প্রেম নয়, এখন বিয়ের আসল শর্ত ‘সিবিল স্কোর’।

বিয়ের নতুন শর্ত ‘সিবিল স্কোর’
শেষ আপডেট: 17 October 2025 17:28
আমি যে নিজেই মত্ত
জানি না তোমার শর্ত,
যদি বা ঘটে অনর্থ
তবুও তোমায় চাই...
ভালবাসায় আবার শর্ত কী! শর্ত দিয়ে প্রেম-ভালবাসা হয় নাকি! ভাবা হত, যেখানে শর্ত আছে, সেখানে প্রেম নেই। কিন্তু সময়ের সঙ্গে সেই ধ্যানধারণাও বদলেছে। এখনকার ডেটিং বা বিয়ের ক্ষেত্রে এই 'শর্তহীনতা'র ধারণাটি যেন অনেকটাই ম্লান। এখন তো নিজের ইচ্ছেগুলো চাপিয়ে দিয়েই শুরু হয় সম্পর্ক!
কথায় আছে, বিয়ে মানে হাজারো আলাপ-আলোচনা। সেই আলোচনায় পাত্রের রোজগার কত, এমন অস্বস্তিকর প্রশ্নও করা হয়। এদিকে আবার পাত্রী রান্না জানেন কি না, কিংবা পাত্রীর ওজন কত, এসব জানতেও কুণ্ঠাবোধ করেন না পাত্রপক্ষ। তবে এবার নতুন এক প্রশ্ন প্রায়ই পাকা দেখায় উঠে আসে, পাত্রের ‘সিবিল স্কোর’ কত? আর তা যদি হয় খারাপ! ব্যাস, তাহলে তো কোনও কথাই নেই!
বুঝতেই পারছেন পণ, বয়স বা মেডিকেল রিপোর্টের কারণে বহু বিয়ে ভেঙে যাওয়ার ঘটনা ভারতবর্ষে নতুন নয়। নতুন যেটা, তা হল 'সিবিল স্কোর'। হ্যাঁ- এটাই বিয়ে ভাঙার নতুন শর্ত। সিবিল স্কোরের মাপকাঠিই যেন বর্তমানে মহিলা ক্ষমতায়নের এক নতুন অধ্যায় হয়ে উঠেছে। লোন নেওয়া ব্যক্তির সিভিল স্কোর ৩০০ থেকে ৯০০-এর কাছাকাছি হতে পারে। ৯০০-এর যত কাছাকাছি হবে ক্রেডিট রেটিং তত ভাল হবে। এই স্কোর তৈরি হতে ১৮ থেকে ৩৬ মাস সময় লাগে।
‘ভেরি ব্যাড’ সিবিল স্কোরে শেষ ‘ভেরি গুড’ সম্পর্ক
মহারাষ্ট্রের মুর্তিজাপুরের এক যুবকের সঙ্গে দেখাশোনা করে বিয়ে ঠিক হয়েছিল সেখানকারই এক তরুণীর। এদিকে পাত্র বেসরকারি এক কোম্পানিতে চাকরি করে। ফলে মাইনেপত্রও খারাপ না। এসব ভেবেই দুই পরিবারের কথাবার্তা এগোয়। পাত্রেরও পাত্রীকে বেশ পছন্দ। পাকা দেখার দিন এগিয়েই এল। দুই বাড়ির লোকজন বসল বিয়ের দিন ঠিক করতে। সেখানেই দেখা দিল এক 'সমস্যা'। তার নামই ‘সিবিল স্কোর’। কথায় কথা এগতেই পাত্রীপক্ষের ইচ্ছে হল পাত্রের ‘সিবিল স্কোর’ কত, সেটা জানার! আর রেজাল্ট বেরল 'ভেরি ব্যাড'। বেসরকারি চাকুরে ওই যুবকের বেশ অনেকগুলো ঋণ রয়েছে। একাধিক ব্যাঙ্ক থেকে লোন নিয়েছেন। তার মধ্যে অনেকগুলো এখনও শোধ করতে পারেননি। এসব দেখেই চোখ কপালে উঠল পাত্রীপক্ষের। ব্যাস, আর কী! দোনামনা করতে করতে 'হ্যাঁ'-টা নিমেষে 'না'-তে বদলে গেল। সোজা জানিয়ে দিল 'এই বিয়ে হচ্ছে না'! তারপরেই শুরু হল কথা কাটাকাটি। কখন যে একটা হাসিখুশি মহল অমন গরম হয়ে উঠল, তা বোঝাই গেল না।
