রূপান্তরকামী ব্যক্তিদের আইনগত অধিকার, স্বাস্থ্যসেবা ও মানসিক চাহিদা নিয়ে স্বাস্থ্যকর্মীদের সচেতন করতে কলকাতায় অনুষ্ঠিত হল তিনদিনব্যাপী বিশেষ কর্মশালা।

রূপান্তরকামীদের চিকিৎসা। ফাইল চিত্র, গুগল থেকে সংগৃহীত।
শেষ আপডেট: 29 June 2025 15:05
দ্য ওয়াল ব্যুরো: রূপান্তরকামী মানুষদের স্বাস্থ্যসেবা, মানসিক সুস্থতা এবং সামাজিক-আইনগত অধিকার বিষয়ে সচেতনতা বাড়াতে কলকাতায় অনুষ্ঠিত হল তিনদিনের একটি ট্রেনিং ওয়ার্কশপ। সম্প্রতি স্বাস্থ্য ভবনের কনফারেন্স হলে আয়োজিত এই ওয়ার্কশপে অংশ নেন ২৩০ জনেরও বেশি চিকিৎসক, নার্স, কাউন্সেলর, সরকারি কর্মী ও নিরাপত্তারক্ষী।
আইওপি-সিওই (ইনস্টিটিউট অফ সাইকিয়াট্রিক সোশ্যাল ওয়ার্ক), স্বাস্থ্য ও পরিবার কল্যাণ দফতর, পশ্চিমবঙ্গ সরকার এবং কেন্দ্রীয় সামাজিক ন্যায় ও ক্ষমতায়ন মন্ত্রকের অধীন ন্যাশনাল ইন্সটিটিউট অফ সোশ্যাল ডিফেন্স (টিজি বিভাগ) এই কর্মশালার আয়োজন করে। সহযোগিতায় ছিল ইনস্টিটিউট অফ হেলথ অ্যান্ড ফ্যামিলি ওয়েলফেয়ার।
ওয়ার্কশপের মূল উদ্দেশ্য ছিল, রূপান্তরকামী মানুষদের বৈচিত্র্যময় জীবন, চ্যালেঞ্জ ও অধিকার সম্পর্কে স্বাস্থ্যকর্মীদের যথাযথ শিক্ষা দেওয়া এবং তাঁদের জন্য সমতা-ভিত্তিক, সংবেদনশীল, এবং অ-বৈষম্যমূলক স্বাস্থ্যসেবার পথ প্রশস্ত করা।
ওয়ার্কশপের আলোচনায় উঠে আসে, লিঙ্গ পরিচয় ও অভিন্নতা, জেন্ডার ডিসফোরিয়া, এবং সমাজে রূপান্তরকামী মানুষদের অবস্থান, আইনি কাঠামো, মানসিক স্বাস্থ্য সমস্যা, অবসাদ, উদ্বেগ, আত্মহত্যার প্রবণতা, শিশু ও কিশোর বয়সে জেন্ডার পরিচয়ের প্রকাশ ও তার সামাজিক প্রতিক্রিয়া, শারীরিক রূপান্তরের স্বাস্থ্য বিষয়ক দিক যেমন হরমোন থেরাপি, সার্জারি, ও পোস্ট-অপারেটিভ কেয়ার, সমাজে অন্তর্ভুক্তির অভাব, শিক্ষা, চাকরি, বাসস্থান ও পরিচয়পত্রের সমস্যার বাস্তব চিত্র-- ইত্যাদি।
রিপোর্ট অনুযায়ী, ২০১১ সালের আদমশুমারি অনুযায়ী ভারতে রূপান্তরকামী মানুষের সংখ্যা ৪.৮৮ লাখ বলে গণ্য হলেও, প্রকৃত সংখ্যা ৪৮ লাখেরও বেশি হতে পারে। ২০১৯ সালে কলকাতায় আনুমানিক ২৫ হাজার রূপান্তরকামী মানুষ থাকলেও ভোটার তালিকায় নাম ছিল মাত্র ১,৪২৬ জনের।
আরও জানা যায়, রূপান্তরকামীদের মধ্যে বিষণ্ণতা ও উদ্বেগের হার ৪০ থেকে ৬০ শতাংশের মধ্যে। অনেক ক্ষেত্রেই আত্মহত্যার প্রবণতা ৫০% পর্যন্ত পৌঁছয় ২০ বছরে পৌঁছনোর আগেই। পশ্চিমবঙ্গের প্রেক্ষাপটে স্কুলছুট, পরিবারের অস্বীকার, অর্থনৈতিক নির্ভরতা, এবং সমাজে একাকীত্ব তাদের মানসিক স্বাস্থ্যে মারাত্মক প্রভাব ফেলে।
অনেক স্বাস্থ্যকর্মী নিজেই স্বীকার করেন, এখনও অনেক চিকিৎসা কেন্দ্রে রূপান্তরকামীদের সঙ্গে ভুল নাম ধরে ডাকা, কৌতূহলপ্রসূত প্রশ্ন, পরিষেবা না দেওয়া বা অবহেলার মতো ঘটনা ঘটে। এই বৈষম্য তাঁদের চিকিৎসা গ্রহণে ভীতি ও অনাগ্রহ তৈরি করে। তাই ট্রমা ইনফর্মড কেয়ার এবং ইনফর্মড কনসেন্ট মডেল চালুর প্রয়োজনীয়তা জোর দিয়ে আলোচনা হয়।
অনুষ্ঠানে 'অচেনা আয়না' নামে একটি নাটকও পরিবেশন করা হয়, যাতে বাস্তব জীবনে রূপান্তরকামীদের যন্ত্রণা, সামাজিক বঞ্চনা ও নিজস্ব পরিচয় খোঁজার লড়াই তুলে ধরা হয়। নাটকটি পরিচালনা করেন সমাজকর্মী সমরজিৎ দাস। লিখেছিলেন মায়াঙ্ক কুমার ও জয়তু দত্ত। অংশ নেন কলকাতা রিস্তা, প্রচেষ্টা, কোশিশ-এর রূপান্তরকামী সদস্যরাও।
এই ওয়ার্কশপে অংশগ্রহণকারীদের পক্ষ থেকে যেসব সুপারিশ উঠে আসে তা হল, নাম ও লিঙ্গ সংশোধনের জন্য সহজ পদ্ধতি, স্কুল-কলেজে অন্তর্ভুক্তিকরণমূলক নীতি, সরকারি চাকরি ও শিক্ষা ক্ষেত্রে রিজার্ভেশন, আইনগত সহায়তার জন্য পৃথক কেন্দ্র, স্বাস্থ্যকর্মীদের নিয়মিত প্রশিক্ষণ, পরিবার, সমাজ ও শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানে সচেতনতা তৈরি, রূপান্তরকামীদের প্রশাসনিক নীতিনির্ধারণে অংশগ্রহণ নিশ্চিত করা ইত্যাদি।