পিয়ারলেস ডিরেক্টর (Peerless Director) সুপ্রিয় সিনহার (Supriyo Sinha) অনুপ্রেরণামূলক (Inspiration) যাত্রা— স্লিপ ডিস্ক (Slip Disk) থেকে ফিন-সাঁতারে (Fin Swimming) রাজ্যস্তরের সোনাজয় (State level Gold Medal)।

সোনাজয়ী সুপ্রিয় সিনহা।
শেষ আপডেট: 10 September 2025 22:42
জীবনের পথে নানা বাধা, হোঁচট, যন্ত্রণা— এ সব মিলিয়েই তো তৈরি হয় সাফল্যের প্রকৃত গল্প। পিয়ারলেস গ্রুপের ডিরেক্টর সুপ্রিয় সিনহাও তার ব্যতিক্রম নন। তবে এমনই এক যন্ত্রণা যে তাঁকে সাফল্যের শীর্ষে পৌঁছে দেবে, তা নিয়মিত খেলাধুলো করা, শরীরচর্চা করে ফিট থাকা সুপ্রিয় বছর তিনেক আগে কোমরে চোট পান জিম করতে গিয়ে। স্লিপ ডিস্ক। ৪৬ বছর বয়সের এই যন্ত্রণা সারাতে বহু ওষুধ, ব্যায়াম, ফিজিওথেরাপি করার পরে, শেষমেশ ডাক্তারবাবুর কথায় শুরু করেন সাঁতার। ডাক্তারবাবু বলেছিলেন, নিয়মিত সাঁতারেই কোমরের ব্যথা নিয়ন্ত্রণে থাকতে পারে। সেই নির্দেশ মেনে শুরু হয় এক নতুন যাত্রা, যা শেষমেশ তাঁকে রাজ্যস্তরের স্বর্ণপদক এনে দিল তিন বছর পরে।
২০২২ সালে, ডাক্তারবাবুর পরামর্শে প্রথম সাঁতার শেখার শুরু। তার আগে কোনও দিন জলে নামেননি সুপ্রিয়। লেকটাউনের সুইমিং পুলে সেই প্রথম নামা, শিক্ষানবিশের লাল টুপি পরে ভেসে থাকতে শেখা। অনেক ছোট-ছোট ছেলেমেয়ের মাঝে সে এক অন্যরকম সূচনা, ৪৬ বছর বয়সে।
তবে পড়াশোনায় অত্যন্ত মেধাবী, কর্মজগতে চূড়ান্ত সফল সুপ্রিয় সিনহার এই নতুন সূচনাও যে এতটা সফল হবে, তা তখন তিনি নিজেও ভাবেননি। প্রথম বছরে ৫০ মিটার পর্যন্ত সাঁতার কাটতে পারতেন। কিন্তু থেমে থাকেননি। ২০২৩ সালে সাহস করে প্রথম প্রতিযোগিতায় নামেন। তখনও অবশ্য মাথায় সেই লাল টুপি। সেই কমপিটিশনে দ্বিতীয় হন সুপ্রিয়, আর সেটাই তাঁর ভিতরের আগুন জ্বালিয়ে দেয়।

পরের বছর, ২০২৪। এবার পরীক্ষায় পাশ করে ‘নভিস’ থেকে ‘বিগিনার’ হওয়ার পালা। কোচের পরামর্শে পরীক্ষা দিয়ে লাল থেকে হলুদ টুপি পেলেন তিনি। অর্থাৎ বিগিনার সুইমার। এর কিছুদিন পরেই, কোচের পরামর্শে আরও একটি পরীক্ষা দিয়ে ‘সুইমার’ হয়ে ওঠা। এবার আর কোনও টুপির প্রয়োজন নেই— এ যেন নতুন এক স্বাধীনতা।
এখানেও থামার কথা ভাবেননি সুপ্রিয়। জীবনের প্রতিটা ধাপেই যিনি সফল হয়ে ছেড়েছেন, তিনি সুইমার হয়ে থেমে থাকবেনই বা কেন! তাইসেই বছরই আসে আসল চ্যালেঞ্জ—ফিন সুইমিং। জলের তলায় স্নরকেলিং-এর মতো, মাথা ডুবিয়ে সাঁতার, মাথা তুললেই ডিসকোয়ালিফায়েড।
মাস দু-আড়াই কঠিন অনুশীলন শেষে জেলা প্রতিযোগিতায় অংশ নেন সুপ্রিয়। কতটা কঠিন? সুপ্রিয়র কথায়, “রোজ বাড়ির কাজকর্ম সামলানো, মেয়েকে স্কুলে পৌঁছে দেওয়া, সারাদিন অফিসের সমস্ত দায়িত্ব—সব সারার পরে সন্ধে আটটা নাগাদ সময় হতো জলে নামার। তার পরেই চলত দেড়-দু’ঘণ্টার অনুশীলন।”
এর পরেই ব্যারাকপুর পুলিশ অ্যাকাডেমির পুলে ডিস্ট্রিক্ট লেভেলের প্রতিযোগিতায় নামের সুপ্রিয়। বয়সভিত্তিক ভি-টু বিভাগে (৪৫-৫৫ বছর) জিতে নেন মেডেল, পেয়ে যান যোগ্যতা অর্জনের সুযোগ!

তার পরেই রাজ্য প্রতিযোগিতার দুয়ারে পৌঁছনো ছিল সময়ের অপেক্ষা। ১৫টি জেলা থেকে আসা চৌখস প্রতিদ্বন্দ্বীদের ভিড়ে দাঁড়িয়ে সুপ্রিয় সোনা জেতেন— ৫০ মিটার বাই-ফিন ক্যাটেগরিতে। সেই সঙ্গেই বললেন, লেকটাউন সুইমিং পুলের প্রতি কৃতজ্ঞতার কথা। বিশেষ করে পৃথ্বীশ স্যার ও জয়ন্ত স্যার যেভাবে তাঁকে তৈরি করেছেন, তাতেই এই সাফল্য এসেছে।
তবে রাজ্যস্তরে এই প্রথম হওয়ার অভিজ্ঞতা সুপ্রিয়র এই প্রথম নয়। ১৯৯৫ সালে উচ্চমাধ্যমিকে সারা রাজ্যে প্রথম হয়েছিলেন তিনি। তার ৩০ বছর পর আবারও সেরা হলেন— এবার ক্রীড়াক্ষেত্রে! বাঙালিদের মধ্যে এমন প্রতিভা কি খুব বেশি দেখা যায়!

সুপ্রিয় সিনহা আজ শুধু একজন সফল কর্পোরেট ডিরেক্টর নন, সেই সঙ্গে একজন জাতীয় স্তরের সাঁতারুও, যিনি জলে নামার প্রথম পদক্ষেপটা করেছিলেন মাত্র তিন বছর আগে। চল্লিশের কোঠায় বয়স পৌঁছলে অনেকেই যেখানে আক্ষেপ করেন, কত কিছু করা হল না বলে, তখনই নতুন শুরুর কথা ভেবেছেন সুপ্রিয়। সেই ভাবনার ফসল হিসেবেই আগামী নভেম্বরে বাংলার হয়ে প্রতিনিধিত্ব করবেন জাতীয় প্রতিযোগিতায়। অনুপ্রেরণা জোগাবেন বহু মানুষকে, শেখাবেন, শুরু করার বয়স নেই, ইচ্ছে আর অধ্যবসায় থাকলেই সাফল্য আসে।