এ ঘটনা যে একটাই ঘটেছে গোটা দেশে, এমনটা ভাববেন না। এককালে রেডিও-টেলিভিশনের সরকারি বিজ্ঞাপনগুলো বারবার মনে করিয়ে দিত, বিয়ের আগে পাত্র-পাত্রীর ঠিকুজি-কোষ্ঠী দেখার চেয়েও জরুরি হল রক্ত পরীক্ষার রিপোর্ট দেখা। থ্যালাসেমিয়া বা এইচআইভি-র মতো রোগ যাতে ভবিষ্যতে নতুন প্রজন্মকে সমস্যায় না ফেলে, তার জন্যই ছিল এই সতর্কতা। কিন্তু সময় বদলেছে, আর সেই সঙ্গে বদলেছে বিয়ের আগে যাচাইয়ের মানদণ্ড। একাধিক নতুন শর্তও এসেছে। আর এই নতুন শর্তের বাড়বাড়ন্ত নিয়েই আলোচনা করলেন ঐশী মুখার্জ্জী (অ্যাসিস্ট্যান্ট প্রফেসর অফ ল)। দ্য ওয়ালের তরফ থেকে যোগাযোগ করে অনেক খুঁটিনাটিই জানা হল—

আজকাল ভারতে ‘সিবিল স্কোর’ বা 'ক্রেডিট স্কোর' দেখে বিয়ে ভাঙার ঘটনা ক্রমশ বাড়ছে— আপনি এই প্রবণতাকে কীভাবে দেখছেন?
প্রশ্ন শুনেই ঐশী প্রথমে বলেন, "আমার দৃষ্টিকোণ থেকে, এই প্রবণতাকে কেবল একটি আর্থিক সমস্যা হিসেবে দেখলে ভুল হবে। বরং, এটি আমাদের সমাজ ও সম্পর্কের ক্ষেত্রে আসা বেশ কিছু গভীর পরিবর্তনের প্রতিফলনও। সিভিল স্কোর মূলত একজন ব্যক্তির আর্থিক শৃঙ্খলা এবং দায়িত্বজ্ঞানের একটি সংখ্যাভিত্তিক প্রমাণ। আসলে আগে বিয়ের জন্য উপার্জন এবং পারিবারিক পটভূমি দেখা হত। কিন্তু, উপার্জন বেশি হলেও যদি তাঁর প্রচুর ঋণ থাকে এবং ঋণ পরিশোধের অভ্যাস খারাপ হয়, তবে সেই উপার্জন কিন্তু অর্থহীন, তা আমাদের ভাবতে হবে। পরিবারগুলি মনে করছে, ভাল সিভিল স্কোর ভবিষ্যত আর্থিক স্থিতিশীলতা দিতে পারে।
বিয়ের আগে যদি একজন ব্যক্তি বিশেষ কিছু জিনিস গোপন করেন। এই যেমন ধরুন- তাঁর বিরাট ঋণ বা আর্থিক অসঙ্গতি রয়েছে, এবং বিয়ের পর সেই কারণে জীবনসঙ্গী চরম মানসিক ও আর্থিক সংকটে পড়েন, তবে এটা কিন্তু প্রতারণা বা মানসিক নিষ্ঠুরতার কারণ হতে পারে। বিবাহবিচ্ছেদের মামলায় এই ধরনের আর্থিক অসঙ্গতি একটি গুরুত্বপূর্ণ প্রমাণ হিসেবে বিবেচিত হতে পারে। সে কথা ভুলে গেলে একেবারেই চলবে না। ভারতে সিভিল স্কোর দেখে বিয়ে ভাঙার প্রবণতা বাড়ছে কারণ মানুষ এখন আর্থিক স্থিতিশীলতাকে দীর্ঘমেয়াদী সম্পর্কের একটি মৌলিক ও গুরুত্বপূর্ণ দিক হিসেবে দেখছে।
ভারতের মতো সমাজে যেখানে এখনও ভাল চাকরি বা ‘গভর্নমেন্ট পোস্ট’-কে বিয়ের মাপকাঠি হিসেবে ধরা হয়, সেখানে ‘ক্রেডিট স্কোর’ বা ‘সিবিল স্কোর’ নিয়ে এত হইচই কেন?
