একসময় ‘ভূতুড়ে’ (Haunted) তকমা পেয়েছিল পুরুলিয়ার বেগুনকোদর স্টেশন (Begunkodar Station)। পরে ফাঁস হল, সেই ভয়ের আড়ালে লুকিয়ে ছিল এক পরিবারের দুঃখ আর সমাজের নিষ্ঠুরতা।

শেষ আপডেট: 14 October 2025 17:29
দ্য ওয়াল ব্যুরো: পুরুলিয়ার (Purulia) লালমাটির বুক চিরে ছুটে চলা ট্রেন হঠাৎ থেমে যায় একটা ছোট্ট স্টেশনে। নামটি ভারী অদ্ভুত— বেগুনকোদর (Begunkodar)। নামটা শুনলেই এখনও কারও কারও গায়ে কাঁটা দেয়। কারণ একসময় এই জায়গার নাম উচ্চারণ মানেই ছিল একটা শিহরন জাগানো ভয়, “ভূতুড়ে স্টেশন!” (Haunted Station)
সময় বয়ে যায়। আর সেই সময়ই বলে দেয়, সব গল্পের ভিতর সত্যি লুকিয়ে থাকে, আবার কিছু সত্যিকে আড়াল করতে গল্প তৈরিও করা হয়। বেগুনকোদরের ‘ভূত’ও তেমনই এক তৈরি করা ছায়া।

১৯৬০ সালে এই স্টেশন তৈরি হয়েছিল। চারদিক নিঝুম, গাছগাছালি ঘেরা, পাশে ছোট্ট গ্রাম বামনিয়া। শুরুতে নিয়মমতো চলছিল ট্রেন, টিকিট, লোকজনের যাতায়াত। কিন্তু ছ’ বছর যেতে না যেতেই বদলে গেল সব। ১৯৬৬ সালে হঠাৎ বন্ধ হয়ে গেল স্টেশন। কারণ ছড়িয়ে পড়ল—স্টেশনের স্টেশনমাস্টার নাকি নিজে ভূত দেখেছেন!
লোকমুখে গল্প ছড়াল, রাতে রেললাইন ধরে সাদা কাপড়ে এক মেয়ে দৌড়তে দেখা গেছে। কেউ বলল, কুয়ো থেকে কান্নার আওয়াজ আসে। কেউ শপথ করে বলল, চাদর মুড়ে কেউ হাঁটছিল প্ল্যাটফর্মে। যত কম প্রমাণ, তত বেশি গুজব। বেগুনকোদর ধীরে ধীরে রেল মানচিত্রে এক ‘ভূতের ঠিকানা’ হয়ে উঠল।
স্টেশন বন্ধ থাকার এই কালো অধ্যায় চলেছিল দীর্ঘ ৪০ বছর। অবশেষে ২০০৬ সালে পশ্চিমবঙ্গ বিজ্ঞান মঞ্চের পুরুলিয়া শাখা বিষয়টা হাতে নেয়। তারা রেলের তৎকালীন স্ট্যান্ডিং কমিটির চেয়ারম্যান, প্রাক্তন সাংসদ বাসুদেব আচারিয়ার কাছে আবেদন জানায়— ভূত নয়, সত্যিই যেন ট্রেন ফিরে আসে।

২০০৭ সালের ফেব্রুয়ারিতে অবশেষে বেগুনকোদর ফের জীবিত হয়। তবে রেল এক শর্ত দেয়—শুধু দিনের বেলায় ট্রেন থামবে। রাতের অন্ধকারে নয়। সময়ের সঙ্গে, প্রমাণের সঙ্গে, সেই নিয়মও ভাঙে। এখন রাতে-দুপুরে ট্রেন থামে, মানুষ ওঠে-নামে। কিন্তু সেই “ভূত আছে নাকি?” ফিসফাস আজও ঘুরে বেড়ায় বাতাসে।
স্টেশনের চারপাশে আজও যেন এক অদ্ভুত ছায়া কাজ করে। ইউটিউবাররা আসেন, ক্যামেরা নিয়ে শ্যুটও হয়। কেউ বলেন, অভিনেত্রী অজ্ঞান হয়ে গিয়েছিল, কেউ বলেন, কণ্ঠ বদলে গিয়েছিল ছেলের মতো। আর এইসব কাহিনি জোগায় ইউটিউবের ভিউ আর স্থানীয় অর্থনীতি। এত বছরের পুরনো ভয়ই যেন এখন ব্যবসার পুঁজি।

