আসন্ন রাজ্যসভা নির্বাচনের জন্য প্রার্থীদের নাম ঘোষণা করল তৃণমূল কংগ্রেস। দলের তরফে প্রকাশিত তালিকায় চমক হিসেবে উঠে এসেছে একাধিক রাজনৈতিক ও অরাজনৈতিক ব্যক্তিত্বের নাম। তৃণমূলের এই নতুন তালিকায় রাজনৈতিক অভিজ্ঞতার সঙ্গে সঙ্গে আইন এবং বিনোদন জগতের সমন্বয় ঘটানো হয়েছে।

গ্রাফিক্স - দিব্যেন্দু দাস
শেষ আপডেট: 28 February 2026 00:09
দ্য ওয়াল ব্যুরো: আসন্ন রাজ্যসভা নির্বাচনের (Rajya Sabha election) জন্য প্রার্থীদের নাম ঘোষণা করল তৃণমূল কংগ্রেস (Trinamool Congress)। দলের তরফে প্রকাশিত তালিকায় (TMC Rajya Sabha candidate list) চমক হিসেবে উঠে এসেছে একাধিক রাজনৈতিক ও অরাজনৈতিক ব্যক্তিত্বের নাম। রাজ্যসভায় তৃণমূলের প্রতিনিধি হিসেবে মনোনয়ন দেওয়া হয়েছে প্রাক্তন কেন্দ্রীয় মন্ত্রী বাবুল সুপ্রিয় (Babul Supriyo), পশ্চিমবঙ্গের প্রাক্তন ডিজিপি রাজীব কুমার (ex DGP Rajeev Kumar), বিশিষ্ট আইনজীবী মেনকা গুরুস্বামী (Advocate Menka Guruswami) এবং টলিউড অভিনেত্রী কোয়েল মল্লিক (Tollywood Actress Koel Mallick)-কে।
নতুনদের ওপর ভরসা (New faces for TMC Rajya Sabha candidate list)
তৃণমূলের এই নতুন তালিকায় রাজনৈতিক অভিজ্ঞতার সঙ্গে সঙ্গে আইন এবং বিনোদন জগতের সমন্বয় ঘটানো হয়েছে। বাবুল সুপ্রিয় বিজেপি ছেড়ে তৃণমূলে যোগ দেওয়ার পর থেকেই দলের অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ মুখ হয়ে উঠেছেন।
We are pleased to announce the candidature of Babul Supriyo, Rajeev Kumar (Former DGP, West Bengal), Menaka Guruswamy and Koel Mallick for the upcoming Rajya Sabha elections.
We extend our heartfelt congratulations and best wishes to them. May they continue to uphold Trinamool’s…— All India Trinamool Congress (@AITCofficial) February 27, 2026
অন্যদিকে, প্রশাসনিক অভিজ্ঞতাকে কাজে লাগাতে প্রাক্তন পুলিশ প্রধান রাজীব কুমারকে রাজ্যসভায় পাঠানোর সিদ্ধান্ত নিয়েছে তৃণমূল নেতৃত্ব। আইনি লড়াইয়ে দলের অবস্থান পোক্ত করতে সুপ্রিম কোর্টের প্রখ্যাত আইনজীবী মেনকা গুরুস্বামীর নামও তালিকায় বিশেষ তাৎপর্যপূর্ণ বলে মনে করছে রাজনৈতিক মহল।
তৃণমূলের বার্তা
প্রার্থীদের নাম ঘোষণা করে দলের তরফে জানানো হয়েছে, এই ব্যক্তিরা তৃণমূলের ‘সহনশীলতা’ এবং ‘প্রতিরোধের’ ঐতিহ্যকে সংসদে এগিয়ে নিয়ে যাবেন। প্রতিটি ভারতীয়র অধিকার ও মর্যাদা রক্ষার জন্য দলের যে ‘অবিচল অঙ্গীকার’, তা এই নতুন প্রতিনিধিরা আরও মজবুত করবেন বলেও আশা প্রকাশ করেছে তৃণমূল নেতৃত্ব।
