তুমুল বৃষ্টির পর এবার হাড় কাঁপানো শীত নামতে চলেছে কলকাতায়। আবহাওয়ার পরিবর্তনের ফলে বিশেষজ্ঞরা জানাচ্ছেন,জাঁকিয়ে ঠান্ডা পড়বে গোটা ভারতে, তার মধ্যে কলকাতাও থাকবে।

এআই দিয়ে তৈরি ছবি
শেষ আপডেট: 5 October 2025 19:05
দ্য ওয়াল ব্যুরো: ছোটবেলায় পাঠ্যবইতে পড়া ছয় ঋতু আজকাল আর দেখা যায় না। গ্রীষ্ম, বর্ষা আর কিছুটা শীতেই মানিয়ে নিতে হচ্ছে রাজ্যবাসীকে। সাম্প্রতিক সময়ে আবহাওয়ার চরম খামখেয়ালিপনাই নিউ নর্ম্যাল। কখনও প্রচণ্ড গরম, কখনও দেরিতে আসা বর্ষা, আবার সে বৃষ্টি থামতেই চাইছে না। শরৎকাল কে বলবে আজকের রোদ-বৃষ্টির খেলা দেখে! বিভিন্ন রিপোর্ট বলছে, এই আবহাওয়ার অস্থিরতার সঙ্গে এবার যোগ হতে চলেছে ভয়ঙ্কর ঠান্ডা। যার পোশাকি নাম 'লা নিনা।'
হিসাব অনুযায়ী বর্ষাকাল শেষ হওয়ার কথা অগস্টেই। কিন্তু এবার সেপ্টেম্বরের শেষেও বৃষ্টি থেকে রেহাই মেলেনি। বরং অতিবৃষ্টি, মেঘভাঙা বৃষ্টি, হড়পা বান ও ধসে হিমাচল প্রদেশ, উত্তরাখণ্ডের মতো পাহাড়ি রাজ্যগুলি বিধ্বস্ত। কলকাতাও পুজোর আগেই ভয়ঙ্কর বৃষ্টিতে নাজেহাল হয়েছে। ভাসছে উত্তরবঙ্গ। আবহাওয়াবিদরা জানাচ্ছেন, বর্ষার দুর্ভোগের পর কলকাতার জন্য আরও খারাপ সময় আসছে। ভয়ঙ্কর শীত পড়তে চলেছে ২০২৫-এ। কাঁপবে গোটা দেশ।
মৌসম ভবন এবং মার্কিন আবহাওয়া দফতরের পূর্বাভাস বলছে, চলতি বছরে বিগত কয়েক বছরের তুলনায় অনেক বেশি ঠান্ডা পড়তে চলেছে দেশে। বিশেষ করে উত্তর ভারতে তীব্র শৈত্যপ্রবাহের আশঙ্কা রয়েছে। অক্টোবর থেকে ডিসেম্বরের মধ্যে 'লা নিনা' তৈরির সম্ভাবনা ৭১ শতাংশ। মার্কিন ক্লাইমেট প্রেডিকশন সেন্টারও এই পূর্বাভাসকে সমর্থন জানিয়েছে।
কী এই লা নিনা?
লা নিনা শব্দটি স্প্যানিশ, যার অর্থ ‘ছোট্ট মেয়ে’। এটি আসলে এক ধরনের জলবায়ুগত অবস্থা। প্রশান্ত মহাসাগরের উপরিভাগের জল অস্বাভাবিকভাবে ঠান্ডা হয়ে গেলে তাকে বলা হয় লা নিনা। এর প্রভাবে বিশ্বজুড়ে অতিবৃষ্টি বা ভয়ঙ্কর শীত দেখা দেয়। বিপরীতে, ওই মহাসাগরের জল অস্বাভাবিকভাবে গরম হয়ে গেলে তাকে বলা হয় এল নিনো, যা খরা, অনাবৃষ্টি ও তাপপ্রবাহ ডেকে আনে।
লা নিনার সময় দক্ষিণ আমেরিকার কাছাকাছি পূর্ব প্রশান্ত মহাসাগরের জল ঠান্ডা হয়ে যায়, আবার ইন্দোনেশিয়া ও অস্ট্রেলিয়ার দিকের জল আরও উষ্ণ হয়ে ওঠে। এর ফলে বৈশ্বিক আবহাওয়ার প্যাটার্নে বিরাট প্রভাব পড়ে। বিশেষত নভেম্বর-ডিসেম্বরে উত্তর ভারতে শৈত্যপ্রবাহ ও তুষারপাত বেড়ে যায়।
ভারতে লা নিনার প্রভাব
ভারতে লা নিনার প্রভাবে অনেক সময়ই অতিরিক্ত বৃষ্টিপাত হয়। কৃষিনির্ভর দেশের জন্য এতে একদিকে কৃষিকাজে সুবিধা মেলে, আবার ভূগর্ভস্থ জলের পরিমাণও বাড়ে। একই সঙ্গে শীতও হয়ে ওঠে তীব্র। পাহাড়ি অঞ্চলে বেশি তুষারপাত হয়। তবে সাম্প্রতিক জলবায়ু পরিবর্তনের কারণে লা নিনার চরিত্রও অস্বাভাবিক হয়ে উঠছে। এ বছর যেমন বর্ষার সময়ে দেশ একটানা ভারী বৃষ্টির সাক্ষী থেকেছে। অন্যদিকে এর প্রভাবেই আফ্রিকা ও দক্ষিণ আমেরিকার অনেক অঞ্চলে বৃষ্টির দেখা মেলেনি।
মার্কিন আবহাওয়া সংস্থা এনওএএ জানিয়েছে, বর্তমানে লা নিনা সক্রিয়। অতীতে একটানা তিন বছর (২০২০-২০২২) সক্রিয় ছিল লা নিনা, যাকে বলা হয় ট্রিপল ডিপ লা নিনা। এরপর ২০২৩ সালে সক্রিয় হয়ে ওঠে এল নিনো। জলবায়ু পরিবর্তনের কারণে এই ওঠানামার প্রভাব এখন আরও স্পষ্ট।
বিশেষজ্ঞদের মতে, অক্টোবর থেকে জানুয়ারির মধ্যে এবার ঘূর্ণিঝড়ের প্রভাব বেশি থাকবে। ফলে আগেভাগেই শীতের আমেজ অনুভূত হতে পারে। ২০২৫ সালের শেষের দিকে প্রশান্ত মহাসাগরের আবহাওয়ার পরিবর্তনের কারণে উত্তর ভারতের উপরিভাগে জেট স্ট্রিম প্রবাহিত হবে। এর জেরে বাংলা-সহ গোটা দেশজুড়ে কনকনে হাড়কাঁপানো শীত পড়তে পারে। পাহাড়ি এলাকায় হতে পারে রেকর্ড তুষারপাতও।
গত বছরও লা নিনার প্রভাবে দিল্লি, রাজস্থান, পাঞ্জাব, হরিয়ানা ও উত্তরপ্রদেশের সমতলে টানা ১৭ দিন একসঙ্গে শৈত্যপ্রবাহ ও শীতল দিনের পরিস্থিতি তৈরি হয়েছিল। আবহবিদদের আশঙ্কা, চলতি বছর সেই অভিজ্ঞতা আরও ভয়ঙ্কর হতে চলেছে।