বিভীষিকার মধ্যেই সামনে এসেছে বেঁচে ফেরার এক অবিশ্বাস্য গল্প। মৃত্যুকে কার্যত জয় করে ফিরেছেন বিষ্ণুপদ খুঁটিয়া। পূর্ব মেদিনীপুরের ময়নার চাঁদিবেনিয়ার বাসিন্দা বিষ্ণুপদ ওই কারখানার মধ্যেই ছিলেন ঘটনার রাতে।

বিষ্ণুপদ খুঁটিয়া
শেষ আপডেট: 27 January 2026 18:43
দ্য ওয়াল ব্যুরো: আনন্দপুরের নাজিরাবাদে কারখানার ভয়াবহ অগ্নিকাণ্ডে (Anandapur Fire Incident) ঠিক কত জনের মৃত্যু হয়েছে, তা এখনও নিশ্চিত নয়। সরকারি ভাবে এখনও পর্যন্ত মৃতের নির্দিষ্ট সংখ্যা জানানো হয়নি। তবে স্থানীয় ও অসমর্থিত সূত্রে দাবি করা হচ্ছে, এই ঘটনায় অন্তত আট জনের মৃত্যু হয়েছে এবং নিখোঁজ রয়েছেন ২০ জনেরও বেশি। উদ্ধারকাজ চললেও ধ্বংসস্তূপের ভিতরের পরিস্থিতি এতটাই ভয়াবহ যে মৃতের সংখ্যা আরও বাড়তে পারে বলে আশঙ্কা ক্রমশ জোরাল হচ্ছে।
এই বিভীষিকার মধ্যেই সামনে এসেছে বেঁচে ফেরার এক অবিশ্বাস্য গল্প। মৃত্যুকে কার্যত জয় করে ফিরেছেন বিষ্ণুপদ খুঁটিয়া। পূর্ব মেদিনীপুরের (Purba Medinipur) ময়নার চাঁদিবেনিয়ার বাসিন্দা বিষ্ণুপদ ওই কারখানার মধ্যেই ছিলেন ঘটনার রাতে। সেই রাতের অভিজ্ঞতার কথা বলতে গিয়ে তিনি জানান, রবিবার রাতে খাওয়াদাওয়া সেরে প্রতিদিনের মতোই শুয়ে পড়েছিলেন। রাত তখন ন’টা থেকে সাড়ে ন’টার মধ্যে। গভীর ঘুমের মধ্যেই হঠাৎ চিৎকারে ঘুম ভেঙে যায়। বাইরে থেকে কেউ চেঁচিয়ে বলছিল, আগুন লেগেছে, এখনই বেরোতে না পারলে আর বাঁচা যাবে না।
চিৎকার শুনেই মোবাইল হাতে নিয়ে দৌড় শুরু করেন তাঁরা। বিষ্ণুপদের কথায়, কয়েক সেকেন্ডের মধ্যেই নিঃশ্বাস নিতে কষ্ট হতে থাকে। চারদিক ঘন ধোঁয়ায় ঢেকে যায়, কিছুই দেখা যাচ্ছিল না। সিঁড়ি থেকে ঝাঁপ দিয়ে কোনওরকমে বাইরে বেরিয়ে আসেন তিনি। তাঁর দাবি, মুহূর্তের মধ্যেই চারপাশের সব কিছু শেষ হয়ে গিয়েছিল।
সিঁড়ি বেয়ে নেমে একেবারে বেরনোর গেটের সামনে পৌঁছে যান বিষ্ণুপদ। তখনও সেখানে লোহার বিম ভেঙে পড়েনি। কোনওমতে তিনি বেরোতে সক্ষম হন। কিন্তু তাঁর বেরোনোর ঠিক পরেই সেই গেটেই লোহার বিম ভেঙে পড়ে এবং পথ সম্পূর্ণ বন্ধ হয়ে যায়। ভিতরের দিকে আর একটি গেট ছিল, যার সামনে রাখা ছিল গ্যাস সিলিন্ডার। সেগুলিও ফাটা শুরু করে। বিষ্ণুপদের সঙ্গে আরও চার জন সেই সময় বেরিয়ে আসতে পেরেছিলেন।
স্থানীয় সূত্রে আগুন লাগার মুহূর্তের বর্ণনা আরও আতঙ্কজনক। রবিবার গভীর রাতে, আনুমানিক দেড়টা নাগাদ, আচমকা পাশের একটি ডেকরেটার্স সংস্থার গুদামে আগুন লাগে। সেই গুদামের একেবারে গা ঘেঁষেই ছিল মোমো তৈরির কারখানা। মুহূর্তের মধ্যেই আগুন ছড়িয়ে পড়ে সেখানে। তেল, গ্যাস এবং বিপুল পরিমাণ দাহ্য সামগ্রী থাকায় আগুন দ্রুত ভয়াবহ আকার নেয়।
এক দমকলকর্মীর কণ্ঠে চাপা আতঙ্ক স্পষ্ট। তাঁর কথায়, এখনও উদ্ধারকাজ চলছে এবং ভিতরে পা ফেললেই পোড়া হাড়ের সঙ্গে ধাক্কা লাগছে। গোডাউনের ভিতরের তাপমাত্রা এতটাই বেশি ছিল যে লোহার বিম পর্যন্ত গলে গিয়েছে। সেই পরিস্থিতিতে মানবদেহ সম্পূর্ণ ছাই হয়ে যাওয়াই স্বাভাবিক বলে মত দমকলের।
এই অবস্থায় নিখোঁজদের দেহ আদৌ উদ্ধার করা সম্ভব হবে কি না, তা নিয়েই গভীর সংশয় তৈরি হয়েছে। উদ্ধারকাজ দেরিতে শুরু হওয়া নিয়েও স্থানীয়দের ক্ষোভ ক্রমশ বাড়ছে। তাঁদের প্রশ্ন, পরিস্থিতি গুরুতর হওয়া সত্ত্বেও কেন রাতেই উদ্ধারকাজ শুরু করা হল না।
এই প্রসঙ্গে দমকলমন্ত্রী সুজিত বসু জানিয়েছেন, গোডাউনের ভিতরের নির্মাণ অত্যন্ত জটিল ছিল এবং বহু জায়গায় কেটে ঢুকতে হয়েছে। তাঁর বক্তব্য, রাতের দিকে ভিতরের উত্তাপ এতটাই বেশি ছিল যে তখন উদ্ধারকাজ শুরু করা সম্ভব হয়নি। পরিস্থিতি সামাল দিয়েই ধাপে ধাপে কাজ এগোচ্ছে বলে দাবি প্রশাসনের।