পাখিবিদদের মতে, রেড নেকড স্টিন্ট সাধারণত সমুদ্র উপকূলের বালুচরে ছোট চিংড়ি ও জলজ ক্ষুদ্র প্রাণী খুঁজে বেড়ায়। ঢেউয়ের ওঠানামার সঙ্গে তাল মিলিয়ে দ্রুত ঠোঁট ঢুকিয়ে খাবার সংগ্রহ করাই তাদের স্বভাব।

সাইবেরিয়া থেকে আসা রেড নেকড স্টিন্ট
শেষ আপডেট: 16 February 2026 18:24
দ্য ওয়াল, ঝাড়গ্রাম: শ্রেয়া ঘোষালের (shreya ghoshal) গাওয়া ‘সুবর্ণরেখা’ গানটির কথা মনে আছে? “ফাগুনে, হুম হুম/ পুড়ে ছারখার যন্ত্রণাকার, আমাদের দালানে, মনে মোড়া পাখি আসবে কি আর’!
আনন্দ সংবাদ। ঝাড়গ্রামের (Jhargram) গোপীবল্লভপুরে সেই সুবর্ণরেখা নদীর (Subarnarekha) ধারে পাখি এসেছে। ফের দেখা মিলেছে একেবারে অপ্রত্যাশিত এক অতিথির। সাইবেরিয়া থেকে আসা বিরল পরিযায়ী পাখি রেড নেকড স্টিন্টের (Red necked stint) দেখা মিলেছে নদীতীরবর্তী এলাকায়। এতদিন পর্যন্ত এই পাখির দেখা মিলত মূলত দক্ষিণ ২৪ পরগনার বকখালি (Bakkhali) ও ফ্রেজারগঞ্জের মতো সমুদ্র তীরবর্তী অঞ্চলে। নদীর ধারে তাদের উপস্থিতি ঘিরে স্বাভাবিকভাবেই চাঞ্চল্য তৈরি হয়েছে পক্ষী গবেষক মহলে।
পাখিবিদদের মতে, রেড নেকড স্টিন্ট সাধারণত সমুদ্র উপকূলের বালুচরে ছোট চিংড়ি ও জলজ ক্ষুদ্র প্রাণী খুঁজে বেড়ায়। ঢেউয়ের ওঠানামার সঙ্গে তাল মিলিয়ে দ্রুত ঠোঁট ঢুকিয়ে খাবার সংগ্রহ করাই তাদের স্বভাব। কিন্তু সুবর্ণরেখার ধারে এই পাখিদের তুলনামূলক ধীর গতিতে খাবার খেতে দেখা যাচ্ছে, যা তাদের স্বাভাবিক আচরণের সঙ্গে পুরোপুরি মেলে না। এই পরিবর্তিত আচরণই গবেষকদের কৌতূহল বাড়িয়েছে।

গবেষকদের দাবি, সুবর্ণরেখা নদীতীরবর্তী অঞ্চলে অন্তত তিন ধরনের স্টিন্ট প্রজাতির উপস্থিতি নজরে এসেছে। বাংলায় যাদের পরিচিত নাম লাল ঘাড় চাপাখি, ছোট চাপাখি ও টেমিঙ্কের চাপাখি। সাইবেরিয়ায় তীব্র শীত ও বরফে ঢাকা পড়লে খাবারের সন্ধানে হাজার হাজার কিলোমিটার উড়ে উষ্ণ অঞ্চলের দিকে আসে এই ক্ষুদ্রাকৃতির পরিযায়ী পাখির দল।
পশ্চিম মেদিনীপুরের সুকুমার সেনগুপ্ত মহাবিদ্যালয়ের প্রাণিবিদ্যা বিভাগের প্রধান অধ্যাপক সুমন প্রতিহার সংবাদমাধ্যমকে জানিয়েছেন, “রেড নেকড স্টিন্ট এতদিন সমুদ্র তীর ছাড়া অন্যত্র দেখা যায়নি। গোপীবল্লভপুরে নদীর ধারে এদের উপস্থিতি পরিবেশগত অভিযোজনের ইঙ্গিত দিচ্ছে। বিষয়টি নিঃসন্দেহে আরও গভীর গবেষণার দাবি রাখে।”

ঝাড়গ্রামের প্রকৃতি ও বন্যপ্রাণ নিয়ে দীর্ঘদিন ধরে কাজ করা স্থানীয় বাসিন্দা পবিত্র মাহাতও এই দৃশ্য দেখে বিস্মিত। তাঁর কথায়, “এই পাখিদের এখানে থাকার কথা নয়। প্রথমে নিজের চোখকেই বিশ্বাস করতে পারছিলাম না। পরে গবেষকদের জানালে তাঁরাও অবাক হন।”
লালগড় গভর্নমেন্ট কলেজের অধ্যাপক ও ইন্ডিয়ান বার্ড কনজার্ভেশন নেটওয়ার্কের সদস্য দেবব্রত দাসের মতে, “ঝাড়গ্রামে আগে এই প্রজাতির পরিযায়ী পাখির উপস্থিতির কথা শোনা যায়নি। যদি নিয়মিতভাবে এদের দেখা মেলে, তবে তা জঙ্গলমহলের জীববৈচিত্র্যের দিক থেকে অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ ঘটনা।”
জঙ্গল, পাহাড় ও নদী—এই তিনের মিলনে ঝাড়গ্রাম অঞ্চল ক্রমেই নতুন নতুন পরিযায়ী পাখির আশ্রয়স্থল হয়ে উঠছে। রেড নেকড স্টিন্টের মতো বিরল অতিথির আগমন সেই সম্ভাবনাকেই আরও জোরালো করে তুলল।