বিশ্বকাপ ২০২৬ কোয়ালিফায়ারে ইউরোপ নাকি বঞ্চিত—ইতালির কোচ গাতুসোর এমন দাবির বিরুদ্ধে উঠছে পাল্টা যুক্তি।

গ্রাফিক্স: দ্য ওয়াল
শেষ আপডেট: 18 November 2025 20:34
দ্য ওয়াল ব্যুরো: রবিবার সান সিরোয় নরওয়েকে ৯ গোলে হারালে মিলত মূল পর্বে যাওয়ার টিকিট৷ বদলে ৪ গোল খেয়ে প্লে-অফের পাকেচক্রে জড়িয়ে পড়েছে ইতালি৷ এর আগে দু'বার এই প্লে-অফের চক্করেই বিশ্বকাপে যাওয়া আটকেছে৷ প্রথমবার সুইডেন, পরের বার নর্থ ম্যাসেডোনিয়ার হাতে যাত্রাভঙ্গ। ফলে কোচ জেনারো গাতুসোর উদ্বেগ স্বাভাবিক।
যদিও স্রেফ আশঙ্কা জানিয়েই থেমে থাকেননি ইতালির একদা ডাকাবুকো মিডফিল্ডার। তোপ দেগেছেন ফিফার বিরুদ্ধে। সাফ জানিয়েছেন, শুধু তাঁরা নন, বঞ্চিত গোটা ইউরোপ। বিশ্বকাপের টিকিট পাকা করার যে নিয়ম ফাঁদা হয়েছে, তার ফায়দা লুটেছে দুনিয়ার অন্যান্য মহাদেশ। ইতালি ৮ ম্যাচের ৬টায় জিতে রানার্স আপ। ডিরেক্ট বিশ্বযুদ্ধে নামার টিকিট পায়নি। অথচ দক্ষিণ আমেরিকার ৬খানা ও আফ্রিকার ৯টা সরাসরি কোয়ালিফিকেশনের স্লট মজুত৷ তার ফায়দা নিয়েছে সেই সমস্ত অঞ্চলে প্রতিযোগিতায় নামা দেশগুলি।
কিন্তু আদৌ এই যুক্তি কি ধোপে টেকে? কতটা সারবত্তা রয়েছে গাতুসোর বিষোদগারের?
আসলে গাতুসো নিজের দলের পরিস্থিতি বোঝাতে যে তুলনায় গেছেন, সেখানেই রাজ্যের সমস্যা। ইউরোপের ‘অন্যায় বঞ্চনা’ গল্পটা বাইরে থেকে যতটা নাটকীয় শোনায়, ডেটা-তথ্য জুড়ে দিলে ছবিটা উলটো।
প্রথমত, এখন আর সেই ৯০ বা ৯৪-এর ফুটবল দুনিয়া নেই। তখন ইউএফএ অঞ্চলে ৩০–৩৯টা দেশ প্রতিযোগিতায় নামত। আজ সংখ্যাটা বেড়ে ৫৪। আর তাতে মোট কোয়ালিফিকেশন স্লট—১৬। মানে অ্যাপ্লিক্যান্ট চড়েছে প্রায় দ্বিগুণ, স্লট বেড়েছে মাত্র তিনটে। ফলত প্রতিযোগিতার ঘনত্ব বদলেছে। র্যাঙ্কিং-ফর্ম-ঐতিহ্য—কিছুতেই নিরাপদ থাকা যায় না।
গাতুসো হয়তো ভাবছেন—‘গ্রুপে রানার্স-আপ হয়েছি, আরও বেশি স্লট পাওয়া উচিত ছিল!’ কিন্তু ইউরোপে যদি সাত-দলের গ্রুপ করে সবাইকে হোম-অ্যাওয়ে ম্যাচ খেলানো হয়, তাতে বছরে অন্তত বারোটা আন্তর্জাতিক উইন্ডো লাগবে। সেই জায়গা নেই। নেশনস লিগ স্ক্র্যাপ করে দিতে হবে। এমনটা কেউ চায় না। তাই চার বা পাঁচ দলের ছোট গ্রুপে চাপ কমানোই ছিল বাস্তবসম্মত।
ইতালি দুর্ভাগ্যবশত পড়েছে নরওয়ের সঙ্গে—যারা গত তিন বছরে ইউরোপের অন্যতম দ্রুত উন্নতি করা দল। কিন্তু দুর্ভাগ্যের গল্প তখনই ধোপে টেকে যখন পারফরম্যান্স প্রায় সমমানের হয়। এখানে তা হয়নি। নরওয়ে–ইতালির মার্জিন হোম-অ্যাওয়ে মিলিয়ে ৭–১! বড় ম্যাচে আজুরিদের কোনো লড়াই-ই চোখে পড়েনি। যোগ্যতা অর্জন না হলে খাঁড়ার ঘা তো পড়বেই।