রাজীব কুমার
রাজ্য পুলিশের প্রাক্তন ডিজি রাজীব কুমার এবং মুখ্যমন্ত্রী মমতা বন্দ্যোপাধ্যায়ের সম্পর্ক দীর্ঘকাল ধরে আলোচনার কেন্দ্রে। বিশেষ করে সারদা ও রোজভ্যালি চিটফান্ড কেলেঙ্কারির তদন্ত চলাকালীন রাজীব কুমারের পাশে মমতা বন্দ্যোপাধ্যায় যেভাবে দাঁড়িয়েছিলেন, তা ভারতীয় রাজনীতির ইতিহাসে এক বেনজির ঘটনা।
সারদা কেলেঙ্কারির তদন্তে সিবিআই কলকাতার তৎকালীন পুলিশ কমিশনার রাজীব কুমারের লাউডন স্ট্রিটের বাসভবনে হানা দিলে মুখ্যমন্ত্রী মমতা বন্দ্যোপাধ্যায় সরাসরি কেন্দ্রের বিরুদ্ধে যুদ্ধ ঘোষণা করেন। তিনি রাজীব কুমারের বাড়িতে গিয়ে সিবিআই অভিযানের তীব্র প্রতিবাদ জানান এবং কলকাতার রাজপথে, মেট্রো চ্যানেলে দুদিন ধরে ধর্নায় বসেন। তিনি রাজীব কুমারকে ‘বিশ্বের অন্যতম সেরা অফিসার’ হিসেবে আখ্যা দিয়েছিলেন।
সিবিআইয়ের আধিকারিকরা রাজীব কুমারের বাড়িতে যাওয়ার পর, কলকাতা পুলিশ সিবিআই আধিকারিকদের আটক করে থানায় নিয়ে যায়। মুখ্যমন্ত্রী এটিকে ফেডারেল কাঠামোর ওপর আক্রমণ হিসেবে তুলে ধরেন এবং সিবিআই আধিকারিকদের এই পদক্ষেপকে ‘নজিরবিহীন’ বলে বর্ণনা করেন।
রাজীব কুমারকে নিয়ে সিবিআই তদন্তের জট থাকলেও, মমতা বন্দ্যোপাধ্যায় বারবার তাঁর ওপর আস্থা রেখেছেন। সারদা তদন্তের জন্য রাজ্য পুলিশের বিশেষ তদন্তকারী দল (SIT) প্রধান হিসেবে তাঁকে নিয়োগ করা হয়েছিল। পরবর্তীকালে তাঁকে বিধাননগর কমিশনারেটের প্রধান এবং কলকাতার পুলিশ কমিশনার পদে বসানো হয়। সবশেষে, লোকসভা নির্বাচনের ঠিক আগে তাঁকে রাজ্য পুলিশের ডিজিপি (DGP) পদে নিযুক্ত করা হয়েছিল (যদিও নির্বাচনী বিধি চালু হওয়ার পর কমিশন তাঁকে সরিয়ে দেয়)।
সিবিআই-এর পদক্ষেপের বিরুদ্ধে রাজীব কুমার যখন সুপ্রিম কোর্টের দ্বারস্থ হন, তখন রাজ্য সরকার তাঁর আইনি লড়াইয়ে পাশে দাঁড়িয়েছিল। মমতা বন্দ্যোপাধ্যায় বারবার দাবি করেছেন যে, রাজীব কুমারকে রাজনৈতিক প্রতিহিংসার কারণে হেনস্থা করা হচ্ছে।
বিরোধীরা বারবার রাজীব কুমারের সততা নিয়ে প্রশ্ন তুললেও, মমতা বন্দ্যোপাধ্যায় অবিচলভাবে তাঁর আস্থাভাজন এই অফিসারের পাশে দাঁড়িয়েছেন। তাঁর এই ভূমিকা প্রমাণ করে যে, রাজীব কুমার তাঁর প্রশাসনিক টিমের অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ ব্যক্তি ছিলেন।
বাবুল সুপ্রিয়
গত কয়েক সপ্তাহ ধরে বাবুল সুপ্রিয়র রাজনৈতিক ভবিষ্যৎ নিয়ে যে জল্পনা চলছিল, অবশেষে তাতে দাঁড়ি পড়ল। বালিগঞ্জের বর্তমান বিধায়ক বাবুল সুপ্রিয়কে আগামী রাজ্যসভা নির্বাচনে প্রার্থী হিসেবে বেছে নিয়েছে তৃণমূল কংগ্রেস। দলের এই সিদ্ধান্তের ফলে জল্পনার মেঘ কেটে গেল যে, তাঁকে ফের বিধানসভা ভোটে লড়তে হবে কি না।
