এক্কেবারে শুরুতে প্রচেত গুপ্ত যে ‘দিকনির্দেশে'র উল্লেখ করেছিলেন, আলাপন বন্দ্যোপাধ্যায়ের ক্লোজার সেই স্থানাঙ্ককে স্পষ্টভাবে এঁকে দেয়। একটি বইয়ের মোড়ক উন্মোচনেও ছাপোষা গ্রন্থ প্রকাশ অনুষ্ঠানের তকমা ছাপিয়ে সহৃদয় বাঙালি শ্রোতার মনে পাক খেয়ে চলে গভীরতর আবর্ত৷
.jpeg.webp)
আলাপন বন্দ্যোপাধ্যায়
শেষ আপডেট: 30 January 2026 11:23
দ্য ওয়াল ব্যুরো: ১৮৭৫ সালে বঙ্কিমচন্দ্র লিখলেন ‘আমার মন’, প্রায় একশো বছর পেরিয়ে বিনয় ঘোষ খুঁজলেন ‘মেট্রোপলিটন মন’ (১৯৭৩)। এর মধ্যে গিরীন্দ্রশেখর থেকে রবীন্দ্রনাথ। কেউ ফ্রয়েডের সঙ্গে বার্তালাপ, কেউ উপন্যাসের প্লট-সংলাপ—বোঝাপড়া চালিয়ে ‘আঁতের কথা’র রহস্যটিকে মেলে ধরলেন পাঠকের দরবারে।
২০২৬-এ দাঁড়িয়ে সমস্ত বিন্দুকে একসূত্রে গাঁথতে চাইলেন আলাপন বন্দ্যোপাধ্যায়। গাঁথলেন যেখানে, তার নাম ‘বাঙালির মন’। ইতোপূর্বে বেরিয়ে গিয়েছে ‘আমলার মন’। তারও আগে ‘বাঙালির সকালসন্ধ্যা’ (২০০০)। সদ্যপ্রকাশিত বই, যার মোড়ক উন্মোচন হল গতকাল, কলকাতা বইমেলার মহাশ্বেতা দেবী অডিটোরিয়ামে, তা অবশ্য পরিকল্পনা কিংবা প্রকরণে পূর্বজ দুই বইয়ের অনুসৃতি নয়৷ লেখকের ভাষায়, ‘বাঙালির মন’ নিখাদ ‘কোলাজচিত্র’। বিচ্ছিন্ন, টুকরো কিছু প্রবন্ধ, যাদের অন্বিষ্ট নানান কোণ ও পরিসর থেকে বাঙালি জীবনের মননের গভীরে আলো ফেলা, তাদের একত্রে দু’মলাটে বিন্যস্ত করা মাত্র।
মোড়ক উন্মোচন অনুষ্ঠানে উপস্থিত ছিলেন সাহিত্যিক শীর্ষেন্দু মুখোপাধ্যায়, প্রচেত গুপ্ত, কবি শ্রীজাত, অধ্যাপক হিমবন্ত বন্দ্যোপাধ্যায়, প্রাবন্ধিক রুশতী সেন। অতিসংক্ষিপ্ত বক্তব্যে প্রচেত ‘মরমের গভীরে গিয়ে লেখা, পরিশ্রমী রচনা’ হিসেবে গ্রন্থের প্রতিটি প্রবন্ধকে ব্যাখ্যা করেন। পাশাপাশি রাষ্ট্র ও সমাজের চোখে বাঙালিকে বিশ্লেষণ, তার পথা চলা চিহ্নিত করা যে এক অর্থে দিকনির্দেশক—দ্ব্যর্থহীন গলায় জানিয়ে দেন তিনি।

প্রায় একই সুর শ্রীজাত-র বক্তব্যে। ‘বাঙালির মন’ সহজপাঠ্য নয়। জানালেন, তা পাঠকের মনোযোগ, সময় ও অভিনিবেশ দাবি করে। পাশাপাশি রাখলেন প্রশ্ন, বইয়ের একটি বিশেষ অংশে ভদ্রলোকের সংকট ও বাংলা কবিতার ক্রমবর্ধমান দুর্বোধ্যতা-র যে প্রসঙ্গ তুলেছেন প্রাবন্ধিক, তা কতখানি যৌক্তিক? কবি তিনি। ফলত, সওয়াল সঙ্গত!
আত্মপক্ষ সমর্থনে আলাপন পেশ করলেন পালটা যুক্তি৷ বুদ্ধদেব বসু, বিষ্ণু দে, সুধীন দত্তেরা কীভাবে দুই বিশ্বযুদ্ধ মধ্যবর্তী মধ্যবিত্ত বাঙালির উত্থানের রহস্যকে হৃদয়ঙ্গম করতে ব্যর্থ হলেন, নিজেদের সংকুচিত ও প্রায় বিচ্ছিন্ন সাংস্কৃতিক পরিমণ্ডলে সাহিত্য রচনায় নিযুক্ত থাকলেন এবং পরের দশকে গণতন্ত্রের বড় আঙিনাকে কাজে লাগিয়ে এই সীমাবদ্ধতা মুছে ফেললেন সুভাষ মুখোপাধ্যায়, নজরুল ইসলাম—আলাপনের আকারে স্বল্প কিন্তু যুক্তিতে তীক্ষ্ম মন্তব্যে কাটল ধোঁয়াশা। মুখে হাসি ফুটল শ্রীজাতর!
