এই প্রকল্প শুধু চিকিৎসা নয়, উত্তরবঙ্গের অরণ্যের অস্তিত্ব টিকিয়ে রাখার লড়াইয়ের নতুন অধ্যায়।

শেষ আপডেট: 20 July 2025 17:46
দ্য ওয়াল ব্যুরো: উত্তরবঙ্গের বন্যপ্রাণ সংরক্ষণে এক ঐতিহাসিক পদক্ষেপ নিয়েছে পশ্চিমবঙ্গ সরকার। বক্সা, জলদাপাড়া ও মহানন্দা - এই তিন জৈববৈচিত্র্যে ভরপুর অঞ্চলে গড়ে উঠবে আধুনিক বন্যপ্রাণ হাসপাতাল। বহুদিন ধরে বনকর্মী, পরিবেশবিদ ও পশুপ্রেমীদের যে দাবি ছিল, অবশেষে সেই প্রস্তাবে সায় দিল রাজ্য সরকার।
এই তিনটি হাসপাতালে চিকিৎসা হবে হাতি, গণ্ডার থেকে শুরু করে পাখি, সরীসৃপ ও ছোট স্তন্যপায়ীদেরও। শুধু চিকিৎসাই নয়, এখানে তৈরি হবে প্রশিক্ষণ কেন্দ্র, গবেষণাগার এবং জনসচেতনতার পরিকাঠামো।
এখনও পর্যন্ত উত্তরবঙ্গের জঙ্গলে আহত বন্যপ্রাণীদের চিকিৎসা হত অস্থায়ী ব্যবস্থা বা মাঠেই - যেখানে উপযুক্ত যন্ত্রপাতি, অস্ত্রোপচারের পরিকাঠামো বা নিরাপদ পরিবেশের অভাব ছিল। বন দফতরের উত্তরবঙ্গের চিফ কনজারভেটর অফ ফরেস্টস (ওয়াইল্ডলাইফ) ভাস্কর জে. ভি. জানালেন, “এটা আমাদের সংরক্ষণ প্রচেষ্টায় একটা বড় ঘাটতি ছিল। এখন অনুমোদন পাওয়ার পর ডিটেলড প্রজেক্ট রিপোর্ট (DPR) তৈরি হচ্ছে, এবং আগামী এক বছরের মধ্যেই নির্মাণ শুরু হবে।”
এই হাসপাতালগুলিকে শুধু পশু চিকিৎসালয় বললে ভুল হবে। এটি হতে চলেছে বন্যপ্রাণের জন্য সুপরিকল্পিত চিকিৎসাকেন্দ্র। সেখানে থাকবে - হাতি ও গণ্ডারের জন্য বিশাল অপারেশন থিয়েটার, উন্নত অ্যানেসথেশিয়া ইউনিট, বাইসন ও গণ্ডারের মতো বৃহৎ স্তন্যপায়ী প্রাণীর জন্য বিশেষ ইউএসজি স্ক্যান মেশিন, পাখি ও সরীসৃপদের জন্য পৃথক চিকিৎসা শাখা, জরুরি ট্রমা কেয়ার ও দীর্ঘমেয়াদি চিকিৎসা ব্যবস্থাও থাকবে।
জলদাপাড়া, গোরুমারা, নীচে নেওরা ভ্যালি, চেপরামারি ও বক্সা—এই অঞ্চলগুলি হাতি, চিতা, বাঘ ও গণ্ডারের আবাসভূমি। কিন্তু আধুনিক পরিকাঠামো যেমন রেললাইন, হাইওয়ে - বন্যপ্রাণ ও মানুষের সংঘাত বাড়িয়ে তুলেছে। অনেক পশুই প্রয়োজনীয় চিকিৎসা পায় না, সময়মতো ব্যবস্থা না থাকায় মৃত্যুও হয়েছে বহু।
এই নতুন হাসপাতালগুলি সেই অপূর্ণতার অবসান ঘটাবে বলেই আশাবাদী বন দফতর।
এই কেন্দ্রগুলি ভবিষ্যতের বন্যপ্রাণ চিকিৎসকদের প্রশিক্ষণ কেন্দ্র হিসেবে কাজ করবে। এখানে চলবে গবেষণা, সংরক্ষণ নীতির উন্নয়ন ও প্রাকৃতিক সহাবস্থানের পাঠও।
এক সিনিয়র ফরেস্ট অফিসার বললেন, “এগুলো শুধু হাসপাতাল নয়, আমাদের অরণ্যের কাছে এক প্রতিশ্রুতি। চিকিৎসা, শিক্ষা আর সংরক্ষণের মিলিত প্রয়াস।”
উত্তরবঙ্গের এই অরণ্যে, যেখানে গণ্ডার চরে, হাতি হেঁটে বেড়ায়, আর ছায়ায় ঢেকে থাকে চিতার উপস্থিতি - সেখানে সার্জিক্যাল গ্লাভস আর বিশেষ স্ক্যানারের ছোঁয়ায় প্রাণীরা পেতে চলেছে নতুন জীবন।
এই প্রকল্প শুধু চিকিৎসা নয়, উত্তরবঙ্গের অরণ্যের অস্তিত্ব টিকিয়ে রাখার লড়াইয়ের নতুন অধ্যায়।