দুর্গা, কালী ও জগদ্ধাত্রী (Jagadhatri Puja 2025) এই তিন পুজোরই নেপথ্যে রয়েছে পৌরাণিক, জনশ্রুতির থেকেও বেশি বাস্তবিক আর্থ-সামাজিক প্রেক্ষাপট।

বাঁকুড়া জেলার জয়রামবাটী গ্রামে রামকৃষ্ণ পরমহংসের সহধর্মিণী সারদা দেবীর জন্মভিটার জগদ্ধাত্রী পূজা (Jagadhatri Puja 2025) বিশেষ প্রসিদ্ধ।
শেষ আপডেট: 30 October 2025 13:24
দ্য ওয়াল ব্যুরো: শারদীয়া দুর্গাপুজোর পর, বাংলার বারো মাসের তেরো পার্বণের শেষ বড় পুজো জগদ্ধাত্রী (Jagadhatri Puja 2025)। দুর্গা, কালী ও জগদ্ধাত্রী এই তিন পুজোরই নেপথ্যে রয়েছে পৌরাণিক, জনশ্রুতির থেকেও বেশি বাস্তবিক আর্থ-সামাজিক প্রেক্ষাপট। আর সেটা হল, অষ্টাদশ ও উনবিংশ শতকের মুসলিম ও ইংরেজ আগ্রাসন থেকে বাংলাদেশ তথা হিন্দু সমাজকে রক্ষা করার শক্তি অর্জন করা। আর সেকারণে জন্মাষ্টমী কিংবা নারায়ণ পুজোর থেকেও দিকে দিকে ছড়িয়ে পড়ে শক্তির আরাধনা। এরই মধ্যে কিছু ঘরোয়া পুজোও মাথাচাড়া দেয়, যার পিছনে রয়েছে প্রচলিত কিছু কাহিনি কিংবা প্রবল ভক্তিবিশ্বাস। রামকৃষ্ণ পরমহংসদেব ঘরণী সারদামণি দেবীর বাপের বাড়ির পুজো এই ভাগের মধ্যে পড়ে। যদিও সারদা-ভক্তসাধারণের বিশ্বাস খোদ মা-ই ছিলেন সাক্ষাৎ জগদ্ধাত্রীস্বরূপা। জগদ্ধাত্রী (Jagadhatri Puja 2025) যে দুর্গারই বিকল্প রূপ, তার প্রথম সুস্পষ্ট উল্লেখ পাওয়া যায় শ্রীশ্রীচণ্ডীতে।
বাঁকুড়া জেলার জয়রামবাটী গ্রামে রামকৃষ্ণ পরমহংসের সহধর্মিণী সারদা দেবীর জন্মভিটার জগদ্ধাত্রী পূজা বিশেষ প্রসিদ্ধ। সারদা দেবীর পৈতৃক বাড়িতে এই পূজার আয়োজন করে রামকৃষ্ণ মিশন। ১৮৭৭ খ্রিষ্টাব্দে (১২৮৪ বঙ্গাব্দ) সারদা দেবীর বাপেরবাড়িতে প্রথম জগদ্ধাত্রী পুজোর আয়োজন করেছিলেন তাঁর মা শ্যামাসুন্দরী দেবী। জনশ্রুতি অনুসারে, প্রতি বছর শ্যামাসুন্দরী দেবী প্রতিবেশী নব মুখোপাধ্যায়দের বাড়ির কালীপুজো উপলক্ষে নৈবেদ্যের চাল পাঠাতেন। ওই বছর কোনও বিবাদের কারণে মুখুজ্যেবাড়ি চাল নিতে অস্বীকার করে।
শ্যামাসুন্দরী দেবী অত্যন্ত মর্মাহত হন। সেই রাতেই তিনি দেবী জগদ্ধাত্রীকে স্বপ্নে দেখেন এবং তাঁর স্বপ্নাদেশে ওই চালে জগদ্ধাত্রী পুজোর আয়োজন করেন। প্রথম বছর বিসর্জনের দিন বৃহস্পতিবার ছিল। তাই সারদা দেবী লক্ষ্মীবারে বিসর্জনে আপত্তি করেছিলেন। পরদিন সংক্রান্তি ও তার পরদিন মাস পয়লা থাকায় ওই দুই দিনও বিসর্জন দেওয়া যায়নি। বিসর্জন হয় চতুর্থ দিনে। আরও কথিত যে, পরের বছর সারদা দেবী জগদ্ধাত্রী পুজো বন্ধ করে দিতে চাইলে দেবী জগদ্ধাত্রী তাঁকেও স্বপ্নাদেশে পুজো বন্ধ করা থেকে নিরস্ত করেন। এরপর প্রথম চার বছর পুজো হয়েছিল শ্যামাসুন্দরী দেবীর নামে। দ্বিতীয় চার বছর সারদা দেবীর নামে এবং তৃতীয় চার বছর তাঁর কাকা নীলমাধব মুখোপাধ্যায়ের নামে।
