শান্তিপুর মানেই ঐতিহ্য। ১৪০৯ সালে রাজা গণেশ দানু সাধনদেবের সময় থেকে যে বয়নশিল্পের সূচনা, তা আজ বাংলার অর্থনীতির অন্যতম চাবিকাঠি। যে কারণে মমতা ভাষণই শুরু করেছেন ঐতিহ্যে শান দিয়ে।

মমতা বন্দ্যোপাধ্যায়
শেষ আপডেট: 6 April 2026 15:50
দ্য ওয়াল ব্যুরো: বাংলার জনপদগুলোয় নির্বাচনী ব্যস্ততা যখন তুঙ্গে, তখন রাজনৈতিক সভার মঞ্চে তৈরি হল আটপৌরে প্রচার। নেপথ্যে মমতা বন্দ্যোপাধ্যায় (Mamata Banerjee)। বেথুয়াডহরি থেকে পূর্বস্থলী হয়ে সোমবার শান্তিপুরের জনসভায় প্রচার করছেন মমতা। সেই সভামঞ্চ থেকেই নিজের পরনের শাড়িটি দেখিয়ে তিনি বলেন, “এটি শান্তিপুরের এবং আমার নিজের ডিজাইন করা।”
শান্তিপুর মানেই ঐতিহ্য। ১৪০৯ সালে রাজা গণেশ দানু সাধনদেবের সময় থেকে যে বয়নশিল্পের সূচনা, তা আজ বাংলার অর্থনীতির অন্যতম চাবিকাঠি। যে কারণে মমতা ভাষণই শুরু করেছেন ঐতিহ্যে শান দিয়ে। মমতা বলেন, "আমি শান্তিপুরে মিটিংয়ে এসেছি শুনে, অভিষেকের মা বলেছে, ‘আমার জন্য দুটো শাড়ি এনো’। আমি কি এখন বাজারে যাব না কি! মিটিংয়ে এসেছি। আসলে ও জানে। মজা করছে। এ টুকু তো ‘এক্সপেক্ট’ করতেই পারে বাড়ির বউ। সোনা-দানা চায় না। হার চায় না, দুল চায় না। নববর্ষের আগে দুটো শাড়ি চাইলে সেটা দেব না? এর জন্য কারও উপর তো কারও নির্ভর করার দরকার নেই।"
পরিসংখ্যান বলছে, শান্তিপুরের প্রায় ৮৫ শতাংশ বয়ন এখন যন্ত্রের দখলে। ২০১৫ সালে যে যন্ত্রচালিত তাঁতের অনুপ্রবেশ ঘটেছিল, আজ তা গ্রাস করেছে অধিকাংশ বসতবাড়িকে। হস্তচালিত তাঁতে এখন কেবল পড়ে আছেন বৃদ্ধ বা মহিলারা। জোয়ান পুরুষেরা পেটের টানে ভিন রাজ্যে পাড়ি দিচ্ছেন রাজমিস্ত্রি বা হোটেলের কাজে। কারণ, হাতের কাজে যে পারিশ্রমিক মেলে, তাতে বর্তমান বাজারে সংসার চালানো অসম্ভব। এই পরিসংখ্যান ধরে চললে ১০-১২ বছর পর শান্তিপুরে হস্তচালিত তাঁত হয়তো 'টিমটিমে' হয়ে যাবে।
তবে ভোটের মুখে এই শান্তিপুরেই শাড়ির ব্যবসায় খানিকটা আলো দেখা গেছে। এখন চোখ আটকে যায় ব্লকপ্রিন্টে ব্যস্ত কর্মীদের দিকে। দ্রুত, অভ্যস্ত হাতে সাদা বা অফ-হোয়াইট কাপড়ের উপর ফুটে উঠছে গেরুয়া রঙের পদ্মফুল। একটু পাশেই সমান যত্নে ছাপা হচ্ছে ‘স্বাস্থ্যসাথী’, ‘সবুজসাথী’, ‘কন্যাশ্রী’-র মতো বিভিন্ন সরকারি প্রকল্পের নাম, সঙ্গে জোড়াফুলের নকশা।
এক ঝলক দেখলেই মনে হবে, ভোটের হাওয়া যেন পুরোদমে ঢুকে পড়েছে শান্তিপুরের তাঁতশিল্পে। বাইরে রাজনৈতিক ময়দানে তৃণমূল, বিজেপি বা বাম শিবিরের মধ্যে চলছে তীব্র লড়াই। অথচ তাঁতপল্লির এই কারখানাগুলিতে পদ্ম আর জোড়াফুল যেন পাশাপাশি— এক অনন্য সহাবস্থানের ছবি তুলে ধরছে।
শান্তিপুরের শাড়ি আজ ‘জিআই’ (GI) ট্যাগ পেয়েছে, পেয়েছে রাজকীয় সম্মান। কিন্তু সেই সম্মানের সুতো যাতে কেবল প্রচারের আলোয় আটকে না থাকে, তা নিশ্চিত করাই এখন সবথেকে বড় চ্যালেঞ্জ তাঁতশিল্পীদের কাছে।