কলকাতার জ্ঞানতীর্থ কলকাতা বিশ্ববিদ্যালয়ের উপাচার্যের সেই কুর্সিতেই বসলেন আর এক আশুতোষ। এতদিন ভারপ্রাপ্ত উপাচার্য হিসেবে ছিলেন শান্তা দত্ত দে।

কলকাতা বিশ্ববিদ্যালয়ের নতুন উপাচার্য আশুতোষ ঘোষ ও তৎকালীন উপাচার্য স্যার আশুতোষ মুখোপাধ্যায়।
শেষ আপডেট: 6 October 2025 18:59
দ্য ওয়াল ব্যুরো: ১৯০৬ থেকে ১৯১৪, পরে আবার ১৯২১ থেকে ১৯২৩, এই দুই পর্যায়ে উপাচার্য হিসেবে কলকাতা বিশ্ববিদ্যালয়কে (Calcutta University) বিশ্বমানের উচ্চতায় পৌঁছে দিয়েছিলেন স্যার আশুতোষ মুখোপাধ্যায় (Sir Ashutosh Mukherjee)। সেই ঘটনার ১০২তম বর্ষে আবারও ঐতিহ্যশালী বিশ্ববিদ্যালয়ের দায়িত্বভার গ্রহণ করছেন আর এক আশুতোষ। সরছেন শান্তা দত্ত।
সোমবার সুপ্রিম কোর্টের হস্তক্ষেপে রাজ্যের বিশ্ববিদ্যালয়গুলিতে স্থায়ী উপাচার্য (CU Vice Chancellor) নিয়োগ হল। দীর্ঘদিন পর জট কাটল, তবে আংশিক। এখনও কয়েকটি বিশ্ববিদ্যালয়ে উপাচার্য নিয়োগ বাকি। তবে যে সব বিশ্ববিদ্যালয় নতুন স্থায়ী উপাচার্য পেল, সেগুলির মধ্যে কলকাতা বিশ্ববিদ্যালয়ও রয়েছে। ঐতিহ্যবাহী এই বিশ্ববিদ্যালয়ের ভারপ্রাপ্ত উপাচার্য শান্তা দত্ত দে বিদায় নিলেন। স্থায়ী উপাচার্য হলেন আশুতোষ ঘোষ।
১৯০৬, বঙ্গভঙ্গের পর কেটেছে মাত্র এক বছর। চারদিকে তখন অস্থিরতা, প্রতিবাদ, আর স্বদেশী আন্দোলনের জোয়ারে উত্তাল বাংলা। এমন সময়েই কলকাতা বিশ্ববিদ্যালয়ের উপাচার্যের আসনে বসেন এক অসাধারণ মেধাবী, দূরদৃষ্টিসম্পন্ন বাঙালি, স্যার আশুতোষ মুখোপাধ্যায়।
ব্রিটিশ সরকার তখন দেশজ শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানগুলির উপর কড়াকড়ি চাপিয়ে রেখেছে। একের পর এক কলেজের অনুমোদন বাতিল হচ্ছে, স্কুলে ‘বন্দেমাতরম’ গাওয়া নিষিদ্ধ। তবু এর মধ্যেই আশুতোষ দৃঢ় হাতে ধরলেন বিশ্ববিদ্যালয়ের হাল। চারদিকে রাজনৈতিক ঝড়, অথচ তিনি বুঝেছিলেন, শিক্ষার প্রদীপ নিভে গেলে জাতির আলোই নিভে যাবে। তাই প্রতিকূল সময়েও তিনি শিক্ষা ও গবেষণার পরিকাঠামো ভেঙে পড়তে দেননি।
ব্রিটিশরা ভেবেছিল, আশুতোষ তাঁদের মনোনীত এক বিশ্বস্ত শিক্ষানুরাগী হিসেবেই দায়িত্ব পালন করবেন। কিন্তু তিনি যে বাংলার আত্মার প্রতীক হয়ে উঠবেন, যাঁর দৃঢ়তা একদিন ইংরেজ প্রশাসনকেও চ্যালেঞ্জ জানাবে, বুঝতে পারেনি ইংরেজরা। সময়ের সঙ্গে সঙ্গে দেখা গেল, যে স্বদেশীরা কলকাতা বিশ্ববিদ্যালয়কে ব্যঙ্গ করে বলতেন “গোলাম তৈরির কারখানা”, সেই বিশ্ববিদ্যালয়কেই আশুতোষ নিজের হাতে গড়ে তুললেন জ্ঞানের তীর্থক্ষেত্র রূপে।
তিনি রাজনীতির প্রভাব থেকে দূরে রেখে বিশ্ববিদ্যালয়কে দাঁড় করাতে চেয়েছিলেন শিক্ষার উপর ভর করে। ইম্পেরিয়াল লেজিসলেটিভ কাউন্সিলে তিনি স্পষ্ট বলেছিলেন, “আমাদের এমন শিক্ষকদের প্রয়োজন, যাঁদের কাজ কেবল পরীক্ষার প্রস্তুতি দেওয়া নয়, বরং জ্ঞানের সীমানা প্রসারিত করা এবং ছাত্রদের প্রকৃতির রহস্য অনুসন্ধানে পথ দেখানো।”
এই আদর্শই হয়ে উঠেছিল তাঁর কাজের ভিত্তি। কলকাতা বিশ্ববিদ্যালয়কে তিনি গড়ে তুললেন এক নবজাগরণের কেন্দ্রে। তাঁর সময়েই বিশ্ববিদ্যালয়ের মঞ্চ আলোকিত হয়েছিল দেশ-বিদেশের শ্রেষ্ঠ শিক্ষাবিদদের উপস্থিতিতে। সেই তালিকায় কে নেই?
