়ি চাষ হচ্ছে, যা পাঞ্জাবের মোট জমির থেকেও বেশি।
সুলতান সিং চৌধুরীর গল্প
হরিয়ানার মাছ চাষের ইতিহাসে অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ চরিত্র হচ্ছেন সুলতান সিং চৌধুরী, যিনি ১৯৮২ সালে কর্নাল জেলার বুতানা গ্রামের একটি পুকুরে মাছ চাষ শুরু করেছিলেন। সেই সময়ে, গ্রামের মানুষের কাছে এটি ছিল বেশ ঝুঁকির কাজ। তবে সুলতান তাঁর উদ্যমে ও পরিশ্রমে সফল হন। আজ তাঁর মাছ চাষের ব্যবসা বছরে প্রায় ১ কোটি টাকা লাভের অঙ্কে পৌঁছেছে। তাঁর সেই উদ্যোগই আজ হরিয়ানা সরকারের মাছ চাষের অধ্যায়ের একটি গুরুত্বপূর্ণ অংশ।
চাষের আধুনিক প্রযুক্তি
বর্তমানে হরিয়ানা আধুনিক মাছ চাষের এমন এক প্রযুক্তি ব্যবহার করছে, যা চাষের লাভ অনেকটাই বাড়িয়ে দিয়েছে। সেটি হল, RAS (Recirculating Aquaculture System)। এটি জল পুনর্ব্যবহার প্রযুক্তি, যা মাছ চাষের ফলন বাড়াতে সাহায্য করছে। সুলতান সিংয়ের ফার্মে এই প্রযুক্তি ব্যবহার করেই এক বড় বিপ্লব ঘটে গেছে। ২০১৪ সালে তিনি আমেরিকা এবং ইউরোপ সফরের সময় RAS প্রযুক্তির সঙ্গে পরিচিত হন এবং পরে এটি হরিয়ানায় প্রবর্তন করেন।
মাছ চাষে সরকারের উদ্যোগ
হরিয়ানা সরকারের মাছ চাষে বিপ্লব ঘটানোর জন্য গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রেখেছে ‘প্রধানমন্ত্রী মৎস্য সম্পদ যোজনা’ও (PMMSY)। ২০১৫ সালে ‘নীল বিপ্লব’ শুরু হওয়ার পর, রাজ্য সরকার মৎস্য চাষীদের জন্য নানা স্কিম ঘোষণা করে, যার মাধ্যমে তারা সরকাি সহায়তা পেয়েছে। এছাড়া, বায়োফ্লক এবং RAS প্রযুক্তির ব্যবহারও চাষীদের আয় বাড়াতে সহায়ক হয়েছে।
বিশ্ববাজারের চ্যালেঞ্জ এবং শিক্ষা
মাছ চাষে হরিয়ানা অনেক সাফল্য লাভ করলেও কিছু প্রতিবন্ধকতা রয়েছে। বিশ্বের অন্যান্য বাজারে চাহিদার ওঠানামা, কোভিড মহামারি এবং রাশিয়া-ইউক্রেন যুদ্ধের কারণে অনেক কৃষক ক্ষতির সম্মুখীন হয়েছেন। তবে তাঁরা হাল না ছেড়ে, ফের ঘুরে দাঁড়ানোর সংগ্রামও শুরু করেছেন।
সব মিলিয়ে, মাছ চাষে হরিয়ানা এখন এক নতুন সম্ভাবনার দ্বার উন্মোচন করেছে। হাজার হাজার কৃষক তাঁদের জীবনযাত্রার মান উন্নত করছেন এই পথেই। দেশের অন্যান্য রাজ্যেও এই মডেল অনুসরণ করা হচ্ছে, যা একটি বৃহৎ শিল্পে পরিণত হতে পারে।