রাজনৈতিক মহলে তো বটেই, সমাজের সব স্তরেই সমালোচনা শুরু হয়েছে। প্রশ্ন উঠেছে, আর কতদিন বাংল বলার জন্য কোণঠাসা হতে হবে বাঙালিকে। কতদিনই বা এই ভুল ধারণা থাকবে, যে বাংলায় কথা বলা মানেই বাংলাদেশি!

অসমের মুখ্যমন্ত্রীর 'বাংলা' বিতর্ক, কী বলছেন বিশিষ্টরা?
শেষ আপডেট: 14 July 2025 12:23
দ্য ওয়াল ব্যুরো: 'আদমশুমারিতে যাঁরা বাংলাকে নিজের মাতৃভাষা হিসেবে উল্লেখ করছেন, তাঁরাই আসলে ‘বিদেশি’। সম্প্রতি এমনই মন্তব্য করে বিতর্কের কেন্দ্রে এসেছেন অসমের মুখ্যমন্ত্রী হিমন্ত বিশ্বশর্মা। অভিযোগ উঠেছে, তাঁর এই মন্তব্য জাতিবিদ্বেষের প্রকাশ ছাড়া কিছুই নয়। তিনি সরাসরি বাঙালিদের, বা বলা ভাল, বাংলাভাষী মুসলিমদের ইঙ্গিত করেছেন। 'বাংলাদেশি' হিসেবে দাগিয়ে দিয়েছেন অসমের বাঙালিদের।
বঙ্গ বিজেপির রাজ্য সভাপতি শমীক ভট্টাচার্য অবশ্য ইতিমধ্যেই দাবি করেছেন, হিমন্ত বিশ্ব শর্মার কথাকে ভুলভাবে উপস্থাপিত করা হচ্ছে। তাঁর কথায়, 'অসমে বাঙালিদের চিহ্নিত করা হচ্ছে বলে যে বিতর্ক ঘনিয়েছে, তা ঠিক নয়। ভাষাই শেষ কথা নয়। পশ্চিমবঙ্গে যারা বাংলায় কথা বলেন না, এখানে যারা দীর্ঘদিন ধরে থেকেছেন, সংস্কৃতির সঙ্গে সম্পৃক্ত হয়েছেন তাঁরাও তো বাঙালি।' পাশাপাশি তিনি তৃণমূলকেও খোঁচা দিয়ে বলেন, 'তৃণমূল বিদ্বেষের রাজনীতি করছে। একদিকে আপনি গুজরাতিদের উপর আক্রমণ করবেন আর গুজরাতে বাঙালি পরিযায়ী শ্রমিকরা ভাল থাকবেন!'
এই নিয়ে রাজনৈতিক মহলে তো বটেই, সমাজের সব স্তরেই সমালোচনা শুরু হয়েছে। প্রশ্ন উঠেছে, আর কতদিন বাংলা বলার জন্য কোণঠাসা হতে হবে বাঙালিকে। কতদিনই বা এই ভুল ধারণা থাকবে, যে বাংলায় কথা বলা মানেই বাংলাদেশি!
