প্রতি বছর দুর্গাপুজোর সময় ও তার পরবর্তী সপ্তাহগুলোতে জলদাপাড়ায় পর্যটকের ঢল নামে। বন দফতরের তথ্য অনুযায়ী, শুধু অক্টোবর মাসেই গড়ে ৭,০০০ থেকে ৯,০০০ পর্যটক জলদাপাড়ায় আসেন—দেশের নানা রাজ্য থেকে, এমনকি বিদেশ থেকেও।

প্রতীকী ছবি
শেষ আপডেট: 6 October 2025 10:49
দ্য ওয়াল ব্যুরো: দুই দিনের টানা প্রবল বর্ষণে বিপর্যস্ত (North Bengal floods) উত্তরবঙ্গের পাহাড় থেকে ডুয়ার্সের জঙ্গলপথ। বৃষ্টির তোড়ে নদী ফুলে ফেঁপে উঠেছে, ভেঙে গিয়েছে একাধিক সেতু, ডুবে গিয়েছে বনাঞ্চলের রাস্তা। এরই মধ্যে মৃত্যু হয়েছে অন্তত ২৮ জনের—তাদের মধ্যে রয়েছেন স্থানীয় বাসিন্দা, পর্যটক, এমনকি জলদাপাড়ার (Jaldapara) গণ্ডার ও হরিণও। প্রকৃতির তাণ্ডবে একপ্রকার বিচ্ছিন্ন হয়ে পড়েছে জলদাপাড়া জাতীয় উদ্যান।
হলং নদীর উপর কাঠের সেতুটি প্রবল স্রোতে ভেসে যাওয়ায় কার্যত বন্ধ হয়ে গেছে জলদাপাড়ার মূল সংযোগপথ। নদীর জল ফুলে ওঠায় জলদাপাড়া টুরিস্ট লজেও আটকে পড়েন ২৫ জন পর্যটক। সোমবার সকালে স্থানীয় প্রশাসন ও বনকর্মীরা তাঁদের উদ্ধার করেন। লজের ভারপ্রাপ্ত ম্যানেজার নিরঞ্জন সাহার উদ্যোগে আর্থ মুভারের সাহায্যে পর্যটকদের নদী পার করানো হয়। এখন ওই লজে আর কোনও পর্যটক নেই।
বন দফতর জানিয়েছে, পর্যটক ও বনকর্মীদের সুরক্ষার স্বার্থে আপাতত জলদাপাড়ার জঙ্গল পর্যটনের জন্য বন্ধ রাখা হয়েছে। রাস্তা, সেতু, নদীপথ ও অন্যান্য অবকাঠামোর ক্ষতি মূল্যায়ন করে তবেই পরবর্তী সিদ্ধান্ত নেওয়া হবে।
Devastating flash floods in northern part of #Bengal - Alipurduar, Jalpaiguri. Even animals are struggling to reach to safety. A rhinoceros is seen coming over to human habitation. In Darjeeling bridges have collapsed, houses destroyed, several feared dead. Rescue operation on pic.twitter.com/EzX0yOlxnZ
— Tamal Saha (@Tamal0401) October 5, 2025
গণ্ডারের রাজ্যে বিপর্যয়ের ছায়া
বাংলার সবচেয়ে বেশি একশৃঙ্গ গণ্ডার পাওয়া যায় জলদাপাড়া জাতীয় উদ্যানে। সাম্প্রতিক গণনায় এখানে গণ্ডারের সংখ্যা প্রায় ৩০ থেকে ৩৫টির মধ্যে, যা রাজ্যের জীববৈচিত্র্যের অন্যতম গর্ব। গণ্ডার ছাড়াও এখানে দেখা মেলে হাতি, চিতল হরিণ, বন্য মহিষ, গৌর, ও নানা প্রজাতির পরিযায়ী পাখির। এবারের অতি বৃষ্টিতে বেশ কিছু বন্যপ্রাণীর মৃত্যু হয়েছে বলে বনকর্মীরা আশঙ্কা করছেন, যদিও সঠিক পরিসংখ্যান এখনও প্রকাশিত হয়নি।
তোর্ষা, মালঙ্গি, হলং, বুরি তোর্ষা, ও দিনাই নদীর উপত্যকায় বিস্তৃত জলদাপাড়া ডুয়ার্সের এক অনন্য ইকোসিস্টেম। ঘন শাল ও সেগুন বন, বালুময় নদীতীর, ও তৃণভূমি মিলে এখানে তৈরি হয়েছে উত্তরবঙ্গের এক প্রাকৃতিক আশ্রয়কেন্দ্র। বৃষ্টির মৌসুমে নদীগুলি চওড়া হয়ে ওঠে, কিন্তু এবারের মতো প্রবল বর্ষণে বহু বনাঞ্চল প্লাবিত হওয়ায় প্রাণীরা আশ্রয় হারিয়েছে। বিশেষ করে গণ্ডার ও হরিণেরা যাদের ঘাসভূমি তাদের মূল বাসস্থান, সেটাই এখন জলের তলায়।
প্রতি বছর দুর্গাপুজোর সময় ও তার পরবর্তী সপ্তাহগুলোতে জলদাপাড়ায় পর্যটকের ঢল নামে। বন দফতরের তথ্য অনুযায়ী, শুধু অক্টোবর মাসেই গড়ে ৭,০০০ থেকে ৯,০০০ পর্যটক জলদাপাড়ায় আসেন—দেশের নানা রাজ্য থেকে, এমনকি বিদেশ থেকেও। গণ্ডার দেখা, জিপ সাফারি, ও হাতির পিঠে ভ্রমণ—সব মিলিয়ে এই মৌসুমেই বনাঞ্চলের সবচেয়ে বেশি রাজস্ব আয় হয়। এবারের প্রাকৃতিক বিপর্যয় সেই মৌসুমেই বড় ধাক্কা দিল স্থানীয় অর্থনীতি ও হোমস্টে ব্যবসায়ীদের।
বন দফতর সূত্রে জানা গিয়েছে, আবহাওয়া কিছুটা স্বাভাবিক হলে রাস্তা ও সেতু মেরামতের কাজ শুরু হবে। তারপরই ধাপে ধাপে পুনরায় পর্যটকদের প্রবেশ অনুমতি দেওয়া হতে পারে। বনকর্মীদের আশা—গণ্ডারের রাজ্য আবার তার পুরনো ছন্দে ফিরবে, যখন জঙ্গলের নিস্তব্ধতা ভাঙবে হাতির হাঁকডাক আর পাখির কলতানে।