ইতিহাসের পাতায় চোখ রাখলেই দেখা যায়—অক্টোবর যেন এই অঞ্চলের জন্য দুর্যোগের সমার্থক মাস।
১৯৬৮ সালের সেই ভয়াবহ রাত—সময়টা ৪ অক্টোবর, ১৯৬৮। লক্ষ্মীপুজোর আগের রাত। টানা বৃষ্টিতে তিস্তা, জলঢাকা, রায়ডাক ফুলেফেঁপে ওঠে।
.jpg.webp)
প্রতীকী ছবি
শেষ আপডেট: 6 October 2025 11:13
দ্য ওয়াল ব্যুরো: আবহাওয়া দফতরের আগাম সতর্কতা কার্যত সত্যি করে শনিবার রাত থেকেই প্রবল বৃষ্টি শুরু হয়েছে উত্তরবঙ্গে(North Bengal News)। পাহাড় থেকে সমতল—সব জায়গায় ধস, প্লাবন (North Bengal Floods) আর মৃত্যুর মিছিল। ভেঙে গিয়েছে সেতু, কালভার্ট, বহু বাড়িঘর। দুর্যোগের এই ছবি দেখে অনেকেরই মনে প্রশ্ন, বেছে বেছে অক্টোবর মাসেই কেন এমন বিপর্যয় আসে?
ইতিহাসের পাতায় চোখ রাখলেই দেখা যায়—অক্টোবর যেন এই অঞ্চলের জন্য দুর্যোগের সমার্থক মাস।
১৯৬৮ সালের সেই ভয়াবহ রাত—সময়টা ৪ অক্টোবর, ১৯৬৮। লক্ষ্মীপুজোর আগের রাত। টানা বৃষ্টিতে তিস্তা, জলঢাকা, রায়ডাক ফুলেফেঁপে ওঠে। বাঁধ ভেঙে ভয়াবহ বন্যা আছড়ে পড়ে জলপাইগুড়ি ও পার্শ্ববর্তী এলাকায়। সরকারি হিসাবে ২১৬ জনের মৃত্যু হলেও স্থানীয়দের দাবি, মৃতের সংখ্যা তার চেয়ে ছিল অনেক বেশি। বাড়ি ঘর, মানুষ, গরু-বাছুর—সব ভেসে গিয়েছিল সেই জলের তোড়ে।
২০২৩ সালের লোনাক হ্রদের বিপর্যয়—এরপর ২০২৩ সালেও অক্টোবরের প্রথম সপ্তাহেই ফিরে এসেছিল সেই ভয়ঙ্কর স্মৃতি। উত্তর সিকিমের চুংথামে দক্ষিণ লোনাক হ্রদের বাঁধ ভেঙে ভয়াবহ বন্যা নামে তিস্তা উপত্যকায়। সেনা ছাউনি ভেসে যায়, ভেঙে পড়ে জাতীয় সড়ক ১০। প্রাণ হারান অন্তত ৫৫ জন। জলপাইগুড়ি ও কোচবিহারের বহু নদী-সংলগ্ন গ্রাম তিস্তায় প্লাবিত হয়, গজলডোবায় দেখা দেয় ভয়ঙ্কর জলস্ফীতি।
২০২৫-এ ফের সেই অক্টোবর! তারিখটা এবার বদলে ৫ অক্টোবর। কিন্তু দৃশ্যপট এক — ধস, বৃষ্টি আর মৃত্যু। দার্জিলিং জেলার মিরিক, সুখিয়াপোখরি, বিজনবাড়ি জুড়ে নেমে এসেছে ভয়াবহ ধস। প্রাণ হারিয়েছেন অন্তত ২৮ জন, যার মধ্যে মিরিকেই ৯ জন। পাহাড়ের ঢাল বেয়ে নেমে আসা কাদা-পাথরে গৃহহীন বহু মানুষ।
তিস্তা, তোর্ষা, বালাসন, রায়ডাক, জলঢাকা, সংকোশ—সব নদী এখন প্রলয়রূপে বয়ে চলেছে। কোচবিহার, দিনহাটা, নাগরাকাটা, বানারহাট, রামসাই—সব জায়গায় জলমগ্ন এলাকা, ভেঙে পড়েছে পরিকাঠামো।
আবহাওয়া দফতর আগে থেকেই সতর্ক করেছিল—শনিবার ও রবিবার ভারী থেকে অতিভারী বৃষ্টি হতে পারে। তবু প্রকৃতির রোষ থেকে বাঁচা গেল না।
আবহবিদদের মতে, গ্লোবাল ক্লাইমেট চেঞ্জের প্রভাবে হিমালয় ঘেঁষা এই অঞ্চলে মৌসুমি বৃষ্টির ধরন বদলেছে। আগেকার মতো জুন-জুলাই নয়, এখন অনেক সময় মৌসুমী বৃষ্টি দেরিতে এসে অক্টোবর পর্যন্ত গড়ায়, আর তখনই পরিমাণে বেড়ে যায় অতিবৃষ্টি ও ধসের আশঙ্কা। অন্যদিকে, নদীর চরভূমি দখল, অবৈজ্ঞানিক নির্মাণ, এবং পাহাড়ে বৃক্ষচ্ছেদন এই বিপর্যয়ের মাত্রা আরও বাড়িয়ে তুলছে।
উত্তরবঙ্গবাসী ফের ভেসে যাচ্ছে বৃষ্টির জলে, ইতিহাস যেন ফিরে আসছে ঘুরে ঘুরে। অক্টোবর—যে মাসটা একসময় ছিল উৎসব ও পর্যটনের, এখন তা হয়ে উঠেছে ভয়ের প্রতীক। প্রশ্ন উঠছে—এই প্রাকৃতিক ক্রোধ কি কেবল কাকতালীয়, না কি প্রকৃতির সেই চিরন্তন প্রতিশোধ, যা মানুষই ডেকে এনেছে নিজের হাতে?