এবার শিলাবতীকে কেন্দ্র করে প্রাকৃতিক উপায়ে বন্যা নিয়ন্ত্রণের উপায় খুঁজতে গবেষণা শুরু করল আলিয়া বিশ্ববিদ্যালয়ের ভূগোল বিভাগ। ব্রিটেন ও জাপানের সহায়তায় শুরু হল এই বিশেষ গবেষণা।

শেষ আপডেট: 28 October 2025 15:33
কেন্দ্র রাজ্য টানাপড়েনে ঘাটাল মাস্টার প্ল্যানের ভবিষ্যৎ বরাবরই টালমাটাল। শুধু নিয়ম করে প্রতি বছর শিলাবতী নদীর বন্যায় ভাসে ঘাটালের দাসপুর-সহ বিস্তীর্ণ এলাকা। ঘরবাড়ি-সংসার হারিয়ে ত্রাণ শিবিরে আশ্রয় নিতে হয় মানুষকে। গোটা বছরে একবার-দু'বার এমনই অভিজ্ঞতার মধ্য়ে দিয়ে যেতে হয় বিস্তীর্ণ অঞ্চলের বাসিন্দাদের। তাঁরা আশ্বাস শোনেন। ঘাটাল মাস্টার প্ল্যানে নদী খনন, বাঁধ নির্মাণ, খাল সংস্কার এবং অন্যান্য পরিকাঠামো তৈরি করে ঘাটালকে ঘন ঘন বন্যার কবল থেকে রক্ষা করা হবে। কিন্তু প্রজন্মের পর প্রজন্ম ধরে তা লাগু হতে দেখেন না।
এবার শিলাবতীকে কেন্দ্র করে প্রাকৃতিক উপায়ে বন্যা নিয়ন্ত্রণের উপায় খুঁজতে গবেষণা শুরু করল আলিয়া বিশ্ববিদ্যালয়ের ভূগোল বিভাগ। ব্রিটেন ও জাপানের সহায়তায় শুরু হল এই বিশেষ গবেষণা। এই প্রকল্পে আর্থিক সহায়তা দিচ্ছে ব্রিটেনের ইন্টারন্যাশনাল সায়েন্স পার্টনারশিপ ফান্ড ও ভারতের ইন্ডিয়ান কাউন্সিল অফ সোশ্যাল সায়েন্স রিসার্চ। ইংলন্ডের মার্সি নদী ও এ রাজ্যে শিলাবতী নদীর অববাহিকায় ঘাটালকে কেন্দ্র করে শুরু হয়েছে এই গবেষণার কাজ। গবেষক দলে রয়েছেন ম্যানচেস্টার বিশ্ববিদ্যালয়ের গবেষক ডঃ উপাসক দাস ও ডঃ মেহেবুব সাহানা, জাপানের হোক্কাইডো বিশ্ববিদ্যালয়ের গবেষক ডঃ রাম অবতার, এবং এ রাজ্যের আলিয়া বিশ্ববিদ্যালয়ের দুই অধ্য়াপক ডাঃ আজনারুল ইসলাম ও ডাঃ নাসরিনবানু। প্রকল্পের জন্য বরাদ্দ করা হয়েছে ৮৯ লক্ষ টাকা।
আলিয়া বিশ্ববিদ্যালয়ের ভূগোল বিভাগের অধ্যাপক আজনারুল ইসলাম বলেন, "এই প্রজেক্টটার নাম ন্যাচারাল ফ্লাড ম্যানেজমেন্ট। আমাদের নদীমাতৃক দেশ। তাই বন্যা অনিবার্য। এই বন্যা নিয়ন্ত্রণ করতে গেলে দু'ভাবে ভাবতে হয়। একটা স্ট্রাকচারাল ও অন্যটা নন-স্ট্রাকচারাল। এতদিন স্ট্রাকচারাল অর্থাৎ কংক্রিটের বাঁধ তৈরি, এমব্যাঙ্কমেন্ট এসব