কলকাতার ১৩০ বছরের ঐতিহ্য হাতে টানা রিকশা হারিয়ে যেতে বসেছে। উত্তর কলকাতায় চালকদের সংবর্ধনার মাধ্যমে স্মরণ করা হল ইতিহাস। ফিরে দেখা রিকশার যাত্রাপথ ও ভবিষ্যতের আশঙ্কা।

ফাইল ছবি
শেষ আপডেট: 12 June 2025 18:42
দ্য ওয়াল ব্যুরো: কলকাতার (Kolkata) ইতিহাসে বাঁধা পড়ে থাকা এক চাকার ঠুং ঠুং ছন্দের দিন হয়তো ফুরিয়ে এল। তার ঠিক আগে, বাগবাজার হাই স্কুলের সামনে দেখা গেল এক অদ্ভুত অথচ হৃদয়গ্রাহী দৃশ্য। উত্তর কলকাতার রাস্তায় ১৩০ বছরের পুরনো একটি ইতিহাসকে সম্মান জানানো হল, হাতে টানা কাঠের রিকশার (Hand Rikshaw) রথী-সরথিদের।
কলকাতা, এই শহরই একদা ছিল ব্রিটিশ শাসনের মূল ঘাঁটি। তখন থেকেই শহরের অলিতে-গলিতে চলত হাতে টানা রিকশা। আধুনিকতার ঢেউতে বদলেছে অনেক কিছু—শাসন, প্রশাসন, যানবাহন। কিন্তু বদলায়নি এই শহরের একটি অবিচ্ছেদ্য চিহ্ন—হাতে টানা কাঠের রিকশা।
আজও কেউ যদি ‘কলকাতা’কে এক ছবিতে ধরতে চান, তবে নিঃসন্দেহে সেখানে থাকবে একটি হাতে টানা রিকশার অবয়ব। গঙ্গার ধারে জন্ম নেওয়া এই শহরের হৃদয়ে গেঁথে আছে কাঠের চাকা, টিনের ছাউনি, আর একজোড়া টানাটানির হাত।
পুরনো কলকাতা—বিশেষত উত্তর ও মধ্য কলকাতার অলিগলি, চিত্তরঞ্জন অ্যাভিনিউ, কলেজ স্ট্রিট, বউবাজার, শ্যামপুকুর অঞ্চলে এখনও টিকে আছে হাতে টানা রিকশা। দক্ষিণ কলকাতার ভবানীপুরের দিকেও মাঝে মাঝে দেখা মেলে এই রিকশার।
তবে এই ঐতিহ্যের শুরু কোথায়? ইতিহাস বলছে, ১৬ শতকের শেষদিকে জাপানের রাস্তায় দেখা যেত এই ধরনের কাঠের হাতে টানা রিকশা। সেখান থেকেই ১৮৯০ সালে এটি এসে পৌঁছায় কলকাতায়। ব্রিটিশ যুগে রিকশার চাহিদা ছিল তুঙ্গে। প্রশাসনিক আধিপত্যের পাশাপাশি একদম লোকজ যাতায়াতের মাধ্যম হয়ে উঠেছিল এই বাহন।
শুধু যাত্রা নয়, এই রিকশা হয়ে উঠেছিল একধরনের শ্রেণিগত দিকচিহ্ন। ধনী, মধ্যবিত্ত, প্রভূত মানুষ চড়তেন এই বাহনে, আর এক শ্রমজীবী মানুষ তাঁর ঘাম দিয়ে টেনে নিয়ে যেত তাঁদের।
চাকা ঘোরানোর সঙ্গে প্রয়োজন হত ভারসাম্য রক্ষার। কোমরের কাছাকাছি থাকা হাতল, সামঞ্জস্য বজায় রেখে হাঁটা, ঝুঁকি নিয়েও ভার বহন করা—এই ছিল একজন রিকশাচালকের প্রতিদিনের জীবন।
তবে অনেক বছর আগেই কলকাতায় হাতে টানা রিকশার লাইসেন্স বাতিল হয়েছে। কিন্তু হাতে গোনা কয়েকজন চালক এখনও তাঁদের পেশা ছাড়েননি। জীবনযুদ্ধে পেশাকে আঁকড়ে থাকা এই মানুষগুলো আজ আর প্রচারের আলোয় নেই, নেই সম্মানের আসনে। বরং সময়ের সঙ্গে তাঁদের চোখ শুকিয়ে যাচ্ছে, পেট চলছে টানাটানিতে।
এই প্রেক্ষাপটে এগিয়ে এলেন কবি, সাহিত্যিক, গীতিকার, সমাজকর্মী ঝর্ণা ভট্টাচার্য। তিনি উত্তর কলকাতার রাস্তায় দাঁড়িয়ে এক অভিনব সম্মাননা জানালেন এই হাতে টানা রিকশাচালকদের। উত্তরীয় পরিয়ে, ফল, জল ও কিছু খাবার দিয়ে তাঁদের হাতে তুলে দিলেন শ্রদ্ধা। শহরের এই হারিয়ে যেতে বসা ইতিহাসকে তুলে ধরলেন মানবিকতার হাত ধরে।
তিনি বললেন, “শুধু ছবি তোলার জন্য নয়, একদিন অলসে বিকেলে ঘুরে আসুন ওনাদের রিকশায় চেপে। দেখবেন কলকাতার অলিগলির কত গল্প জানেন ওনারা। সরকার যদি এঁদের ট্যুরিজমের আওতায় নিয়ে আসে, তবে শহরের ঐতিহ্য বাঁচানো সম্ভব।”
এটাই যদি কলকাতার পর্যটনমুখী ভবিষ্যৎ হয়—হাতে টানা রিকশা হয়ে উঠতে পারে শহরের জীবন্ত স্মৃতিসৌধ। ট্রাম যেমন আজও চলে ঐতিহ্যের টানে, রিকশাও তেমনই চালু থাকতে পারে, তবে আর্থিক সহায়তা, সরকারি স্বীকৃতি ও সম্মানের প্যাকেজ নিয়ে।
তবে কি আর কিছুদিন পরেই শহরের রাস্তায় আর শোনা যাবে না ঠুং ঠুং ঘণ্টির শব্দ? এক মানুষ আরেক মানুষকে টেনে নিয়ে যাচ্ছে—এই চেনা দৃশ্যও হয়তো হারিয়ে যাবে কালের গর্ভে। যেমন হারিয়ে গেছে কাঁধে পালকি, তেমনই হারিয়ে যেতে বসেছে হাতে টানা রিকশাও।
কিন্তু কিছু মানুষ এখনও এই চাকার ঐতিহ্য আঁকড়ে আছেন। তাঁদের সম্মান জানানো মানে শুধুই কয়েকজন চালককে সম্মান জানানো নয়—তা এক শহরের অতীত, সংস্কৃতি ও সংগ্রামকে শ্রদ্ধা জানানো।