‘প্রবল শক্তি আসলে কাঁধে চাপায় প্রচণ্ড দায়িত্ববোধ!’ স্পাইডারম্যানের ‘আঙ্কল বেনে’র কথাটা কি দিব্যা দেশমুখের জীবনের ধ্রুবমন্ত্র? অক্ষরে অক্ষরে মেনে চলা শুরু করেছেন বুঝি?

দিব্যা দেশমুখ
শেষ আপডেট: 8 September 2025 11:18
দ্য ওয়াল ব্যুরো: ‘প্রবল শক্তি আসলে কাঁধে চাপায় প্রচণ্ড দায়িত্ববোধ!’
স্পাইডারম্যানের ‘আঙ্কল বেনে’র কথাটা কি দিব্যা দেশমুখের জীবনের ধ্রুবমন্ত্র? অক্ষরে অক্ষরে মেনে চলা শুরু করেছেন বুঝি? নয়তো কেন, কয়েক মাস আগে মেয়েদের বিশ্বকাপ জেতা একজন দাবাড়ু, মোটে উনিশ বছর বয়স, ফিডের টুর্নামেন্টে ওপেন সেকশনে লড়তে যাবেন? হাত পাকাতে হলে তো মেয়েদের বিভাগ খোলাই ছিল। সেখানেই নিজের ধারাবাহিকতা, ফর্ম সবকিছু ঝালিয়ে নেওয়া যেত!
যুক্তিটা যে কাঁচা নয়, সেটা টুর্নামেন্ট শুরুতেই বোঝা গেছিল। প্রথম রাউন্ডে নিজের মেন্টর অভিমন্যু পুরানিকের কাছে পরাস্ত হন। তারপর দুটো ড্র। পর পর। দুনিয়ার সেরা গ্র্যান্ডমাস্টারদের বিরুদ্ধে লড়তে নেমে অতিরিক্ত ঝুঁকি নিলেন কিনা-এই আশঙ্কা যখন তীব্র হচ্ছে, তখন অদ্ভুত এক মন্তব্য করে বসেন দিব্যা। বলেন, ‘যদি সমস্ত রাউন্ডও হেরে যাই, বদলে কিছু শিখতে পারি, আমি ঠিক থাকব!’
তিনি নিজেকে গড়ে তুলছেন। তাই পরাজয়ে গ্লানি নেই। ভুল করে কষ্ট নেই। আছে নিজেকে আরও ক্ষুরধার করে তোলার বাসনা। আরও তীক্ষ্ম, ভবিষ্যতের জন্য অপ্রতিরোধ্য করে তোলার ইচ্ছেশক্তি।
এরই ঝলক ধরা পড়ল ঠিক এর পরের রাউন্ডে। র্যাঙ্কিং ফারাক ৬৬৬। অভিজ্ঞতার ফারাক আরও বেশি। একদিকে আফ্রিকার সেরা দাবাড়ু, বিশ্ব র্যাঙ্কিংয়ে ৯৪ নম্বরে থাকা আমিন বসেম (Amin Bassem)। অন্যদিকে নতুন গ্র্যান্ডমাস্টার দিব্যা দেশমুখ (Divya Deshmukh), র্যাঙ্কিং ৭৬১। এমন অসম লড়াইয়ে শেষমেশ বাজিমাত করলেন নাগপুরের তরুণী। ফিডে গ্র্যান্ড সুইসে (FIDE Grand Swiss) দাপটের সঙ্গে জয় ছিনিয়ে নিলেন তিনি।
শুরুটা যদিও দিব্যার মনোমতো হয়নি। বসেম দশম চাল থেকেই চাপ তৈরি করেন। ষোড়শ চালে স্পষ্ট অ্যাডভান্টেজ। কিন্তু দিব্যা হাল ছাড়েননি। ম্যাচ শেষে নিজেই বললেন, ‘আজ আমি পুরো ওপেনিং ভুলে যাই। শুরুটা ভয়ানক খারাপ হয়েছিল। ও (বসেম) প্রচণ্ড চাপে রাখে। তবে আমি খুশি যে ফিরে আসতে পেরেছি!’
দেওয়ালে পিঠ ঠেকে যাওয়ার পর সেখান থেকে ম্যাচ ঘোরানোই ছিল আসল কৃতিত্ব। ধৈর্য ধরে খেলতে খেলতে ৩৩তম চালে দিলেন অপ্রত্যাশিত আঘাত। রুক এগিয়ে নিয়ে গিয়ে কেটে দিলেন g4 পন! মানে কার্যত নিজের রুকই বলিদান দিলেন! উদ্দেশ্য একটাই, বসেমের রাজার চারপাশের h-ফাইলের রক্ষাকবচ ভেঙে দেওয়া। আর এই তীক্ষ্ম বুদ্ধিদীপ্ত ঝুঁকিতেই বাজিমাত! দিব্যা হেসে বললেন, ‘ওই চালটা আমার ভীষণ ভাল লেগেছে!’
সেখান থেকেই খেলার মোড় ঘুরে গেল। কুইন, বিশপ সমেত বাকি ঘুঁটিগুলো মিলে বসেমের রাজাকে ক্রমশ ঘিরে ধরল। ৪৩তম চাল নাগাদ চেকমেট হয়ে যাওয়াটা অপ্রত্যাশিত নয়, ছিল শুধু সময়ের অপেক্ষা। শেষমেশ ৪৭তম চালে আত্মসমর্পণ করলেন আফ্রিকার সেরা গ্র্যান্ডমাস্টার। তখন বোর্ডে দিব্যা এগিয়ে দুই পন আর এক রুক নিয়ে।
এই জয় শুধু এক পয়েন্ট নয়, বড় স্বস্তিও বটে। যেমনটা আগেই বলা হয়েছে, প্রথম তিন রাউন্ডে একটিও জেতেননি—দুটো ড্র, একটা হার। তাই ম্যাচ শেষে দিব্যা খোলাখুলি স্বীকার করলেন, ‘এই জয়টা অনেকটা রেহাই দিল। ভাবছিলাম, কবে একটা জিতব! প্রথম রাউন্ডে অভিমন্যু পুরানিকের সঙ্গে খেলা খুব কঠিন ছিল। কিন্তু সেই ম্যাচেই অনেক কিছু শিখেছি, যা পরের দিকে সাহায্য করেছে!’
ওপেন সেকশনে অন্য নারী দাবাড়ু আলেক্সান্দ্রা গোর্যাচকিনাও (Aleksandra Goryachkina) জিতলেন তাঁর ম্যাচ। তাই শুধু নিজের সাফল্য নয় সবমিলিয়ে দিব্যার মন্তব্য, ‘আজ ওপেন সেকশনে মেয়েদের জন্য ভালো দিন!’