ভাবতে অবাক লাগলেও এটাই সত্যি যে, একজন স্কুলশিক্ষকের একাগ্রতা, আত্মত্যাগ আর দূরদৃষ্টি ভারতের গ্রামীণ ক্রীড়াসংস্কৃতিতে নতুন দিশা দেখাচ্ছে। দেশের ভবিষ্যৎ দাবাড়ুরা উঠে আসবে অখ্যাত গ্রামের, নাম না জানা গঞ্জের ক্লাসরুম থেকেই। সন্দীপ উপাধ্যায় সেই মডেলই মেলে ধরেছেন।

গ্রাফিক্স: দিব্যেন্দু দাস
শেষ আপডেট: 11 September 2025 17:49
দ্য ওয়াল ব্যুরো: ভারতীয় দাবার স্বর্ণযুগ কি শুরু হয়ে গিয়েছে? একঝাঁক দাবাড়ু—আর প্রজ্ঞানন্দ থেকে ডি গুকেশ হয়ে দিব্যা দেশমুখ—কেউ ছেলে, কেউ মেয়ে… কারও বয়স আঠারো, কেউ উনিশে পা রেখেছেন—চৌষট্টি খোপের লড়াইয়ে বিশ্বের সেরা তারকাদের ঘোল খাওয়াচ্ছেন। কেন এই বিপ্লব? কী কারণে আচমকাই গুণে-পরিমাণে ভারত দাবার আসরে এতটা আধিপত্য দেখাতে পারল, তার বিশ্লেষণ বিস্তারে হতে পারে।
আজকের আলোচনা যদিও সমগ্র ভারত নিয়ে নয়। কেন্দ্রে গুজরাত। পশ্চিম ভারতের এই রাজ্যের একটি পিছিয়ে-পড়া গ্রাম। আর স্পটলাইটে সেই গ্রামের এক শিক্ষক। পেশায় অঙ্কের মাস্টারমশাই। গুজরাতের মহিসাগর জেলার রাটুসিং ন মুভাড়া গ্রামের সন্দীপ উপাধ্যায় (Sandip Upadhyay)। যিনি সবার আড়ালে, নীরবে নিজের পেশাগত দায়িত্ব পালনের পাশাপাশি একঝাঁক ছেলেমেয়েদের দাবার চালে হাতেখড়ি দিচ্ছেন। বুনে চলেছেন স্বপ্ন। তুলে ধরছেন নাম… কার্লসেন, আনন্দ, ক্যাসপারভ, গুকেশ। টার্গেট একটাই: ‘গ্র্যান্ডমাস্টার’ হওয়া। কিংবা তাকে ছাপিয়ে গিয়ে দুনিয়াসেরার তকমা অর্জন!
একঝলক দেখলে আলাদা কিছু নেই। তবে কথা বললেই মালুম হয়, নিখাদ গণিতের শিক্ষক। বক্তব্য স্পষ্ট, চিন্তায় যুক্তির ঝলক আর বচনে মেধার বিকিরণ। সেটা ছলকে ওঠে ক্লাসরুমে, যখন তিনি চক-ডাস্টার হাতে ব্ল্যাকবোর্ডের সামনে দাঁড়ান। দীপ্তি ছোটে ক্লাসের বাইরেও। যখন তিনি কাচ্চাবাচ্চাদের নিয়ে জমিয়ে ফেলেন দাবার আসর! নিছক খেলা নয়—শিশুদের মস্তিষ্ক শাণিত করার হাতিয়ার হিসেবেই একে দেখতে চান সন্দীপ। প্রাইমারি স্কুলে প্রতিটি বাচ্চার হাতে ঘুঁটি তুলে দিয়েছেন। উদ্দেশ্য একটাই: খেলার ছলে আরও শানিত হোক মনন, ধার পাক বিশ্লেষণ আর ফুটে উঠুক আত্মবিশ্বাস।
