বিশ্ব চা বাণিজ্যের পরিসংখ্যান বলছে, ২০২৪ সালে ইনস্ট্যান্ট চা-সহ বিশ্বে মোট চা রফতানি (Export) হয়েছে ১,৯৫৬ মিলিয়ন কিলোগ্রাম। এর মধ্যে ভারত থেকে ২৫৬ মিলিয়ন কিলোগ্রাম, যা মোট রফতানির প্রায় ১৩ শতাংশ।

ছবি: সংগৃহীত
শেষ আপডেট: 3 January 2026 13:48
দ্য ওয়াল ব্যুরো: উৎপাদনের নিরিখে সাফল্য এলেও দাম, রফতানি কাঠামো ও সস্তা আমদানির জেরে প্রবল চাপে ভারতীয় চা শিল্প (Indian Tea Industry)। কাঠামোগত অসামঞ্জস্য, ভুয়ো ব্র্যান্ডিং এবং লজিস্টিক সমস্যার সমষ্টিতে শিল্পের ভবিষ্যৎ নিয়ে উদ্বেগ বাড়ছে। টি অ্যাসোসিয়েশন অফ ইন্ডিয়ার (TAI) সাম্প্রতিক বক্তব্যেই উঠে এসেছে সেই আশঙ্কার ছবি।
বিশ্ব বাজারে পিছিয়ে ভারত
শনিবার টি অ্যাসোসিয়েশন অফ ইন্ডিয়ার দ্বিবার্ষিক সাধারণ সভায় সংগঠনের সভাপতি সন্দীপ সিংহানিয়া চা শিল্পের বর্তমান সমস্যাগুলো তুলে ধরে বলেন, বিশ্ব চা বাণিজ্যের পরিসংখ্যান বলছে, ২০২৪ সালে ইনস্ট্যান্ট চা-সহ বিশ্বে মোট চা রফতানি (Export) হয়েছে ১,৯৫৬ মিলিয়ন কিলোগ্রাম। এর মধ্যে ভারত থেকে ২৫৬ মিলিয়ন কিলোগ্রাম, যা মোট রফতানির প্রায় ১৩ শতাংশ। যদিও আগের বছরের তুলনায় এই পরিমাণ প্রায় ১১ শতাংশ বেশি, তবু সমস্যার মূলে রয়েছে বড় কাঠামোগত ফাঁক।

বিশ্ব চা উৎপাদনের প্রায় ১৯ শতাংশই ভারতের দখলে থাকলেও রফতানিতে অংশ মাত্র ১৩ শতাংশ। শিল্পমহলের মতে, এই ব্যবধান কমাতে হলে ভ্যালু অ্যাডিশন, পণ্যের বৈচিত্র্য এবং উচ্চমূল্যের আন্তর্জাতিক বাজারে ঢোকার জন্য লক্ষ্যভিত্তিক কৌশল নেওয়া জরুরি।
উৎপাদনে ধারাবাহিক অগ্রগতি
গত দেড় দশকে উৎপাদনে উল্লেখযোগ্য বৃদ্ধি পেয়েছে ভারত। ২০১০ সালে যেখানে চা উৎপাদন ছিল ৯৬৬ মিলিয়ন কিলোগ্রাম, ২০২৪ সালে তা বেড়ে দাঁড়িয়েছে ১,৩০৪ মিলিয়ন কিলোগ্রামে। অর্থাৎ প্রায় ৩৫ শতাংশ বৃদ্ধি।
২০২৫ সালের নভেম্বর পর্যন্ত উৎপাদন হয়েছে ১,২৯০.৫০ মিলিয়ন কিলোগ্রাম, যা ২৪ সালের তুলনায় ১৭.৬৩ মিলিয়ন কিলোগ্রাম বেশি। বর্তমান প্রবণতা বজায় থাকলে ২০২৬ সালে উৎপাদন ১,৩৫০ মিলিয়ন কিলোগ্রাম ছাড়াতে পারে বলে অনুমান।
দাম পড়ে বড় ধাক্কা