বিজ্ঞান মঞ্চের পুরুলিয়া জেলা সম্পাদক ডা. নয়ন মুখোপাধ্যায় এ নিয়ে ক্ষোভে বলেন, “এলাকার ক্ষতি করে ঘোস্ট ট্যুরিজম চলতে পারে না। মানুষ আসুক, স্টেশনের সৌন্দর্য দেখুক, কিন্তু ভূত বিক্রি নয়। আমরা বলেছি যে, কেউ ভূত দেখাতে পারলে ৫০ হাজার টাকা পুরস্কার পাবেন।”
বছরের পর বছর কেটে যায় এভাবেই, সত্যি আর ভয়ের দোলাচলে। বছর তিনেক আগে, হঠাৎ একদিন ৭১ বছরের এক স্থানীয় বৃদ্ধ, অঙ্গদ কুমার, মুখ খুললেন এক সংবাদমাধ্যমের সামনে। তাঁর কথায়, “ভূত কিছুই ছিল না। ছিল লজ্জা, ভয়, আর সমাজের চোখ এড়ানোর চেষ্টা।”
জানা যায়, অঙ্গদবাবুর পরিবার থেকেই রেল জমি নিয়ে তৈরি হয়েছিল ওই স্টেশন। তাঁর শ্যালিকা ছিলেন সেই সময়ের স্টেশনমাস্টার বৈদ্যনাথ সরকারের বড় মেয়ে চায়না সরকারের বন্ধু। তাই গল্পের ভিতরের মানুষগুলোকে তিনি চিনতেন। তাঁর মতে, বৈদ্যনাথবাবুর চার মেয়ে স্থানীয় ছেলেদের ইভটিজিংয়ের শিকার হয়েছিলেন। মেয়েদের নিরাপত্তা নিয়ে দিশেহারা বাবা তখন একটাই পথ দেখেছিলেন— এলাকা ছেড়ে পালানো। কিন্তু বদলি চাইতে একটা কারণ দরকার। আর তখনই শুরু হয় ‘ভূতের গল্প’। এক কল্পিত ভয়, যা পরে পুরো অঞ্চলের পরিচয় হয়ে দাঁড়ায়।
সন্ধে নামলেই ঘুটঘুটে অন্ধকারে ডুবে যায় বেগুনকোদর স্টেশনের সাইনবোর্ড। ঝিঁঝিঁ পোকার শব্দে বাজে এক অদ্ভুত সুর। কেউ বলে, ট্রেন ঢোকার আগে ছায়া দৌড়তে দেখা যায়। কেউ বলে, কুয়োর দিক থেকে আসে আর্তনাদ। প্রশাসন বলেছে, বিজ্ঞান প্রমাণ দিয়েছে—সবই বানানো। কিন্তু মানুষ? তাদের বিশ্বাস অদ্ভুত জিনিস।

২০১৭ সালে এক পরীক্ষামূলক রাতে বিজ্ঞান মঞ্চ, পুলিশ, প্রশাসন মিলে স্টেশনে জেগেছিল সারারাত। একটাও ভূত ধরা পড়েনি, ধরা পড়েছিল শুধু মানুষের তৈরি ভয়। তবু প্রশ্নটা থেকে যায়, যে ভয় এত বছর টিকে গেল, সে কি সত্যিই নেই?
বেগুনকোদর আজও দাঁড়িয়ে আছে, রেললাইনের পাশে, সময়ের কোলে। ভূত হোক বা না হোক, গল্প তো আছেই।