অ্যাক্সিডেন্টের পর সেরে ওঠার সময় থেকেই বিদীপ্তা আমাদের কাছে থাকত। সেই বেঁচে ফেরা ওর একটা নতুন জন্ম। ওর নবজন্ম আমাদের সঙ্গেই শুরু হল।

চৈতালি - বিদীপ্তা । গ্রাফিক্স - দিব্যেন্দু দাস
শেষ আপডেট: 13 June 2025 17:11
সম্পর্কটা শাশুড়ি-বৌমার হলেও তাঁরা বন্ধু বেশি। প্রাণের টানে কখন যেন তাঁরা মা-মেয়ে হয়ে গিয়েছেন। যদিও বৌমা শাশুড়িকে ডাকেন কেয়া পিসি বলে আর শাশুড়ি বৌমাকে ডাক নামে সোমা বলেই ডাকেন। আজ বৌমা বিদীপ্তা চক্রবর্তীর জন্মদিনে তাঁকে নিয়ে দ্য ওয়াল-এ গল্প করলেন তাঁর মা চৈতালি দাশগুপ্ত। শাশুড়ি মা ইচ্ছে করেই বললাম না। কারণ দু'জনের সম্পর্কটা মা-মেয়ের।
সঞ্চালিকা চৈতালি দাশগুপ্ত কলকাতা দূরদর্শনের লেজেন্ড । পরবর্তীকালে অভিনেত্রী রূপেও চৈতালি সাফল্য পান। আর বিদীপ্তা চক্রবর্তী চিরকালই নাটক,চলচ্চিত্র ও সিরিয়ালের জনপ্রিয় অভিনেত্রী। কিন্তু সিরিয়ালের শাশুড়ি-বৌমার মতো তু তু ম্যায় ম্যায় সম্পর্ক তাঁদের একদমই নয়।

চৈতালি দাশগুপ্ত আজ বিদীপ্তার জন্মদিনে বললেন ' আমি তো বিদীপ্তাকে বিপ্লবকেতন চক্রবর্তীর মেয়ে হিসেবে ছোটবেলা থেকেই চিনি। আমার বর, রাজা দাশগুপ্তর সিরিয়াল 'একুশে পা' তে ওরা তিন বোন অভিনয় করেছিল। মেজো বোন বিদিশা সবচেয়ে বড় রোল করেছিল। বিদীপ্তা আর সুদীপ্তাও ছিল। তখন থেকেই আমাদের বাড়িতে ওদের আসা-যাওয়া। সেই সময় থেকেই বিদীপ্তা রাজাকে রাজাদা আর আমাকে কেয়াপিসি বলে ডাকত। তারপর তো বিদীপ্তার বিয়ে হয়ে যায়। তখনও আমার সঙ্গে ওর যোগাযোগ ছিল।'
বিদীপ্তা চক্রবর্তীর প্রথম স্বামী ছিলেন ক্যামেরাম্যান শুভাশিস বন্দ্যোপাধ্যায়। ইন্ডাস্ট্রিতে সবাই যাকে লালু বলেই চিনতেন। ভালবেসেই বিয়ে করেছিলেন ওরা। ওঁদের একটি ফুটফুটে কন্যা সন্তান হয়,'মেঘলা'। কিন্তু প্রথম স্বামীর সঙ্গে বিদীপ্তার সংসার সুখের হয়নি। তিক্ত সম্পর্কের থেকে বেরিয়ে আসেন বিদীপ্তা। শিশুকন্যা মেঘলাকে সুস্থ জীবন দিতে ভুল বিয়ে থেকে বেরিয়ে এসেছিলেন অভিনেত্রী। কিন্তু তখন ডিভোর্স পাননি। বিপদ যখন আসে একসঙ্গেই আসে। ঠিক তখনই শ্যুটিং ফ্লোরে বিদীপ্তার হল ভয়ংকর দুর্ঘটনা। বেঁচে যে তিনি ফিরে আসতে পেরেছিলেন তা ভগবানের অশেষ কৃপা। ঘরে-বাইরে বিপর্যস্ত বিদীপ্তাকে তখন স্নেহছায়াতলে আশ্রয় দিয়েছিলেন চৈতালি দাশগুপ্ত। তিনি বিদীপ্তার একাধারে বন্ধু, মা, পিসি সবই।