এই বিষয়টিকে 'নির্বুদ্ধিতা' বলেই ব্যাখ্যা করেছেন শিক্ষাবিদ পবিত্র সরকার। দ্য ওয়ালকে টেলিফোনে তিনি বলেন, 'এটা কী ধরনের মূর্খতা আমি জানি না। অসমের কাছাড় জেলায় বহু মানুষ বাংলায় কথা বলেন। অসমে বাংলা একটা স্বীকৃত সরকারি ভাষা। এখন হিমন্তবাবু যা বলছেন, তাতে তো অসমের একটা অংশকেই বিদেশ বলে ধরে নিতে হয়।'
পবিত্রবাবু ব্যাখ্যা, ভাষার সঙ্গে রাষ্ট্রকে জড়িয়ে ফেলার রাজনীতি নতুন। এই নির্বুদ্ধিতা সকলেরই আছে কম-বেশি। কিন্তু বুঝতে হবে, ইংরেজিতে কথা বললেই কি কেউ ইংল্যান্ডের লোক হয়ে যান? সারা বিশ্বের কত মানুষ ইংরেজিতে কথা বলেন, তাঁরা কি তাহলে ইংরেজ? হিমন্তবাবুর মতো লোকজন কেন এসব বোকা বোকা কথা বলে নিজের মূর্খতা প্রমাণ করেন, তা আমি জানি না।'
দ্য ওয়ালের তরফে বাংলা পক্ষের সঙ্গে এই নিয়ে যোগাযোগ করা হয় বাংলা পক্ষের সঙ্গেও। সম্পাদক কৌশিক মাইতি বলছেন, 'অসমে স্বাধীনতার আগে থেকেই বাঙালি বিরোধিতা রয়েছে। অসমিয়া ভাষা চাপিয়ে দেওয়া নিয়ে রক্তক্ষয়ী সংঘর্ষও হয়েছে। বহু বাঙালিকে হত্যাও করা হয়েছে জাতিবিদ্বেষের জায়গা থেকে। এ হেন লড়াই করে বাঙালি যেখানে অস্তিত্ব টিকিয়ে রেখেছে, সেখানে আজ হিমন্ত বিশ্বশর্মা বাঙলাভাষীদের বিদেশি বলে দিলেন।'
কৌশিকবাবু জানান, অসমের বিজেপি সরকারের এই ভাষা আগ্রাসনে হিন্দু-মুসলিম নির্বিশেষে সমস্ত বাঙালি আক্রান্ত। তাঁর কথায়, 'অনেকে ভাবেন বা বলেন হিন্দু বাঙালিরা বিজেপিদের আগ্রাসনের মুখে নিরাপদ। এটা ভুল কথা। ১২ লক্ষ হিন্দু বাঙালিকে এনআরসি করে ঘরছাড়া করেছে বিজেপি। এখন তাঁদের মুখের ভাষাও মুছে দিতে চায়। বলা ভাল, হিন্দু বাঙালিরাই বেশি করে বিদ্বেষের মুখে পড়ছেন অসমে। কারণ সংখ্যালঘু বাঙালি মুসলমানদের ভয় দেখিয়ে ইতিমধ্যেই লেখানো হয়েছে, তাঁদের মাতৃভাষা অসমিয়া। এবার লক্ষ্য হিন্দুরা।'
তাঁর ব্যাখ্যা, এর কারণও আছে। কোনও রাজ্যে ৭০ শতাংশের বেশি মানুষ কোনও ভাষার কথা বললে, সেটা লিঙ্গুইস্টিক রাজ্য হয়ে যায়। যেমন পশ্চিমবঙ্গ একটি লিঙ্গুইস্টিক রাজ্য। এটি বাংলাভাষী রাজ্য। অসমেও সেটাই করতে চাইছে। সে রাজ্যের বাসিন্দাদের মাতৃভাষা জোর করে অসমিয়া লেখানো হচ্ছে। যাতে রাজ্যের বেশিরভাগ মানুষের ভাষা হিসেবে খাতায়কলমে উঠে আসে অসমিয়া এবং তার ভিত্তিতে অসম একটি অসমিয়াভাষী লিঙ্গুইস্টিক রাজ্য হয়ে ওঠে। যা কিনা সর্বৈব মিথ্যে এবং অসমের বিপুল সংখ্যক বাংলাভাষীদের প্রতি অন্যায়।
রাষ্ট্রীয় কারণে বাংলা ভাষাকে কোণঠাসা করার এই পরিকল্পনা মেনে নেওয়া যায় না বলে জানালেন সাহিত্যিক প্রচেত গুপ্তও। তাঁর কথায়, 'বাংলা ভাষা, কথা, লেখা, গান-- এর বিরুদ্ধে কেউ কোনও কথা বললেই আমি তার বিরোধিতা করব। পৃথিবীর যে কোনও প্রান্তের বাঙালিই হয়তো করবেন। রাজনৈতিক পরিচিতি নির্মাণ করার জন্য কোনও মানুষের পরিচিতিকে আক্রমণ করা হবে, তাঁর ভাষার উপর আক্রমণ হবে, এটা মেনে নেওয়া যায় না। আমি বাংলায় লেখালেখি করি, এই ভাষা আমায় অন্ন জোগায়। ফলে অসম হোক বা যেখানেই হোক, বাংলা ভাষার বিরোধিতা হলেই আমি তার বিপক্ষে কথা বলব।'