বর্ধমান, হাওড়া, তারকেশ্বর থেকে দিল্লি পর্যন্ত ছড়ানো ছিল এদের জাল। এখন পর্যন্ত ২০ জন নারী প্রতারিত, মোট ক্ষতি প্রায় ৩ কোটি টাকা!

গ্রাফিক্স-দ্য ওয়াল।
শেষ আপডেট: 3 November 2025 12:54
দ্য ওয়াল ব্যুরো: প্রেমে পড়বেন বুঝেশুনে! এই এক লাইনেই গর্জে উঠেছে হুগলি গ্রামীণ পুলিশের (Hooghly Police) সোশ্যাল মিডিয়া পোস্ট। কিন্তু এর পেছনের গল্প? শুনলে গা শিউরে উঠবে!
পরিচয়, প্রেম (Love), প্রতিশ্রুতি… তারপর কী? না, সাতপাকে বাঁধা নয়, বরং কোটির প্রতারণা!
সব শুরু এক তরুণীর জীবন থেকে। সিঙ্গুরের বাসিন্দা, বয়স উনত্রিশ। এক বিবাহ-পরিচয় সাইটে (Matrimonial Fraud Exposed) আলাপ হয়েছিল এক যুবকের সঙ্গে, নাম অনুপম রায়। সুপুরুষ, বিনয়ী, কথাবার্তায় ভদ্রতা। নিজেকে পরিচয় দিয়েছিলেন বর্ধমানের এক চালের কলের মালিক হিসেবে। বলেছিলেন, “বাবা-মা নেই, আমি একা।”
দুঃখের কাহিনি শুনে গলে গেল মেয়েটির মন। শুরু হল প্রতিদিনের কথা, হাসি, ভালবাসা— আর সেখান থেকেই শুরু প্রতারণার গল্প।
জানুয়ারি মাসে অনুপম জানালেন, তাঁর ব্যাঙ্ক অ্যাকাউন্ট আয়কর দফতর ‘ফ্রিজ’ করে দিয়েছে। ব্যবসা বন্ধ হওয়ার মুখে। দরকার তাড়াতাড়ি ন’ লক্ষ টাকা! হবু স্ত্রী আর তাঁর পরিবার বিশ্বাস করলেন, প্রেমে পড়ে গেলেন ফাঁদে। টাকাটা চলে গেল অন্য অ্যাকাউন্টে।
কয়েকদিন পর অনুপম পাঠালেন ব্যাঙ্কের সিলমোহর-সহ ডিপোজিট স্লিপ। লিখলেন, “ফেরত পাঠিয়ে দিয়েছি, ব্যাঙ্ক খুললেই টাকা পেয়ে যাবেন।”

কিন্তু সেই টাকা আর এল না। বরং এল আরও টাকার দাবি, আরও মিথ্যে অজুহাত। এমনকি ভিডিও কলে মুখ দেখানোর অনুরোধেও অজুহাত, “নেটওয়ার্ক নেই।”
অবশেষে সন্দেহ জাগে। কিন্তু তখন অনেক দেরি। মোট ৪৩ লক্ষ টাকা উধাও। মে মাসে হঠাৎ উধাও হয় অনুপম রায়, ফোন বন্ধ, প্রোফাইল মুছে ফেলা।
২৭ মে তরুণী পৌঁছন হুগলি গ্রামীণ পুলিশের সাইবার শাখায়। অভিযোগ হাতে নিয়েই নেমে পড়ে পুলিশ। তারপর শুরু হয় গোয়েন্দা-নাটক। জুলাই মাসে গ্রেফতার হয় ৩২ বছরের মডেল অভিষেক রায়, যাঁর অ্যাকাউন্টে গিয়েছিল টাকার কিছু অংশ। তারপর একে একে ধরা পড়ে দুই ভাই জাহির আব্বাস ও জামির আব্বাস — শেষজনকে পুলিশ ধরে ফেলে মন্দারমণির এক রিসর্ট থেকে।
তদন্তে চমকে ওঠে পুলিশও। দক্ষিণ ভারতের এক মডেলের ছবি ব্যবহার করে এরা বানাত ভুয়ো প্রোফাইল— ধনী, শিক্ষিত, নিঃসঙ্গ ‘পাত্র’। তারপর শুরু হতো প্রেম, প্রতিশ্রুতি, আবেগের খেলা। আর তারই ফাঁদে পড়তেন অসংখ্য নারী।
বর্ধমান, হাওড়া, তারকেশ্বর থেকে দিল্লি পর্যন্ত ছড়ানো ছিল এদের জাল। এখন পর্যন্ত ২০ জন নারী প্রতারিত, মোট ক্ষতি প্রায় ৩ কোটি টাকা!
হুগলি গ্রামীণ পুলিশের বার্তা স্পষ্ট: প্রেমে পড়ুন, কিন্তু বুঝেশুনে! ম্যাট্রিমোনিয়াল সাইটে প্রোফাইল দেখেই ভরসা করবেন না।
মুখোমুখি দেখা না হলে, যাচাই না করলে টাকা পাঠানো নয়। সন্দেহ হলে সঙ্গে সঙ্গে জানান পুলিশকে।
শেষে পুলিশের সোশ্যাল পোস্টের কথাতেই ফিরে যাওয়া যাক, “প্রেমে পড়বেন, কিন্তু বুঝেশুনে! কারণ অনলাইনের ওপারে কে আছে, তা সবসময় চোখে দেখা যায় না যে!”