ভারতের মতো সমাজে, বিশেষত সম্বন্ধ করে বিয়ের ক্ষেত্রে, ভাল চাকরি বা সরকারি পদকে নিঃসন্দেহে স্থিতিশীলতার মাপকাঠি হিসেবে দেখা হয়। এর বিপরীতে, ক্রেডিট স্কোর একটি নতুন এবং 'টেকনিক্যাল বিষয়'। তবুও এটি নিয়ে কেন এত আলোচনা হচ্ছে, তার পেছনে গভীর সামাজিক, অর্থনৈতিক ও আইনি কারণ রয়েছে।
আগে ভাল চাকরি মানেই আর্থিক নিরাপত্তা নিশ্চিত বলে ধরে নেওয়া হত। কিন্তু বর্তমানে পরিস্থিতি বদলেছে, একজন ব্যক্তির সরকারি চাকরি বা উচ্চ বেতনের চাকরি থাকতে পারে, কিন্তু যদি তাঁর জীবনযাত্রার খরচ খুব বেশি হয়, তিনি যদি একাধিক ক্রেডিট কার্ডের ঋণ বা ব্যক্তিগত ঋণ নিয়ে থাকেন এবং সেসব নিয়মিত শোধ করতে ব্যর্থ হন, তাহলে তাঁর সেই মোটা টাকার মাইনেও কোনও কাজে আসে না।
আধুনিক সমাজে, যেখানে জীবনযাত্রার খরচ আকাশছোঁয়া এবং ঋণের জাল সর্বত্র বিস্তৃত, সেখানে কেবল উপার্জনই যথেষ্ট নয়। দায়িত্বশীল আর্থিক আচরণ অপরিহার্য। তাই, ক্রেডিট স্কোর দেখেই বিয়ের ইনিংস শুরু করতে চাইছে বর্তমান সমাজ।
আগে যেখানে ঠিকুজি-কোষ্ঠী বা পারিবারিক ব্যাকগ্রাউন্ড দেখা হত, এখন সেখানে ক্রেডিট স্কোর কেন এত গুরুত্বপূর্ণ হয়ে উঠছে?
ঠিকুজি-কোষ্ঠী দেখে ভাগ্য বা মানসিক সামঞ্জস্য বিচার করা হত, যা ছিল মূলত বিশ্বাস। আর কিছুটা ঐতিহ্য নির্ভরও। কিন্তু আজকালকার দিনে ক্রেডিট স্কোর হল বিগত কয়েক বছরের 'আর্থিক আচরণের' প্রমাণ। এটা কোনও ভবিষ্যদ্বাণী করে দেয় না, বরং চোখে আঙুল দিয়ে দেখায় যে, একজন ব্যক্তি অতীতে দেওয়া 'আর্থিক প্রতিশ্রুতি' কতটা নিষ্ঠার সঙ্গে পালন করেছেন।
আইনের বিভিন্ন ধারা নিয়েই তো সারাদিন ঘাঁটাঘাঁটি, এই গোটা বিষয়টাকে কতটা পজিটিভলি দেখছেন?
এই প্রবণতার সবচেয়ে বড় 'পজিটিভ' দিক হল মানুষের মধ্যে সিবিল স্কোরের গুরুত্ব সম্পর্কে সচেতনতা বৃদ্ধি পাওয়া। আগে বহু মানুষ জানতেনই না যে তাদের ক্রেডিট স্কোর কতটা জরুরি। এখন বিয়ের মতো গুরুত্বপূর্ণ সম্পর্কের কারণে হলেও, মানুষ বাধ্য হচ্ছে নিজের আর্থিক ক্ষমতা সম্পর্কে সচেতন হতে এবং তা ঠিক রাখতে। এটি দেশের অর্থনৈতিক স্বাস্থ্য ভাল করার ক্ষেত্রেও একটি পরোক্ষ পদক্ষেপ।
‘সিবিল স্কোর’ এখন বিয়ের একটা 'নতুন শর্ত', কিন্তু তাই বলে এটা কি ডিভোর্সের কারণ হতে পারে?