চৈতালি দাশগুপ্ত আজ অকপটে বললেন 'অ্যাক্সিডেন্টের পর সেরে ওঠার সময় থেকেই বিদীপ্তা আমাদের কাছে থাকত। সেই বেঁচে ফেরা ওর একটা নতুন জন্ম। ওর নবজন্ম আমাদের সঙ্গেই শুরু হল। ওর মেয়ে সোমরির তখন পাঁচ বছর বয়স। মেঘলার ডাক নাম সোমরি। সত্যি পরীর মতোই দেখতে ছিল ওকে। এরপর তো আমার বড় ছেলে বিরসা বম্বে থেকে ফিরল। বিরসা বিদীপ্তার মন বিনিময় হল। তখন বিদীপ্তা ডিভোর্স পাচ্ছিল না, তাই বিরসা-বিদীপ্তা কিছুদিন লিভ-ইন সম্পর্কে একসঙ্গে ছিল। এরমাঝে ওর প্রথম স্বামী অসুস্থ হয়ে পড়ে। প্রথম স্বামীর শেষকৃত্য বিদীপ্তা, সোমরি করেছিল। বিরসা সবসময় বিদীপ্তার সঙ্গে সঙ্গে ছিল। আমাদের বড় নাতনি সোমরির ছোটবেলা কেটেছে দু বাড়ি মিলিয়েই, আমাদের বাড়ি আর বিপ্লবকেতনদা ও দীপালিদিদের বাড়িতে। কাজেই বিদীপ্তার সঙ্গে আমার সম্পর্কটা আগে বন্ধুত্বের ছিল, পরে মা-মেয়ের। আমি তো আমার দুই বৌমাকে মেয়ে বলি। বৌমার সঙ্গে শাশুড়ির যে তথাকথিত বিদঘুটে সম্পর্ক হয়, সেই সম্পর্ক আমাদের নয়। আমরা ওর শ্বশুর-শাশুড়ি হয়ে গেলেও কেয়াপিসি আর রাজাদা ডাকটা বদলায়নি বিদীপ্তার।'

আজ বিদীপ্তার জন্মদিনে কী ভাবে সময় কাটাচ্ছেন চৈতালি-বিদীপ্তা? কেয়া চৈতালি জানালেন দ্য ওয়ালকে 'আজকে সোমার (বিদীপ্তার ডাক নাম) শ্যুটিং আছে। তাই কাল রাতেই আমাদের বাড়িতে কেক কাটা হল, পায়েস খাওয়ালাম প্রাণের বৌমাকে। শাড়ি উপহার দিলাম। বৌমার জন্মদিনে আমি সব বাঙালি রান্না রাঁধলাম ডাল, পাঁচ রকমের ভাজা,পাঁঠার মাংস, পায়েস। আমরা সবাই বাঙালি পদই বেশি পছন্দ করি। বিদেশি ব্যাপার বলতে কেক কাটা হল। আমি আমার দুই বৌমাকেই নিজ হাতে পায়েস রেঁধে খাওয়াই। বরং আমার ছেলেদের অত পায়েস প্রীতি নেই। দুই বৌমা আর নাতনিরা আমার হাতের পায়েস ভীষণ ভালবাসে। ছোট বৌমা কলকাতা থাকলে তার জন্মদিনেও পায়েস খাওয়াই। অনেক কথা আমি বিদীপ্তার সঙ্গে শেয়ার করি। হয়তো যে কথাগুলো ছেলেদের সঙ্গেও শেয়ার করতে পারি না। একজন মেয়ে তো আর একজন মেয়েকে বেশি বোঝে। আমাদের মধ্যে অনেক খোলামেলা কথা হয়। কিন্তু আমাদের সবার নিজস্ব স্পেস আছে। আমরা কেউ কারোর কাজে হস্তক্ষেপ করি না। তবে আমার বুটিক 'শ্রাবস্তী'র প্রদর্শনী হোক বা আমাদের কোনও অনুষ্ঠান সবেতেই আমার পাশে বিদীপ্তা সবসময় থাকে।'

বিদীপ্তার দুই মেয়েও কিন্তু চৈতালি দাশগুপ্তর খুব আদরের। চৈতালি বললেন 'সোমরিকে তো পাঁচ বছর থেকে মানুষ করেছি। ভীষণ ইমোশানাল জায়গা। সোমরির পাঁচ বছরের জন্মদিন আমাদের বাড়িতেই হয়েছিল। তারপর বিদীপ্তা-বিরসার মেয়ে যেদিন হল সেদিন আমার বর রাজাকে মেসেজ করলাম 'ওদের মেয়ে হয়েছে, নাতনি হয়েছে আমাদের'। শুনেই রাজা টেক্সট ব্যাক করল 'ঘরেতে ভ্রমর এল গুনগুনিয়ে'। সেই থেকে আমরা ছোট নাতনিকে ভ্রমর বলেই ডাকি। সবমিলিয়ে আমার চার নাতি-নাতনি। এই জীবনে যা সবথেকে শ্রেষ্ঠ উপহার।'
