'গ্র্যান্ডমাস্টার' তো শিরোপা। অভিমন্যু মিশ্র কিন্তু এখনও স্কুলপড়ুয়া। বয়স ১৬। গা থেকে কৈশোরের গন্ধ মুছে যায়নি। অথচ চৌষট্টি খোপের লড়াইয়ে বিশ্বচ্যাম্পিয়নদের হুঁশ উড়িয়ে দিচ্ছেন। বিশ্বদাবার নতুন সূর্যোদয় কি তবে এই ভারতীয় বংশোদ্ভূত কিশোর?

গ্রাফিক্স: দিব্যেন্দু দাস
শেষ আপডেট: 9 September 2025 18:15
দ্য ওয়াল ব্যুরো: উজবেকিস্তানের সমরখন্দ। ফিডে গ্র্যান্ড সুইস ২০২৫-এর পঞ্চম রাউন্ড। সাদা ঘুঁটিতে খেলতে বসে মাত্র ১৬ বছরের এক কিশোর পরাস্ত করলেন বিশ্বচ্যাম্পিয়নকে। নাম অভিমন্যু মিশ্র। হারালেন দোম্মারাজু গুকেশকে। মাত্র ৬১ চালেই কিস্তিমাত ভারতীয় গ্র্যান্ডমাস্টার। ইতিহাসের কনিষ্ঠতম দাবাড়ু হিসেবে কোনও বিশ্বচ্যাম্পিয়নকে ক্লাসিকাল দাবায় হারানোর নজির গড়লেন ভারতীয় বংশোদ্ভূত বিস্ময় কিশোর!
অভিমন্যু মিশ্র। জন্ম ৫ ফেব্রুয়ারি, ২০০৯। মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রের নিউ জার্সিতে। বাবা হেমন্ত মিশ্র ভোপালের মানুষ। ২০০০ সালে এমটেক করে পাড়ি দেন আমেরিকায়। মা স্বাতী, উত্তরপ্রদেশের আগ্রার বাসিন্দা। অভিমন্যুর এক বোনও আছে—ঋধিমা।
দাবার সঙ্গে পরিচয় খুব ছোটবেলায়। বাবা-মায়ের আসল উদ্দেশ্য ছিল ছেলেকে ফোন বা ট্যাবের আসক্তি থেকে দূরে রাখা। আর তাই মাত্র আড়াই বছর বয়সেই অভিমন্যুকে বসানো হয় দাবার বোর্ডের সামনে। আর কী আশ্চর্য! নেশা ছাড়ানোর কৌশলই নতুন নেশার জন্ম দেয়! দাবায় পেয়ে বসে অভিমন্যুকে। ঘরে তাক লাগান। তারপর পা বাড়ান বাইরের দুনিয়ায়। অংশ নিতে থাকেন একের পর এক টুর্নামেন্টে। পাঁচ বছর বয়সে প্রতিযোগিতামূলক আসরে হাতেখড়ি। শিক্ষাগুরু বাবা। পরে কোচিং নেন দুই ভারতীয় দাবাড়ু ভারতীয় গ্র্যান্ডমাস্টার অরুণ প্রসাদ সুব্রহ্মণ্য ও মাগেশ চন্দ্রনের কাছে। যা অভিমন্যুকে আরও শাণিত করে তোলে।
এরই ফসল বিদ্যুৎগতির উত্থান! মাত্র সাত বছরে ইউএসসিএফ রেটিং ২০০০-এ সর্বকনিষ্ঠ খেলোয়াড় হিসেবে নাম লেখান। ২০১৯ সালে আন্তর্জাতিক মাস্টার (IM)। বয়স মোটে দশ বছর—আরও একটি বিশ্বরেকর্ড! ২০২১ সালের ৩০ জুন, মাত্র ১২ বছর ৪ মাস ২৫ দিনে গ্র্যান্ডমাস্টারের খেতাব অর্জনের সুবাদে ভেঙে দেন সের্গেই কার্জাকিনের ১৯ বছরের পুরনো নজির। শেষ জিএম নর্ম ছিনিয়ে নেন বুদাপেস্টে, লিওন মেন্ডোনকাকে হারিয়ে।
অশ্বমেধের ঘোড়া চলতে শুরু করেছে। নামার লক্ষণ নেই। চকিতে উত্থান হয় ঠিকই। কিন্তু ধারাবাহিকতা ধরে রেখে নিজের জাত চিনিয়ে দেন অভিমন্যু! ২০২১-এর চার্লট স্প্রিং জিএম নর্ম ইনভাইটেশনালে প্রথমবার রেটিং ছোঁয় ২৪০০। একই বছর বুদাপেস্টের ভেজেরকেপজো ও ফার্স্ট স্যাটারডে জিএম টুর্নামেন্টে পরপর নর্ম সংগ্রহ করে গ্র্যান্ডমাস্টারের মুকুট মাথায় তোলেন। ২০২২-এ জেতেন সেন্ট লুইস স্প্রিং চেস ক্লাসিক ‘বি’। পরের বছর সিগেমান টুর্নামেন্টে রানার্স আপ ও ইউএস জুনিয়র চ্যাম্পিয়নশিপ।
যদিও এই চমকপ্রদ জার্নি একেবারে বিতর্কশূন্য ছিল না। মিডিয়ার প্রভাবশালী অংশই রুখে দাঁড়ায়। ‘নিউইয়র্ক টাইমস’ সরাসরি প্রশ্ন তোলে হাঙ্গেরির ‘নর্ম টুর্নামেন্টে’র মান নিয়ে। অভিযোগ, দুর্বল প্রতিপক্ষ বেছে নিলেই নর্ম পাওয়া সহজ। অভিমন্যু নাকি পরিকল্পিতভাবে সেই কাজ করেছেন! ইয়ান নেপোমনিয়াচ্চি পর্যন্ত নিয়ম পাল্টানোর পক্ষে সওয়াল করেন। ঘরে-বাইরে চাপের মুখে কোণঠাসা ‘ফিডে’ ২০২২-এ নর্ম সংক্রান্ত আইন বদলে বাধ্য হয়। কিন্তু তাতে অভিমন্যুকে আটকানো যায়নি। ২০২৫ সালের গ্র্যান্ড সুইসে গুকেশকে হারানোর পর লাইভ রেটিং ছুঁয়েছে ২৬৩৭.২। ঢুকে পড়েছেন বিশ্বের শীর্ষ ১০০-র তালিকায় (বর্তমান অবস্থান ৯৪)।
'গ্র্যান্ডমাস্টার' তো শিরোপা। অভিমন্যু মিশ্র কিন্তু এখনও স্কুলপড়ুয়া। বয়স ১৬। গা থেকে কৈশোরের গন্ধ মুছে যায়নি। অথচ চৌষট্টি খোপের লড়াইয়ে বিশ্বচ্যাম্পিয়নদের হুঁশ উড়িয়ে দিচ্ছেন। বিশ্বদাবার নতুন সূর্যোদয় কি তবে এই ভারতীয় বংশোদ্ভূত কিশোর?