পরবর্তী বক্তা হিমবন্ত বন্দ্যোপাধ্যায়। বঙ্কিম (কমলাকান্তের দপ্তর) থেকে সলিলের গান (‘হারাল হারাল মন হারাল’) হয়ে বিনয় ঘোষ—মন নিয়ে বাঙালির মাথাব্যথা, নিরন্তর চর্চা এবং কোথায় এই বই আলাদা—প্রাঞ্জল ঢঙে মেলে ধরলেন। আলাদা করে উল্লেখ করলেন ‘বুদ্ধিজীবীর মন’ অধ্যায়ের৷ ক্রস রেফারেন্সের বুদ্ধিদীপ্ত প্রয়োগ, স্রেফ মধ্যবিত্তে আটকে না থেকে বণিক, উদ্বাস্তু ইত্যকার গোত্রের বাঙালির মননকেও বুঝতে চাওয়ার যে চেষ্টা গ্রন্থে রয়েছে, ভারী গদ্য নয়—প্রায় ‘কবিতার লাবণ্যে’ প্রসঙ্গ থেকে প্রসঙ্গান্তরে পাড়ি জমিয়েছেন প্রাবন্ধিক—বিশেষভাবে এই ব্যাপ্তি ও দীপ্তির প্রশংসা ঝরে পড়ল হিমবন্তের বক্তব্যে।
রুশতী সেন অবশ্য শুধুই আলোচনা নয়, পর্যালোচনা—বলা ভাল, প্রতর্কের জন্ম দিলেন। উসকে দিলেন কৌতূহল, রাখলেন প্রশ্ন। কেন নায়কের মন অধ্যায়ে দেবদাস (শরৎচন্দ্র), অপু (বিভূতিভূষণ) ও দেবু পণ্ডিত (তারাশঙ্কর)? শুধু তাঁরাই প্রতিনিধি? কী করে আলাপন ভুললেন জগদীশ গুপ্তকে? ‘অসাধু সিদ্ধার্থে'র নায়কের মন কি বাঙালির মন নয়? কিংবা দেবেশ রায়ের ‘মানুষ খুন করে কেন’-র অশ্বিনী?
রুশতীর দ্বিতীয় প্রশ্ন, উদ্বাস্তু মনের আলোচনায় প্রফুল্ল রায় এলেন। কিন্তু আটচল্লিশে বসেই যিনি দেশভাগে ছিন্নমূল-যাতনার ইতিবৃত্ত লিখেছেন, সেই সত্যপ্রিয় ঘোষ কেন অনুল্লিখিত? নারীর মনেও লীলা মজুমদার থেকে বেবি হালদার—দীর্ঘ অনুপস্থিতি!
তৃতীয় প্রশ্ন, সন্ন্যাসীর মনে ভাওয়াল সন্ন্যাসীর প্রসঙ্গ এসেছে পার্থ চট্টোপাধ্যায়ের গ্রন্থের অনুষঙ্গ হিসেবে। কিন্তু এখানে মন কার বিশ্লেষিত হল—সন্ন্যাসীর? নাকি ঔপনিবেশিকতার?
আলাপন অবশ্য সমস্ত কূট সওয়ালই মেনে নিলেন এবং রুশতীর বক্তব্যের রেশ ধরেই জানালেন, এই বইয়ে তিনি আদৌ কোনও কালানুক্রমিক ইতিবৃত্ত রচনা করেননি। প্রতিটি স্বতন্ত্র অধ্যায়, তাই সঙ্গতভাবেই, আলাদা আলাদা গ্রন্থ হওয়ার দাবি রাখে। দীর্ঘ পুরুষ ও দীর্ঘতর নারী চরিত্রের অনুপস্থিতি, ‘কোলাজচিত্র’ যে গ্রন্থের সাধারণধর্ম, তার সঙ্গে বোধ হয় বেমানান নয়!
টুকরো টুকরো লেখা, যেখানে বিভিন্ন বর্গের বাঙালির স্থানাঙ্ক খোঁজা হয়েছে, তা পাঠ করে শীর্ষেন্দু মুখোপাধ্যায় অবশ্য স্মৃতিমেদুর। বলতে গিয়ে একাধিকবার উল্লেখ করলেন এই ডিসপ্লেসমেন্টের কথা। উঠে এল নিজের, লেখকের ও সামগ্রিকভাবে বাঙালির বসত-বদলের ঐতিহাসিকতা।
আলোচনার শেষ টানলেন আলাপন নিজে। দেবদাস-ই যে বাঙালি নায়কের অগ্রজ প্রতিনিধি, তা দৃঢ়তার সঙ্গে ঘোষণা করে। শরতের উপন্যাসের নায়কের ফিরে আসা শুধুই হোমকামিং নয়, তা আদতে কর্ম থেকে প্রেমের দিকে, সমাজ থেকে পার্বতীর দিকে, যৌবন থেকে বাল্যের দিকে প্রত্যাবর্তন—তার জেরেই বাঙালির নিজস্ব খণ্ডকাব্য ‘দেবদাস’ আত্মখণ্ডিত এক জাতির নিজস্ব ট্র্যাজেডি হয়ে উঠেছে। এক্কেবারে শুরুতে প্রচেত গুপ্ত যে ‘দিকনির্দেশে'র উল্লেখ করেছিলেন, আলাপন বন্দ্যোপাধ্যায়ের ক্লোজার সেই স্থানাঙ্ককে স্পষ্টভাবে এঁকে দেয়। একটি বইয়ের মোড়ক উন্মোচনেও ছাপোষা গ্রন্থ প্রকাশ অনুষ্ঠানের তকমা ছাপিয়ে সহৃদয় বাঙালি শ্রোতার মনে পাক খেয়ে চলে গভীরতর আবর্ত৷