২০২১ সালে বিজেপি ছেড়ে তৃণমূলে যোগ দেওয়ার পর আসানসোলের প্রাক্তন সাংসদ বাবুল সুপ্রিয় উপনির্বাচনে বালিগঞ্জ বিধানসভা কেন্দ্র থেকে জয়ী হয়েছিলেন। সম্প্রতি শোনা যাচ্ছিল, আসন্ন বিধানসভা নির্বাচনে বালিগঞ্জ কেন্দ্রেই তাঁকে টিকিট দেওয়া হবে কি না তা নিয়ে দলের অন্দরে আলোচনা চলছিল। তবে রাজ্যসভার প্রার্থী তালিকা প্রকাশ করে তৃণমূল নেতৃত্ব স্পষ্ট করে দিল, বাবুলকে সংসদের উচ্চকক্ষেই পাঠানোর পরিকল্পনা চূড়ান্ত হয়েছে। সেক্ষেত্রে বালিগঞ্জ থেকে অন্য কাউকেই প্রার্থী হিসেবে বেছে নেবে তৃণমূল। সেই জায়গায় নাম উঠে আসছে তৃণমূলের বর্ষীয়ান নেতা শোভনদেব চট্টোপাধ্যায়ের নাম।
কোয়েল মল্লিক
কয়েকদিন আগেই ‘উন্নয়নের পাঁচালি’ শোনানোর অছিলায় দলের সর্বভারতীয় সাধারণ সম্পাদক অভিষেক বন্দ্যোপাধ্যায় স্বয়ং অভিনেতা রঞ্জিত মল্লিকের বাড়িতে গিয়ে দীর্ঘ বৈঠক করেছিলেন। সেই রুদ্ধদ্বার বৈঠকের কয়েকদিনের মধ্যেই রঞ্জিতকন্যা কোয়েলকে রাজ্যসভায় পাঠানোর সিদ্ধান্ত রাজনৈতিক মহলে তীব্র কৌতূহল তৈরি করেছে।
গত কদিন ধরেই তৃণমূলের অন্দরে রাজ্যসভার প্রার্থী নিয়ে চর্চা চলছিল। সেই আবহে অভিষেক বন্দ্যোপাধ্যায়ের রঞ্জিত মল্লিকের বাড়িতে যাওয়া ও সেখানে তৃণমূলের নীতি নিয়ে বিস্তারিত আলোচনার বিষয়টি বেশ তাৎপর্যপূর্ণ ছিল।
রাজনৈতিক বিশ্লেষকদের মতে, রঞ্জিত মল্লিকের সঙ্গে এই বৈঠকের ফলেই কোয়েলের রাজনীতিতে সক্রিয় হওয়ার পথ প্রশস্ত হল। চূড়ান্ত তালিকায় কোয়েল মল্লিকের নাম দেখে অনেকেই মনে করছেন, বিনোদন জগতের মুখকে সংসদীয় রাজনীতিতে ব্যবহারের পুরনো কৌশলই আবার প্রয়োগ করল শাসকদল।
মেনকা গুরুস্বামী
তৃণমূল কংগ্রেসের রাজ্যসভার তালিকায় অন্যতম বড় চমক সুপ্রিম কোর্টের প্রখ্যাত আইনজীবী মেনকা গুরুস্বামী।
রাজনৈতিক ও প্রশাসনিক অভিজ্ঞতার সংমিশ্রণের পাশাপাশি আইনি লড়াইয়ে দলের অবস্থান পোক্ত করতে কৌশলী এই সিদ্ধান্ত নিয়েছে তৃণমূল নেতৃত্ব।
মেনকা গুরুস্বামী সুপ্রিম কোর্টের একজন অত্যন্ত প্রভাবশালী আইনজীবী হিসেবে পরিচিত। সমকামী অধিকার (ধারা ৩৭৭ বাতিল) বা একাধিক সাংবিধানিক মামলার ক্ষেত্রে তাঁর আইনি লড়াই জাতীয় স্তরে প্রশংসিত হয়েছে। দলীয় সূত্রে খবর, সংসদে কেবল রাজনৈতিক তর্কের খাতিরে নয়, আইনি সূক্ষ্মতা ও সাংবিধানিক জটিলতাগুলি দক্ষতার সঙ্গে তুলে ধরার জন্যই মেনকাকে বেছে নেওয়া হয়েছে।