গাতুসোর দ্বিতীয় অভিযোগ—দক্ষিণ আমেরিকা নাকি ‘ফ্রি পাস’ পেয়ে যাচ্ছে। কারণ ওখানে ১০টার মধ্যে ৬টি দেশ সরাসরি বিশ্বকাপে। শুনতে বাড়াবাড়ি মনে হলেও বাস্তব বেশ সাফ। কনমেবল অঞ্চলে সর্বনিম্ন র্যাঙ্কড দল বলিভিয়া—৭৬। তার পরেও বাকি আটটি দেশ টপ–৫০। তদুপরি ‘ভ্রমণ ক্লান্তি’। ইউরোপে খেলা তারকারা বছরে ১৮টি ম্যাচ খেলতে একের পর এক মহাদেশ পাড়ি দেন—বুয়েনোস আয়ার্স থেকে লিমা, সান্তিয়াগো থেকে কুইটো। প্রায় ১০ হাজার–১২ হাজার কিমি ভ্রমণ করতে হয় সিরিজে সিরিজে।
তাহলে প্রশ্ন—যারা ব্রাজিল–আর্জেন্তিনা–উরুগুয়ের বিরুদ্ধে নিয়মিত খেলতে খেলতে ১৮ ম্যাচে ৬টা হারলেও কোয়ালিফাই করে, তারা কি অযোগ্য? ব্রাজিল এবার খেলেছে দমফাটা অবস্থায়, তবু কে বলবে তারা বিশ্বকাপে নামা উচিত নয়? ইতালি খেলেছে মাত্র আটটা ম্যাচ। একটাও অ্যাওয়ে ট্রিপ ছিল না আন্দেস পর্বতমালায়। ওয়ান-হপ ইউরোপ ভ্রমণ ছাড়া অন্য কিছু নয়। চ্যালেঞ্জের তীব্রতার তুলনাই হয় না।
আফ্রিকার ক্ষেত্রে? গাতুসো বলেছেন, ‘৯টা দল সরাসরি বিশ্বকাপে যাচ্ছে—এটা অন্যায়।’ কিন্তু আফ্রিকার ৫৩টি দেশের মধ্যে ৮টি এখন বিশ্ব ফুটবলের প্রতিষ্ঠিত শক্তি—মরক্কো, সেনেগাল, মিশর, আইভরি কোস্ট, আলজেরিয়া, দক্ষিণ আফ্রিকা, ঘানা, তিউনিসিয়া। এদের বেশিরভাগই রয়েছে টপ–৫০-এ। এই দলগুলো যে কোনও বড় ইউরোপিয়ান দেশের সঙ্গে পাল্লা দিতে পারে। মরক্কো বিশ্বকাপের সেমিফাইনালে উঠেছে (World Cup 2022 semi-final), সেনেগাল আফকন চ্যাম্পিয়ন (AFCON champions)—এরা কেন জায়গা পাবে না?
বরং প্রশ্ন হওয়া উচিত এশিয়াকে নিয়ে। সেখানকার মাত্র চারটি দল টপ–৫০-এ জায়গা পেয়েছে। অথচ আটটি সরাসরি স্লট—এখানেই সবচেয়ে বড় ‘ওভার–রিপ্রেজেন্টেশন’। কিন্তু গাতুসো তা বলেননি, কারণ এশিয়ার বিরুদ্ধে অভিযোগ তুললে রাজনৈতিক বিপদ আছে। তাই নিরাপদে দক্ষিণ আমেরিকা ও আফ্রিকা নিয়ে ক্ষোভ ঝাড়া সহজ।
আসলে ফিফার রূপান্তরই গাতুসোর তর্কের সবচেয়ে বড় ‘গোলমাল’। বিশ্বকাপকে আর ইউরোপ–দক্ষিণ আমেরিকার ব্যক্তিগত আখড়া হিসেবে রাখা হচ্ছে না। আফ্রিকা–এশিয়ার বাজার বাড়ছে, সম্প্রচার বাড়ছে, রাজনীতি বাড়ছে—ফলে প্রতিনিধিত্ব স্ফীত হয়ে চলেছে। ফুটবল যেমন বদলাচ্ছে, তেমনই পালটে যাচ্ছে বৈশ্বিক ভারসাম্য।
সব মিলিয়ে গাতুসোর বক্তব্য আবেগ, ভুল তথ্য, কোথাও নিজের দলের ব্যর্থতা আড়াল করার মিলিত চেষ্টা। নরওয়ের বিরুদ্ধে দু’ম্যাচে হাল ছাড়ার মতো ফুটবল খেললে—কোনও সিস্টেমই ইতালিকে বাঁচাতে পারবে না। ইউরোপে লড়াই কঠিন, ঠিকই। কিন্তু সেটা তো সবার জন্য! ফ্রান্স, পর্তুগাল, ইংল্যান্ড, স্পেন, নেদারল্যান্ডস—সকলেই সেই পথেই বিশ্বকাপে গেছে।
আসলে যোগ্যতা অর্জন হয় মাঠে। অভিযোগ করে নয়। ইউরোপ বঞ্চিত হয়নি, বরং আরও প্রতিযোগিতামূলক হয়েছে। বঞ্চিত ইতালির সমর্থক। উধাও সেই পুরোনো ‘জয়ের অভ্যাস’। গাতুসোর তির তাই ফিফার দিকে নয়, তাক করা উচিত ছিল নিজের দল, নিজেদের ব্যর্থ প্রস্তুতির দিকে!