উৎপাদন বাড়লেও দামের ক্ষেত্রে ২০২৫ শিল্পের জন্য হতাশাজনক। অল ইন্ডিয়া গড় চা মূল্য কেজি-পিছু কমেছে ১২.৩১ টাকা, যা প্রায় ৬ শতাংশ। ২০২৪ সালে যেখানে গড় দাম ছিল ১৯৯.৩০ টাকা, সেখানে ২০২৫ সালে তা নেমে এসেছে ১৮৬.৯৯ টাকায়। উত্তর ভারতে পরিস্থিতি আরও গুরুতর। সেখানে কেজি-পিছু গড় দাম ১৬.৭৩ টাকা বা প্রায় ৮ শতাংশ কমে ২২১.৫৭ টাকা থেকে নেমে দাঁড়িয়েছে ২০৪.৮৪ টাকায়।
সস্তা আমদানি ও ভুয়ো ব্র্যান্ডিংয়ের অভিযোগ
দেশীয় বাজারে ডিউটি ফ্রি ও নিম্নমানের চা আমদানিকে কেন্দ্র করে শিল্পমহলে গভীর উদ্বেগ তৈরি হয়েছে। বিশেষ করে নেপাল থেকে আসা চা দার্জিলিং চা হিসেবে বাজারজাত হওয়ার অভিযোগ উঠেছে। এর ফলে দার্জিলিং চায়ের ব্র্যান্ড ভ্যালু ক্ষতিগ্রস্ত হচ্ছে এবং দামেও চাপ পড়ছে।
অন্যদিকে, কেনিয়া থেকে আমদানি করা চা বহু ক্ষেত্রে ‘ইন্ডিয়ান অরিজিন’ তকমা দিয়ে পুনরায় রফতানি করা হচ্ছে। অভিযোগ, ডিউটি-ফ্রি আমদানির একটি অংশ রফতানির আড়ালে দেশীয় বাজারে ঢুকে পড়ছে, যা বাজারের ভারসাম্য নষ্ট করছে।
মাথাপিছু চা পান কম
চা নিয়ে বাঙালির সমাদরের কমতি নেই। তবে দেশে মাথাপিছু চা পান এখনও কম। বার্ষিক গড়ে ৮৪০ গ্রাম। সেখানে যুক্তরাজ্যে এই পরিমাণ ১.৬১ কেজি এবং পাকিস্তানে ১.০১ কেজি। বিশেষজ্ঞদের মতে, দেশে মাথাপিছু চা পান মাত্র ১০০ গ্রাম বাড়ানো গেলে বছরে অতিরিক্ত ১৩১ মিলিয়ন কিলোগ্রাম চা খরচ হতে পারে। এতে উৎপাদন ও চাহিদার ভারসাম্য অনেকটাই ফিরবে।
এই পরিস্থিতিতে শিল্পমহলের তরফে সরকারের কাছে একাধিক দাবি জানানো হয়েছে—
রফতানির ক্ষেত্রে বড় বাধা হয়ে দাঁড়িয়েছে লজিস্টিক সমস্যা—
এই সব কাটিয়ে উঠতে নীতিগত সহায়তা ও সরকারি হস্তক্ষেপ জরুরি বলে মত শিল্পসংশ্লিষ্টদের।
টি বোর্ডের বক্তব্য
টি বোর্ডের ডেপুটি চেয়ারম্যান সি মুরুগান জানিয়েছেন, খুব শীঘ্রই চা শিল্পের জন্য স্ট্যান্ডার্ড অপারেটিং প্রসিডিওর (SoP) চূড়ান্ত করা হবে। তবে চা নিলাম ব্যবস্থায় টি বোর্ডের সরাসরি হস্তক্ষেপের প্রয়োজন নেই বলেই তিনি মনে করেন।
একই সঙ্গে জানান, দার্জিলিং বা অসম নয়— এক ছাতার নীচে ‘ইন্ডিয়ান টি’ হিসেবে আন্তর্জাতিক বাজারে ব্র্যান্ডিংয়ের পরিকল্পনা নিয়ে আলোচনা চলছে।