পুরো ঘটনাটি ধরা পড়ে স্কুলের সিসিটিভি ক্যামেরায়। দীর্ঘ অনুরোধ ও আলোচনার পর শিশুটির মাকে সেই ফুটেজ দেখতে দেওয়া হয়, যা পরিবারের আশঙ্কাকেই সত্যি প্রমাণ করে।

শেষ আপডেট: 2 March 2026 18:48
দ্য ওয়াল ব্যুরো: কলকাতার সল্টলেকের একটি প্রিস্কুলে তিন বছরের এক শিশুর উপর ভয়াবহ নির্যাতনের (Kolkata preschool child abuse) অভিযোগ ঘিরে চাঞ্চল্য ছড়িয়েছে। অভিযোগ, ‘শাস্তি’ দেওয়ার নামে ওই শিশুটিকে একটি আলমারির মধ্যে ঢুকিয়ে দেওয়া হয় (Salt Lake preschool incident)।
২০ ফেব্রুয়ারির এই ঘটনায় ইতিমধ্যেই পুলিশে অভিযোগ দায়ের হয়েছে, পাশাপাশি তদন্তে নেমেছে পশ্চিমবঙ্গ শিশু অধিকার সুরক্ষা কমিশন (West Bengal Commission for Protection of Child Rights)।
সিসিটিভিতে ধরা পড়ল ঘটনার সম্পূর্ণ চিত্র
শিশুটির বাবার করা অভিযোগ অনুযায়ী, দুই শিক্ষিকা, নাম সায়িতা কর্মকার এবং ইন্দিরা দাস, জোর করে শিশুটিকে একটি আলমারির মধ্যে ঢুকিয়ে দেন। শুধু তাই নয়, যাতে সে বেরোতে না পারে, তার সামনে একটি ভারী টেবিল ঠেসে দেওয়া হয় (corporal punishment preschool)।
পুরো ঘটনাটি ধরা পড়ে স্কুলের সিসিটিভি ক্যামেরায়। দীর্ঘ অনুরোধ ও আলোচনার পর শিশুটির মাকে সেই ফুটেজ দেখতে দেওয়া হয়, যা পরিবারের আশঙ্কাকেই সত্যি প্রমাণ করে।
ভিডিওতে দেখা যায়, এক শিক্ষিকা শিশুটিকে টেনে হিঁচড়ে একটি ফাঁকা ক্লাসরুমে নিয়ে গিয়ে কোণে বসতে বাধ্য করছেন। এরপর একটি টেবিল টেনে এনে শিশুটির সামনে রাখা হয় এবং তাকে জোর করে আলমারির মধ্যে ঢুকিয়ে দেওয়া হয়।
এরপর অন্য এক শিক্ষিকা ঘরে ঢুকে নির্বিকারভাবে জল খেতে খেতে পুরো ঘটনা দেখেন, কিন্তু কোনও হস্তক্ষেপ করেন না। কিছুক্ষণ পর তিনিও ওই নির্যাতনে অংশ নেন। দু’জনে মিলে আলমারির মুখে টেবিল ঠেসে দেন, যাতে শিশুটি বেরোতে না পারে। কয়েক সেকেন্ড ধরে এই পরিস্থিতি চলার পর অবশেষে টেবিল সরিয়ে শিশুটিকে বেরোতে দেওয়া হয়।
মানসিকভাবে ভেঙে পড়েছে শিশুটি
এই ঘটনার পর শিশুটির উপর গুরুতর মানসিক প্রভাব পড়েছে বলে জানা গেছে। কলকাতা বিশ্ববিদ্যালয়ের ক্লিনিক্যাল সাইকোলজি সেন্টারের একটি পর্যবেক্ষণ রিপোর্টে বলা হয়েছে, শিশুটি তীব্র মানসিক ট্রমা, বিরক্তিভাব এবং ঘুমের সমস্যায় ভুগছে। এমনকি, সে এখন স্কুলে যেতে চাইছে না এবং ওই শিক্ষিকাদের মুখোমুখি হতেও অস্বীকার করছে।
বাবার প্রতিক্রিয়া: ‘শেষ পর্যন্ত লড়ব’
ঘটনার খবর পেয়ে বিদেশে থাকা শিশুটির বাবা তড়িঘড়ি কলকাতায় ফিরে আসেন। তিনি সংবাদমাধ্যমকে বলেন, “আমরা সম্পূর্ণ হতবাক। কীভাবে কেউ এমন কাজ করতে পারে? এই ঘটনায় আমরা মানসিকভাবে ভেঙে পড়েছি। আমরা সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষের কাছে অভিযোগ জানিয়েছি এবং শেষ পর্যন্ত লড়াই চালিয়ে যাব। ভবিষ্যতে অন্য কোনও শিশুর সঙ্গে যেন এমন না হয়।”
তদন্তে নামল কমিশন
ঘটনাকে অত্যন্ত গুরুত্ব দিয়ে দেখছে পশ্চিমবঙ্গ শিশু অধিকার সুরক্ষা কমিশন। চেয়ারপার্সন তুলিকা দাস বলেন, “এটি অত্যন্ত দুর্ভাগ্যজনক ঘটনা। প্রতিটি স্কুলেরই একটি 'চাইল্ড প্রোটেকশন পলিসি' থাকা উচিত এবং তা মেনে চলা বাধ্যতামূলক। আমরা ইতিমধ্যেই তদন্ত শুরু করেছি। প্রয়োজন হলে একটি দল স্কুলে যাবে। অভিযুক্ত শিক্ষিকাদের সাসপেনশন ঘটনার গুরুত্ব কমায় না। স্কুলের আরও সহানুভূতিশীল হওয়া উচিত ছিল।”
তিনি আরও জানান, শিশুটির পরিবার ইতিমধ্যেই কমিশনের সঙ্গে যোগাযোগ করেছে এবং কমিশন তাদের পাশে রয়েছে।
স্কুলের দাবি: অভিযুক্তদের বরখাস্ত
অভিযোগের প্রেক্ষিতে স্কুল কর্তৃপক্ষ জানিয়েছে, সংশ্লিষ্ট শিক্ষিকাদের ইতিমধ্যেই চাকরি থেকে বরখাস্ত করা হয়েছে এবং পুলিশকেও লিখিতভাবে বিষয়টি জানানো হয়েছে। স্কুলের তরফে দাবি, তাদের সংস্থা ইউরোকিডস (EuroKids)-এ শারীরিক শাস্তির বিরুদ্ধে ‘জিরো টলারেন্স’ নীতি রয়েছে।
শিশুটির পরিবারকে নিয়ে বৈঠকও করা হয়েছে এবং শিশুটির সুস্থতার জন্য সবরকম সহযোগিতা করা হচ্ছে বলে জানিয়েছে স্কুল।
তবে শিক্ষিকাদের বরখাস্ত করলেই দায় শেষ হয়ে যায় না, এমনটাই মনে করছে শিশুটির পরিবার। তাদের অভিযোগ, স্কুলের নিরাপত্তা ব্যবস্থায় বড় ধরনের ফাঁক ছিল এবং প্রথম দিকে কর্তৃপক্ষের তরফে দায় এড়ানোর প্রবণতাও দেখা গিয়েছে। এই কারণে আইনি লড়াই চালিয়ে যাওয়ার সিদ্ধান্ত নিয়েছে পরিবার।