প্রথাগত নির্মাণের পথেই হেঁটে এসেছি আমরা। কিন্তু এখন অর্থনীতি ও পরিবেশের কথা মাথায় রেখে একটু অন্যভাবে ভাবা হচ্ছে গোটা বিশ্বে। জোর দেওয়া হচ্ছে প্রাকৃতিক উপায়ে বন্যা নিয়ন্ত্রণে। কারণ নির্ধারিত সময়ের পরে যে কোনও ড্যামের জল ধারণ ক্ষমতা কমে যায়। তখন নতুন কংক্রিটের বাঁধ তৈরির অর্থনৈতিক ও পরিবেশগত দায়বদ্ধতা দুটোই অনেক বেশি হয়ে যায়। সেক্ষেত্রে যদি বন্যা থেকে বাঁচতে প্রাকৃতিক উপায়ে হাঁটা যায় তাহলে যেমন অর্থের সাশ্রয় হবে, তেমনি বাঁচবে পরিবেশ। আমাদের এই প্রজেক্ট মূল আলো ফেলবে সেই জায়গাতেই।"
প্রতিবছর যেহেতু বন্যা ঘাটালের বিস্তীর্ণ অঞ্চলের মানুষের মাথাব্যথার কারণ হয়ে ওঠে তাই শিলাবতীকে বেছে নিয়েছেন তাঁরা। অধ্যাপক আজনারুল ইসলাম জানান, "ইউরোপের বিভিন্ন দেশে বাঁধ দেওয়ার জন্য এখন গাছের গুঁড়িকে বেছে নেওয়া হচ্ছে। এই গাছের গুঁড়ি দিয়ে যে বাঁধ দেওয়া হচ্ছে তাকে ওরা বলছেন লিকি ড্যাম। এই ড্যামের জল চুঁইয়ে বের হচ্ছে। ফলে নীচের দিকে যখন জল নামছে তখন তীব্র স্রোতের গতি অনেকটাই কমে যাচ্ছে। ক্ষয়ক্ষতির পরিমাণও কমছে। এভাবে বাঁধ নির্মাণ যেমন ব্য়য় সাশ্রয়ী তেমনই পরিবেশ সহায়কও বটে। নদীর ধারে পাথর না ফেলে বেশি করে গাছ লাগানোর ভাবনাও সেখানে কার্যকরী হচ্ছে। আমাদের দেশের নদীগুলির ক্ষেত্রে এভাবে আমরা ভাবতে পারি কিনা তা খতিয়ে দেখা হচ্ছে।"
সম্প্রতি এই প্রকল্পের অন্তর্গত লন্ডনের মার্সি নদীর অববাহিকা ঘুরে দেখতে গিয়েছিলেন তাঁরা। প্রতিনিধি দলে সামিল ছিলেন রাজ্যের দূষণ নিয়ন্ত্রণ বোর্ডের চেয়ারম্যান নদী বিশেষজ্ঞ ডঃ কল্যাণ রূদ্র। তিনি বলেন, "মার্সি নদীর স্রোতের সঙ্গে শিলাবতীর কোনও মিল নেই। তাই ওখানে যেভাবে বন্যা নিয়ন্ত্রণ হচ্ছে এখানে তা লাগু হবে না। তবে প্রাকৃতিক উপায়ে বন্যা নিয়ন্ত্রণের এই ভাবনাটা খুবই কার্যকর। বন্যা পুরোপুরি বন্ধ করা যাবে না, কিন্তু প্রাকৃতিক উপায়ে তার প্রকোপ কমানো সম্ভব। একই সঙ্গে বন্যাকে সঙ্গে নিয়ে চলার পাঠটাও খুব জরুরি। এই গবেষণায় এই বিষয়গুলি অনেকটাই পরিষ্কার হবে।" এই গবেষণার শেষে রাজ্যকে রিপোর্ট দেওয়া হবে বলেও জানান তিনি।