সাইবেরিয়ায় গলছে পারমাফ্রস্ট, পৃথিবীর গভীরে উঁকি দিচ্ছে ‘আন্ডারওয়ার্ল্ড’

‘গেটওয়ে টু আন্ডারওয়ার্ল্ড’
শেষ আপডেট: 7 August 2025 19:10
দ্য ওয়াল ব্যুরো: সাইবেরিয়ার জমাট জমি ফাটল ধরিয়ে যেন খুলে যাচ্ছে পৃথিবীর গোপন দরজা। স্থানীয়রা যাকে বলেন ‘গেটওয়ে টু আন্ডারওয়ার্ল্ড’, বিজ্ঞানীরা নাম দিয়েছেন, ‘মেগা স্লাম্প’। রাশিয়ার উত্তর-পূর্বাঞ্চলের বাটাগাইকা ক্রেটার। আয়তনে এক কিলোমিটারের বেশি। আর সেটি ক্রমশ বড় হচ্ছে। যেভাবে গলছে সাইবেরিয়ার পারমাফ্রস্ট, তাতে উদ্বিগ্ন নাসা-সহ বিশ্বের নানা দেশের গবেষকরা।
দেখতে গর্তের মতো হলেও, এর গভীরে লুকিয়ে রয়েছে আরও ভয়ঙ্কর ভবিষ্যতের সংকেত। কারণ এই পারমাফ্রস্ট—যে জমিতে শতাব্দীর পর শতাব্দী ধরে বরফ জমে আছে—এখন ক্রমাগত গলে যাচ্ছে। আর সেই সঙ্গে বেরিয়ে আসছে মাটির তলায় জমে থাকা বিপুল জৈব কার্বন। যা মিশছে বায়ুমণ্ডলে। ফল, আরও দ্রুত হারে উষ্ণ হচ্ছে পৃথিবী।
কী এই পারমাফ্রস্ট?
নাসা-র সংজ্ঞা বলছে, পৃথিবীর এমন অঞ্চল, যেখানে অন্তত দু’বছর ধরে মাটি, বালি ও শিলা একসঙ্গে হিমায়িত অবস্থায় থাকে, তাকে বলা হয় পারমাফ্রস্ট। সাধারণত উত্তর গোলার্ধের মেরু অঞ্চলের কাছাকাছি এলাকাগুলিতে এ ধরনের পারমাফ্রস্ট দেখা যায়। সাইবেরিয়ার বিস্তীর্ণ অংশ জুড়ে রয়েছে এই হিমায়িত ভূমি। রাশিয়ার প্রায় ৬৫ শতাংশ এলাকায় রয়েছে পারমাফ্রস্ট। কিন্তু এখন উষ্ণতার প্রভাবে সেই হিমশীতল মাটি গলতে শুরু করেছে। আর এই গলনের সঙ্গেই জেগে উঠছে এক ভয়ঙ্কর বিপদের আশঙ্কা।
বাটাগাইকা ক্রেটার: বিজ্ঞান বনাম বিশ্বাস
১৯৬০-এর দশকে প্রথম নজরে আসে বাটাগাইকা। সেই সময় থেকে আজ পর্যন্ত, ধীরে ধীরে গহ্বরটি বাড়তে বাড়তে এক কিলোমিটারেরও বেশি চওড়া হয়েছে। স্থানীয়রা বলেন, আগে যেটি ছিল রাস্তা থেকে ৩০ মিটার দূরে, এখন তা প্রায় চোখের সামনে।
তাদের বিশ্বাস, এটি আন্ডারওয়ার্ল্ড বা পাতালের প্রবেশদ্বার। অন্যদিকে, বিজ্ঞানীরা জানাচ্ছেন, এটি একটি ‘মেগা স্লাম্প’। জমাট বরফ গলে গিয়ে মাটি নিচে বসে গিয়ে এই বিশাল গহ্বর তৈরি হয়েছে। এবং এই গলন কোনও স্বাভাবিক ঘটনা নয়, এটি জলবায়ু পরিবর্তনের একটি ভয়ঙ্কর প্রতিফলন।
বিশ্ব উষ্ণায়নের আগুনে সাইবেরিয়া!
গবেষণা বলছে, রাশিয়ার উত্তরাংশ বিশ্বের গড়ের চেয়ে ২.৫ গুণ দ্রুত হারে গরম হচ্ছে। পারমাফ্রস্ট গলে যাওয়ার ফলে রাস্তা ভেঙে পড়ছে, বাড়িঘর বসে যাচ্ছে, পাইপলাইন ফেটে যাচ্ছে। দিন দিন আরও বিপদজনক হয়ে উঠছে পরিস্থিতি।
আর শুধু রাশিয়া নয়, এই গলনের প্রভাব সারা পৃথিবীতে পড়বে। কারণ, মাটির নীচে জমে থাকা মিথেন ও কার্বনের মতো গ্রীনহাউস গ্যাস বেরিয়ে এসে বায়ুমণ্ডলে মিশছে। যা বাড়িয়ে দেবে পৃথিবীর উষ্ণতা, আরও গলাবে হিমবাহ, বাড়াবে সমুদ্রপৃষ্ঠের উচ্চতা।
বিজ্ঞানীরা কী জানাচ্ছেন?
বিজ্ঞানীরা বলছেন, বাটাগাইকার মতো বিশাল পারমাফ্রস্ট গলতে শুরু করলে, তা নিয়ন্ত্রণ করা অসম্ভব হয়ে উঠবে। তাই এখনই প্রয়োজন বৈশ্বিক হস্তক্ষেপ। না হলে শুধু সাইবেরিয়াই নয়, বিপন্ন হবে গোটা মানবসভ্যতা।