ইংরেজি নতুন বছরের প্রথম দিন, ১ জানুয়ারি— জলদাপাড়া জাতীয় উদ্যানে জন্ম নিল ফুটফুটে এক একশৃঙ্গ গণ্ডার।

ছবি ও ভিডিও ঘিরে তৈরি হয়েছে তুমুল আনন্দ-উচ্ছ্বাস— নতুন বছরকে স্বাগত জানাল জঙ্গল নিজস্ব ভাষায়।
শেষ আপডেট: 3 January 2026 14:57
দ্য ওয়াল ব্যুরো: ২০২৬ সালের একেবারে শুরুতেই ভারতের অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ জঙ্গলে ভূমিষ্ঠ হল এক নবজাতক। অনাবিল আনন্দের খবরে এখন ভাইরাল পশুপ্রেমীরা ছাড়াও কচিকাঁচারাও। ইংরেজি নতুন বছরের প্রথম দিন, ১ জানুয়ারি— জলদাপাড়া জাতীয় উদ্যানে জন্ম নিল ফুটফুটে এক একশৃঙ্গ গণ্ডার। সেই ছবি দ্রুত ছড়িয়ে পড়ে সমাজমাধ্যমে এবং বন্যপ্রাণপ্রেমী মহলে, নতুন করে আশার প্রদীপ জ্বলে ওঠে গণ্ডার সংরক্ষণের পথে। এই হৃদয়ছোঁয়া দৃশ্যটি প্রথম প্রকাশ্যে আনেন ভারতীয় বন দফতরের আধিকারিক প্রবীণ কাসওয়ান। তাঁর শেয়ার করা ছবি ও ভিডিও ঘিরে তৈরি হয়েছে তুমুল আনন্দ-উচ্ছ্বাস— নতুন বছরকে স্বাগত জানাল জঙ্গল নিজস্ব ভাষায়।
সংরক্ষণে আশার প্রতীক একশৃঙ্গ গণ্ডার শাবক
জলদাপাড়ায় জন্ম নেওয়া এই একশৃঙ্গ গণ্ডার শাবকটিকেই ২০২৬ সালের প্রথম শাবক বলে মনে করা হচ্ছে। নিয়মিত নজরদারির অংশ হিসেবে হাতির পিঠে চড়ে টহল দেওয়া বনকর্মীদের একটি দলের প্রথম চোখে পড়ে সদ্যোজাত এই অতিথির প্রতি। আন্তর্জাতিক প্রকৃতি সংরক্ষণ সংস্থা আইইউসিএন-এর লাল তালিকায় ‘বিরল’ হিসেবে চিহ্নিত বৃহৎ একশৃঙ্গ গণ্ডারের ক্ষেত্রে এই জন্ম নিঃসন্দেহে এক আশাব্যঞ্জক বার্তা। প্রবীণ কাসওয়ান তাঁর এক্স বার্তা ও ফেসবুক পোস্টে জানান, প্রতিটি নবজাত গণ্ডারকে ঘিরে কীভাবে জলদাপাড়ায় নজরদারি ও বিজ্ঞানসম্মত সংরক্ষণ প্রক্রিয়া অনুসরণ করা হয়। শাবক ও তার মায়ের তথ্য নথিভুক্ত করা, গণনা করা এবং জন্মের পর কয়েকটি অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ দিনে বিশেষ নজরদারি, সবটাই নিয়মমাফিক করা হয়। পোস্টের ক্যাপশনে শাবকের ভবিষ্যৎ বেড়ে ওঠা নিয়ে আশাবাদী তিনি। তিনি লিখেছেন, একদিন হাঁটতে শিখবে, আর পৃথিবীকে কাঁপিয়ে দেবে।
হাতির পিঠে নজরদারি ও সংরক্ষণ
জলদাপাড়া জাতীয় উদ্যানে নবজাত বন্যপ্রাণীদের খোঁজ ও সুরক্ষায় নিয়মিত নজরদারি অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা নেয়। প্রশিক্ষিত বনকর্মীদের হাতির পিঠে টহল ঘন ঘাসজঙ্গল পেরিয়ে সদ্যোজাত প্রাণীদের খুঁজে বার করতে বিশেষভাবে কার্যকর। কাসওয়ানের দেওয়া তথ্য অনুযায়ী, একশৃঙ্গ গণ্ডারের শাবক সাধারণত জন্মের কয়েক ঘণ্টার মধ্যেই দাঁড়িয়ে পড়তে এবং হাঁটা শুরু করতে পারে। মায়ের কাছাকাছি থাকা ও শিকারির হাত থেকে রক্ষা পাওয়ার জন্য এই প্রাথমিক সক্ষমতাই তাদের বেঁচে থাকার মূল চাবিকাঠি।
পূর্ব ভারতের গণ্ডার-মহল জলদাপাড়া
উত্তরবঙ্গের আলিপুরদুয়ার জেলায় অবস্থিত জলদাপাড়া জাতীয় উদ্যান পূর্ব হিমালয়ের পাদদেশে এবং তোর্সা নদীর তীরে বিস্তৃত এক অনন্য ঘাসভূমি। আজ এটি ভারতের অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ একশৃঙ্গ গণ্ডার সংরক্ষণকেন্দ্র— গুরুত্বের নিরিখে অসমের কাজিরাঙার পরেই যার স্থান।
এখানকার ঘাসজঙ্গল ও নদীবন শুধু গণ্ডার নয়, ভারতীয় হাতি, চিতাবাঘ, হরিণ ও বুনো গরুর মতো বহু বন্যপ্রাণের আশ্রয়স্থল। পূর্ব ভারতের এক গুরুত্বপূর্ণ জীববৈচিত্র্য হটস্পট হিসেবে জলদাপাড়ার পরিচিতি তাই সুপ্রতিষ্ঠিত। কাজিরাঙার বিস্তীর্ণ প্রান্তরের তুলনায় জলদাপাড়ার ভূপ্রকৃতি আলাদা হলেও, সুনিয়ন্ত্রিত ব্যবস্থাপনা ও বনকর্মীদের নিরলস প্রচেষ্টায় এখানকার গণ্ডার সংখ্যা ধীরে ধীরে বাড়ছে।
Born in 2026. One day he will walk and earth will shake.
Do you know in our National Park every new born rhino is recorded, counted and monitored. pic.twitter.com/tROV81UJtw— Parveen Kaswan, IFS (@ParveenKaswan) January 2, 2026
ভারতের গণ্ডার সংরক্ষণে বৃহত্তর প্রেক্ষিত
বিশ্বে একশৃঙ্গ গণ্ডারের বড় অংশের আবাস আজ ভারতে— দীর্ঘদিনের ধারাবাহিক সংরক্ষণ প্রচেষ্টার ফলেই এই সাফল্য সম্ভব হয়েছে। চোরাশিকার দমন থেকে আবাসস্থল পুনরুদ্ধার। বিভিন্ন স্তরে নেওয়া উদ্যোগ ভারতকে এই বিরল প্রজাতির অন্যতম নিরাপদ আশ্রয়ে পরিণত করেছে। বিশ্বজুড়ে চোরাশিকার ও বনভূমি সঙ্কোচনের মতো বিপদ রয়ে গেলেও, জলদাপাড়ার মতো সংরক্ষিত অরণ্যে প্রতিটি সফল শাবকের ভূমিষ্ঠ হওয়া অতীতের পতন কাটিয়ে ওঠার গল্পই বলে। নতুন বছরের শুরুতে জন্ম নেওয়া এই শাবক যেন সেই আশারই নীরব, অথচ প্রত্যয়ী ঘোষণা।