বিশ্বের সমুদ্রগুলি ধীরে ধীরে হারাচ্ছে তাদের স্বচ্ছতা। সূর্যের আলো যেখানে এক সময় সহজেই পৌঁছে যেত, সেই সব সমুদ্র এখন ক্রমশ অন্ধকারে ডুবে যাচ্ছে।

শেষ আপডেট: 28 May 2025 15:43
দ্য ওয়াল ব্যুরো: বিশ্বের সমুদ্রগুলি ধীরে ধীরে হারাচ্ছে তাদের স্বচ্ছতা। সূর্যের আলো যেখানে এক সময় সহজেই পৌঁছে যেত, সেই সব সমুদ্র এখন ক্রমশ অন্ধকারে ডুবে যাচ্ছে। প্লাইমাউথ বিশ্ববিদ্যালয়ের বিজ্ঞানীদের সাম্প্রতিক এক গবেষণায় উঠে এসেছে এমনই উদ্বেগজনক তথ্য। গত ২০ বছরে বিশ্বের এক-পঞ্চমাংশেরও বেশি সমুদ্র গাঢ় ও অন্ধকার হয়ে গিয়েছে। এই পরিবর্তন শুধু সামুদ্রিক জীবনের জন্য নয়, আমাদের সকলের ভবিষ্যতের দিকেই বড় বিপদের ইঙ্গিত দিচ্ছে।

গবেষণায় দেখা গিয়েছে, বিশ্বের বেশ কিছু সমুদ্র ধীরে ধীরে অন্ধকার হয়ে পড়ছে। গত ২০ বছরে বিশ্বের অন্তত ২১ শতাংশ সমুদ্র – প্রায় ৭৫ মিলিয়ন বর্গকিলোমিটার এলাকা জুড়ে রয়েছে, সেগুলোতে আগের চেয়ে অনেকটা কম আলো পাচ্ছে। সম্প্রতি গ্লোবাল চেঞ্জ বায়োলজি পত্রিকায় প্রকাশিত এক গবেষণায় এই চমকে দেওয়া তথ্য উঠে এসেছে।
এই গবেষণাটি করেছেন ব্রিটেনের প্লাইমাউথ বিশ্ববিদ্যালয় এবং প্লাইমাউথ মেরিন ল্যাবরেটরির একদল বিজ্ঞানী। তাঁরা জানাচ্ছেন, সমুদ্রের যে স্তর পর্যন্ত সূর্যের আলো পৌঁছয়, যাকে বলা হয় ‘ফোটিক জোন’, সেই স্তরের গভীরতা অনেকটাই কমে যাচ্ছে। এই স্তরেই সমুদ্রের ৯০ শতাংশ জীব বসবাস করে।
ফোটিক জোন কী?
সমুদ্রের যে স্তর পর্যন্ত সূর্যের আলো পৌঁছায় এবং গাছপালা নিজের খাবার তৈরি করতে পারে (মানে যেখানে ফটোসিনথেসিস হয়) তাকে বলা হয় ফোটিক জোন। একে ইউফোটিক জোন বা সানলাইট জোন-ও বলা হয়। এই অংশটি সাধারণত সমুদ্রপৃষ্ঠ থেকে প্রায় ২০০ মিটার গভীর পর্যন্ত বিস্তৃত। এখানেই সমুদ্রের বেশিরভাগ জলজ উদ্ভিদ ও প্রাণী থাকে। কারণ, আলোর জন্য এখানেই গাছপালা জন্মায়, আর তার উপর নির্ভর করেই টিকে থাকতে পারে নানান প্রাণী। তাই ফোটিক জোনকেই বলা হয় সমুদ্রের প্রাণের মূল কেন্দ্র।

২০০৩ থেকে ২০২২ সালের মধ্যে স্যাটেলাইট ডেটা এবং আধুনিক কম্পিউটারের সাহায্য পাওয়া তথ্য বিশ্লেষণ করে বিজ্ঞানীরা দেখেছেন, অনেক অঞ্চলের সমুদ্রের জল আগের চেয়ে অনেকটাই অগভীর হয়ে গিয়েছে। পৃথিবীর মোট সমুদ্রের ৯ শতাংশ এলাকায় ফোটিক জোনের গভীরতা কমেছে ৫০ মিটারের বেশি। আবার ২.৬ শতাংশ এলাকায় এই ঘাটতি ১০০ মিটার ছাড়িয়ে গেছে।
যদিও কিছু অংশ আগের চেয়ে খানিকটা উজ্জ্বল হয়েছে, কিন্তু গোটা বিশ্বজুড়ে ধারা কিন্তু ঠিক উল্টো—সমুদ্র দিনে দিনে আরও বেশি অন্ধকার হচ্ছে। বিজ্ঞানীরা বলছেন, এই পরিবর্তনের ফলে বিপাকে পড়ছে সেইসব সামুদ্রিক প্রাণীরা যারা আলোর উপর নির্ভর করে বাঁচে, চলাফেরা করে ও বংশবৃদ্ধি করে। প্লাইমাউথ বিশ্ববিদ্যালয়ের অধ্যাপক থমাস ডেভিস বলেন, “সূর্যের আলো বা চাঁদের আলো না পেলে যেসব প্রাণী টিকে থাকতে পারে না, তাদের জন্য এখন অনেকটা কম জায়গা রইল সমুদ্রে।”

গবেষকরা জানাচ্ছেন, উপকূলবর্তী অঞ্চলে কৃষিকাজ ও অতিবর্ষণের কারণে নদী দিয়ে সমুদ্রে পলি ও পুষ্টিগুণযুক্ত পদার্থ প্রবেশ করছে। এর ফলে জলে প্ল্যাঙ্কটনের পরিমাণ বেড়ে যাচ্ছে, যা আলোর প্রবেশ আরও বাধা দিচ্ছে। আবার খোলা সমুদ্রে জলের তাপমাত্রা বাড়া ও শৈবাল-জীবনের পরিবর্তনকেও এর কারণ হিসেবে দেখছেন গবেষকরা।

এই পরিস্থিতির জেরে অনেক প্রাণী বাধ্য হচ্ছে আরও উপর দিকে উঠে আসতে, যেখানে তারা খাবার ও বাসস্থানের জন্য অন্যদের সঙ্গে লড়াই করতে বাধ্য হচ্ছে। এর প্রভাব পড়তে পারে সমুদ্রের সার্বিক ভারসাম্য, মাছ ধরার ব্যবসা, এমনকি জলবায়ুর উপরও। প্লাইমাউথ মেরিন ল্যাবরেটরির অধ্যাপক টিম স্মিথ বলেন, “যদি আলো পৌঁছানোর স্তর এতটা কমে যায়, তাহলে আলোর উপর নির্ভরশীল প্রাণীরা উপরের স্তরে উঠে আসতে বাধ্য হবে, আর সেটা সমগ্র সামুদ্রিক বাস্তুতন্ত্রের জন্য এক বিশাল পরিবর্তন।” বিজ্ঞানীদের মতে, এখনই এই পরিবর্তনের কারণ ও প্রভাব বুঝে দ্রুত পদক্ষেপ না নিলে ভবিষ্যতে সমুদ্র ও মানবজীবন দুটোই বড় বিপদের মুখে পড়তে পারে।