সুনীতিকুমার চট্টোপাধ্যায়, সর্বপল্লি রাধাকৃষ্ণন, ফরাসি পণ্ডিত সিলভাঁ লেভি, অক্সফোর্ডের অধ্যাপক পল ভিনোগ্রাডফ, আরও কত নাম! আশুতোষ যেন সত্যিই বাস্তব রূপ দিয়েছিলেন রবীন্দ্রনাথের সেই ভাবনাকে, “সবার পরশে পবিত্র করা তীর্থনীরে, এই ভারতের মহামানবের সাগরতীরে।”
কাট টু ২০২৫। কলকাতার জ্ঞানতীর্থ কলকাতা বিশ্ববিদ্যালয়ের উপাচার্যের সেই কুর্সিতেই বসলেন আর এক আশুতোষ। এতদিন ভারপ্রাপ্ত উপাচার্য হিসেবে ছিলেন শান্তা দত্ত দে। তাঁকে নিয়ে কম বিতর্ক হয়নি। কখনও শিক্ষামন্ত্রী ব্রাত্য বসুর সঙ্গে মতবিরোধ, কখনও আবার তৃণমূল ছাত্র পরিষদের নেতাদের সঙ্গে সংঘাত। প্রায় সারাক্ষণই খবরের শিরোনামে ছিলেন তিনি।
বিশ্ববিদ্যালয়ের পরীক্ষানীতি ও প্রশাসনিক সিদ্ধান্তে শান্তার দৃঢ় অবস্থান অনেকেরই চক্ষুশূল হয়েছিল। তাঁর নেওয়া কিছু সিদ্ধান্তে রাজ্য সরকার এবং শাসক দল প্রকাশ্যে অসন্তোষ জানিয়েছিল। এমনকি, মুখ্যমন্ত্রীর অনুরোধও তিনি বিনয়ের সঙ্গে প্রত্যাখ্যান করেছিলেন, যা শিক্ষাক্ষেত্র তো বটেই, রাজনৈতিক মহলেও বিস্তর আলোড়ন তোলে।
এর পর থেকেই শুরু হয় রাজ্য বনাম শান্তা, তৃণমূল বনাম শান্তা দ্বন্দ্ব। শিক্ষামন্ত্রী ব্রাত্য বসু তাঁকে প্রকাশ্যে নানা মন্তব্যে আক্রমণ করেন। শুধু তাই নয়, শান্তার শিক্ষাগত যোগ্যতা নিয়ে পর্যন্ত প্রশ্ন তোলেন তৃণমূল ছাত্র পরিষদের এক নেতা। সেই ঘটনাতেও দমে যাননি তিনি। চোয়াল শক্ত রেখে প্রশাসনিক কর্তৃত্বে ওই নেতাকে সেন্সর করে নিজের অবস্থান স্পষ্ট করে দেন।
সব মিলিয়ে, স্বল্প মেয়াদের উপাচার্যত্ব হলেও শান্তা দত্তের অধ্যায় ছিল দৃঢ়তার, আত্মসম্মানের এবং আপসহীন প্রশাসনিক মানসিকতার এক বিরল উদাহরণ।
এখন তাঁর কুর্সিতে নয়া উপাচার্য আশুতোষ ঘোষের সফরনামা কেমন হয় সেটাই দেখার।