উপাধ্যায়ের এই যাত্রা নিছক শিক্ষকতার গণ্ডির মধ্যে আটকে নেই। নিজের বেতনের টাকায় কিনেছেন ১২৫ খানা চেস বোর্ড, ৩৫টি টাইমার আর একগাদা বই। এমনকি ইমানুয়েল নেমানের (Emmanuel Neiman) লেখা ‘দ্য ম্যাগনাস মেথডে’র (The Magnus Method) অনুবাদ পর্যন্ত করেছেন গুজরাতিতে। যাতে গ্রামের ছেলেমেয়েরা মায়ের ভাষায় পড়ে ফেলতে পারে দাবার বাইবেল। মাথায় গেঁথে যায় বেসিক ম্যানুয়াল। আধুনিক চেস-তত্ত্ব যেন কারও নাগালের বাইরে না থাকে।
সামগ্রিক উদ্যোগ নেহাতই কেজো নয়। বরং, আবেগে আর্দ্র। সন্দীপের কথায়, ‘আমার নিয়ম সহজ। বেতনের একটা ছোট অংশ সবসময় বাচ্চাদের জন্য বরাদ্দ রাখি। ওদের জন্যই আয় করছি। তাই ছেলেমেয়েদেরও অধিকার রয়েছে!’ শুধু তাই নয়। নিজের পরিকল্পনার বিস্তারে একটি ট্রাস্টও খুলেছেন। যাতে উদ্যোগটা দীর্ঘমেয়াদি হয়। তবে কেবল খেলায় ডুবে থাকার পক্ষপাতী নন সন্দীপ। জোর দিয়ে বলেন, ‘ছুটির দিনে স্কুলে এসে দাবা শেখাই। কিন্তু পড়াশোনার সঙ্গে কখনও আপস করি না!’
এই নিবেদন যে ফল দিচ্ছে, তার প্রমাণও মিলেছে। ২০২৩ সালে তাঁর স্কুল থেকে ১৪ জন ছাত্র জেলা স্তরের দাবা প্রোগ্রামে সুযোগ পায়। পরের বছর সেই তালিকায় জুড়ে যায় আরও সাতজনের নাম। বিনামূল্যে পড়াশোনা, প্রশিক্ষণ আর হস্টেলের সুযোগ গরিব পরিবারের ছেলেমেয়েদের কাছে নতুন ভবিষ্যতের দরজা খুলে দিয়েছে। উপাধ্যায়ের কাছে দাবার লক্ষ্য নিছক গ্র্যান্ডমাস্টার তৈরি নয়। তাঁর টার্গেট আরও বড়। দাবা মানে মনোযোগ বাড়ানো, সমস্যা সমাধানের দক্ষতা, মানসিক দৃঢ়তা তৈরি। এগুলো প্রতিযোগিতার বাইরেও জীবনের অপরিহার্য সম্পদ।
আজ তাঁর নিরলস পরিশ্রমে রাটুসিং ন মুভাড়া গ্রাম হয়ে উঠেছে গুজরাতের দাবার মডেল। গ্রামের সরকারি স্কুল থেকে তৈরি হচ্ছে নতুন প্রজন্মের খেলোয়াড়। তাঁদের সবাই কি বিশ্বচ্যাম্পিয়ন হবেন? হয়তো না। কিন্তু জীবনের লড়াইয়ে দাবার ঘুঁটি সাজানোর কৌশলকে কাজে লাগিয়ে পথের কাঁটা তুলে ফেলবেন, এটুকু আশায় আজও বোড়ে-গজের চাল শিখিয়ে চলেন সন্দীপ।
ভাবতে অবাক লাগলেও এটাই সত্যি যে, একজন স্কুলশিক্ষকের একাগ্রতা, আত্মত্যাগ আর দূরদৃষ্টি ভারতের গ্রামীণ ক্রীড়াসংস্কৃতিতে নতুন দিশা দেখাচ্ছে। দেশের ভবিষ্যৎ দাবাড়ুরা উঠে আসবে অখ্যাত গ্রামের, নাম না জানা গঞ্জের ক্লাসরুম থেকেই। সন্দীপ উপাধ্যায় সেই মডেলই মেলে ধরেছেন।