এ নিয়ে যখন প্রশ্ন করছেন, তা হলে বলি, আমার সুস্পষ্ট উত্তর হল 'না', সিভিল স্কোর সরাসরি বিবাহবিচ্ছেদের কারণ হতে পারে না। তবে, এর থেকে যে সমস্ত পরিস্থিতি তৈরি হচ্ছে, তা আদালতে বিবাহবিচ্ছেদের কারণ হিসেবে বিবেচিত হতে পারে। ভারতে বিবাহবিচ্ছেদের প্রধান কারণগুলি সাধারণত হিন্দু বিবাহ আইন (Hindu Marriage Act 1955) বা বিশেষ বিবাহ আইনে (Special Marriage Act 1954) নির্দিষ্ট করা আছে।
একটা ভাল সম্পর্ক বা বিয়ে টিকিয়ে রাখতে সিবিল স্কোরের চেয়ে বেশি জরুরি কী বলে আপনি মনে করেন?
বিয়ের মতো একটা সম্পর্ককে সুন্দরভাবে টিকিয়ে রাখার জন্য সিবিল স্কোরকেই সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ মনে করলে, ভুল ভাবা হবে। আসলে, স্বামী-স্ত্রীর মধ্যে টাকা-পয়সা, ঋণ এবং আয়ে নিয়ে সম্পূর্ণ এবং খোলামেলা আলোচনা থাকা খুব দরকার। সঙ্গীর খারাপ স্কোর থাকলেও, যদি তিনি অপরজনের কাছে তা গোপন না করেন, তাহলে তো সমস্যার সমাধান দু'জনের কাছেই থাকবে। একে অপরকে বুঝতেও পারবে খুব সহজে। এটা একটা সুন্দর সম্পর্ক ভেঙে ফেলার কারণ হতে পারে না। মন থেকে চাইলে, সমস্ত সমস্যার সমাধান ঠিক বেরিয়েই আসবে।
যদি কখনও একান্তে
চেয়েছি তোমায় জানতে...
প্রেম করার সময় সঙ্গীর ভাললাগা-খারাপলাগা, কী খেতে পছ্ন্দ করেন, কোথায় ঘুরতে যেতে ভালবাসেন, এমনকি পলিটিক্যাল ভিউও জেনে নেন। কিন্তু সঙ্গী কীসের জন্য কতগুলো লোন নিয়ে রেখেছেন, তা জানতে এখনও অনেকেই আমতা-আমতা করেন। আর যাঁরা সাহস যুগিয়ে বা নিজের কথা ভেবে এই প্রশ্ন ছুড়ে দেন, 'আচ্ছা, তোমার ক'টা লোন চলছে বলো তো? সিবিল স্কোরই বা কত?', তাঁরাই আসলে সংসারের দীর্ঘ ইনিংস খেলার একদম উপযুক্ত। ফলে একান্তে যা-ই জানুন না কেন, এই প্রশ্নটা 'নতুন শর্তের' সিলেবাসে এসেছে বলে, পড়ে ফেলতেই পারেন। কিন্তু এটা যেন সম্পর্ক ভাঙার 'এক ও অন্যতম' কারণ হয়ে না দাঁড়ায়। তবে প্রশ্ন একটা থেকেই যাচ্ছে। আগামী দিনে পাত্র-পাত্রী বিয়ের পিঁড়িতে বসার আগে চোখের দিকে তাকিয়ে আরও একবার গাইতে পারবে তো?
মুক্তা যেমন শুক্তিরও বুকে
তেমনি আমাতে তুমি
আমার পরানে প্রেমের বিন্দু
তুমিই শুধু তুমি...