১২ বছর পর সারদা দেবী আবার পুজো বন্ধ করবার ইচ্ছা প্রকাশ করেন। শোনা যায়, এই বারও জগদ্ধাত্রীর স্বপ্নাদেশ পেয়ে তিনি নিরস্ত হন। জীবদ্দশায় প্রতি বছরই জগদ্ধাত্রী পুজোয় উপস্থিত থাকতেন সারদা দেবী। পুজো পরিচালনার জন্য তিনি সাড়ে দশ বিঘার কিছু বেশি জমি দেবোত্তর সম্পত্তিরূপে দিয়ে যান। ১৯১৯ সালে সারদা দেবী এই পুজোয় শেষবার উপস্থিত ছিলেন। পরের বছর তিনি প্রয়াত হন।
সারদা দেবীর পরিচারিকা বাসনাবালা নন্দী দশ বছর বয়সে মায়ের বাড়িতে কাজ করতে আসেন, মায়ের প্রয়াণ পর্যন্ত তিনি তাঁর সঙ্গে থেকে কাজ করেছিলেন। বাসনাবালা নন্দী তাঁর স্মৃতিকথায় বলেছিলেন, “জয়রামবাটীতে আমি একদিন কাছাকাছি একটি গ্রামে পুজো দেখতে যাবার জন্য আবদার করে মায়ের কাছে খুব কান্নাকাটি করছিলাম, মা আমাকে একা ছাড়েননি। রাতে মায়ের পায়ে বাতের তেল মালিশ করার সময় আমাকে খুব আদর করে মা বলেছিলেন,‘তুই যা দেখার জন্য ব্যস্ত হয়েছিস তা তুই এখানে বসেই দেখতে পাবি।’ সেদিন মায়ের পায়ে তেল মালিশ করতে করতে আমি ঘুমিয়ে পড়েছি। হঠাৎ ঘুম ভেঙে গেল। চেয়ে দেখি, চারদিক আলোয় আলো। এত আলো আমার জীবনে আর কোনদিন দেখিনি। যেন আলোয় ভাসছে সারা ঘর। সে-আলোর মধ্যে বসে আছেন জীবন্ত মা জগদ্ধাত্রী। কিন্তু মাকে কোথাও দেখলাম না। আমি ভয় পেয়ে ‘মা, মা’ বলে দরজার খিল খুলে বাইরে এলাম। কোথাও মাকে দেখতে পেলাম না। আবার ঘরের মধ্যে ফিরে এলাম। দেখলাম, মা যেমন শুয়েছিলেন, তেমনি শুয়ে আছেন, ঘুমোচ্ছেন। ঘরের মধ্যে সে আলো আর নেই। মাকে ডাকলাম, মা উঠে বললেন, ‘তুই দেখেছিস তো?’ আমি যা দেখেছি, সব বললাম। মা মিষ্টি হেসে বললেন, যা দেখেছিস সব সত্যি। আমিই জগদ্ধাত্রী, আমিই দুর্গা, আমিই লক্ষ্মী, আমিই সরস্বতী, আমিই কালী। সে রাতেই মা আমাকে তাঁর জগদ্ধাত্রী রূপ দেখিয়েছিলেন। ভয়ঙ্করী নয়, বড় স্নিগ্ধ, বড় সুন্দর সে-রূপ। সে কী ঐশ্বর্য! চোখ বুজলে আজও মনে ভেসে উঠে সেই রূপ।”
আরও জনশ্রুতি রয়েছে যে, খুব ছোটবেলায় একবার জগদ্ধাত্রী পুজোর সময় বালিকা সারদা জগদ্ধাত্রী প্রতিমার সামনে গভীর ধ্যানে আচ্ছন্ন হয়ে পড়েন। সেই অবস্থায় রামহৃদয় ঘোষাল নামে স্থানীয় এক ব্যক্তি অনেকক্ষণ ধরে তাঁকে দেখছিলেন। অনেকক্ষণ ধরে দেখেও তিনি ঠিক করতে পারছিলেন না যে, দুজনের মধ্যে কে 'চিন্ময়ী', আর কে 'মৃন্ময়ী' মা। তাঁর মনে হয়েছিল মাতৃপ্রতিমার সঙ্গে ছোট সারদা যেন মিলেমিশে একাকার হয়ে গিয়েছেন।