কলকাতার মণিপাল হাসপাতাল, সল্টলেকে ১০ ঘণ্টার অস্ত্রোপচারে ৬০ বছরের এক মহিলার শরীর থেকে সম্পূর্ণরূপে নির্মূল করা হলো ওভারিয়ান ক্যানসার। এই জটিল অপারেশনে দৃষ্টান্ত স্থাপন করলেন চিকিৎসকেরা।

ডক্টর অরুণাভ রায়।
শেষ আপডেট: 16 July 2025 13:22
দ্য ওয়াল ব্যুরো: প্রযুক্তি, পরিকল্পনা ও পারদর্শিতার মেলবন্ধনে, কলকাতায় সল্টলেকের মণিপাল হাসপাতালে তৈরি হল এক অভূতপূর্ব দৃষ্টান্ত। ৬০ বছর বয়সি এক মহিলার অস্ত্রপোচার করা হল স্টেজ ফোর ওভারিয়ান ক্যানসারে। এই ক্যানসার শুধু ডিম্বাশয়েই সীমাবদ্ধ ছিল না, পেটের অভ্যন্তরে বিভিন্ন অঙ্গ ও এমনকি বুকের লসিকাগ্রন্থিতেও ছড়িয়ে পড়েছিল। এই অবস্থায় ঝুঁকি সত্ত্বেও হাসপাতালের গাইনিক-অঙ্কোসার্জারি টিম প্রায় ১০ ঘণ্টা ধরে এক জটিল অস্ত্রোপচার করে রোগীর শরীর থেকে সমস্ত দৃশ্যমান ক্যানসার কোষ নির্মূল করেন। বর্তমানে রোগী পুরোপুরি ক্যানসারমুক্ত এবং দ্রুত সুস্থ হয়ে উঠছেন।
ভারতের মহিলাদের মধ্যে ওভারিয়ান ক্যানসার হল তৃতীয় সর্বাধিক প্রচলিত ক্যানসার। একে 'নিঃশব্দ ঘাতক' বলা হয়, কারণ এই রোগ প্রথম দিকে খুব একটা উপসর্গ সৃষ্টি করে না। ফলে তা প্রায়শই ধরা পড়ে দেরিতে, যখন ক্যানসার শরীরের বিভিন্ন অংশে ছড়িয়ে যায়। এর চিকিৎসার মূল কৌশল হল, শরীর থেকে প্রতিটি দৃশ্যমান ক্যানসার কোষ সম্পূর্ণরূপে সরিয়ে দেওয়া।
রোগীণী রিনা গাঙ্গুলির (নাম পরিবর্তিত) ক্লিনিক্যাল অ্যাসেসমেন্ট ও অ্যানেস্থেশিয়ার অনুমোদনের পর সিদ্ধান্ত নেওয়া হয়, ‘আপফ্রন্ট র্যাডিকাল সার্জারি’র, যার মূল লক্ষ্য ছিল 'জিরো রেসিডুয়াল ডিজিজট— অর্থাৎ অস্ত্রোপচারের শেষে শরীরে কোনও দৃশ্যমান ক্যানসার কোষ থাকবে না।
অস্ত্রোপচারটি পরিচালনা করেন মণিপাল হাসপাতালের কনসালট্যান্ট গাইনিক অঙ্কোসার্জেন, ডাঃ অরুণাভ রায়। তাঁর সঙ্গে ছিলেন ডাঃ অরুণাশীষ মল্লিক ও ডাঃ নেহা আগরওয়াল।
এই জটিল অস্ত্রোপচারে শরীরের একাধিক অংশ থেকে ক্যানসার কোষ অপসারিত হয়। যেমন, বুকের লসিকাগ্রন্থি, পেটের অভ্যন্তরের চর্বির আবরণ, ডায়াফ্রামের আক্রান্ত অংশ, পেলভিক, ব্লাডার ও অন্ত্র সংলগ্ন পেরিটোনিয়ামের অংশ, বৃহদন্ত্রের একাংশ, অন্ত্রের সঙ্গে সংযুক্ত রক্তনালী, ডিম্বাশয়, জরায়ু, হার্ট-ডায়াফ্রাম সংযোগস্থলের লসিকাগ্রন্থি।
এই অস্ত্রোপচারে একটি গুরুত্বপূর্ণ ধাপ ছিল ‘অ্যানাস্টোমোসিস’—অর্থাৎ অন্ত্র কেটে অপসারণের পর সেটিকে পুনরায় সংযুক্ত করা।
হাসপাতাল সূত্রের খবর, সকাল ৮টা থেকে সন্ধ্যা ৬টা পর্যন্ত এই অপারেশনে মাত্র এক ইউনিট রক্ত দেওয়ার প্রয়োজন পড়ে, যা বর্তমান চিকিৎসা-পদ্ধতিতে অভূতপূর্ব। অ্যানেস্থেশিয়া টিম সার্জারির সময় রোগীর অবস্থা স্থিতিশীল রাখেন। সার্জারির পর রোগী প্রথমে আইসিইউ, তারপর ৪৮ ঘণ্টার মধ্যে এইচডিইউ-তে স্থানান্তরিত হন।
সবচেয়ে আশ্চর্যজনক বিষয়, অস্ত্রোপচারের মাত্র ছ'দিনের মধ্যেই রোগী হাঁটতে, স্নান করতে, স্বাভাবিক খাবার খেতে ও বাথরুমে যেতে পারেন। কোনও পার্শ্বপ্রতিক্রিয়া ছাড়াই, বলতে গেলে সম্পূর্ণ সুস্থ অবস্থায় তাঁকে হাসপাতাল থেকে ছেড়ে দেওয়া হয়।
চিকিৎসক অরুণাভ রায় বলেন, 'এটি ছিল অত্যন্ত চ্যালেঞ্জিং কেস। আমাদের লক্ষ্য ছিল এমনভাবে সার্জারি করা যাতে শরীরে একটি ক্যানসার কোষও না থাকে। নিখুঁত পরিকল্পনা, অপারেশন দক্ষতা এবং পুরো টিমের সমন্বয় ছাড়া এটা সম্ভব হত না। আমরা খুবই সন্তুষ্ট এই অসাধারণ রেজাল্টে। এত কম রক্তক্ষয় এবং রোগীর দ্রুত রিকভারি সত্যিই উৎসাহব্যঞ্জক।'
এই সাফল্যের মাধ্যমে মণিপাল হাসপাতাল প্রমাণ করল যে পূর্ব ভারতের ক্যানসার চিকিৎসা আন্তর্জাতিক মানের কাছাকাছিই পৌঁছে গেছে। অত্যাধুনিক প্রযুক্তি, দক্ষ চিকিৎসক এবং সংগঠিত ক্লিনিক্যাল টিম, রোগীদের জন্য এনে দিচ্ছে নতুন আশার আলো।