তাঁর কাছে এই মুহূর্তে প্রতিটি লঘু ভুল শিক্ষা, প্রতিটি নির্মম পরাজয় অভিজ্ঞতা। তবু প্রত্যেক ম্যাচে আক্রমণাত্মক খেলতে চাওয়ার মানসিকতা প্রমাণ করে, স্রেফ ‘টিকে থাকা’র জন্য বোর্ডে বসেন না—গুকেশ খেলেন লড়াই করতে।

ডি গুকেশ
শেষ আপডেট: 17 September 2025 17:40
দ্য ওয়াল ব্যুরো: দাবার দুনিয়ায় একটাই নাম আপাতত আলোচনার কেন্দ্রে—গুকেশ দোম্মারাজু (Gukesh Dommaraju)। বিশ্বচ্যাম্পিয়ন হওয়ার পর থেকেই তাঁর প্রতিটি চাল, প্রতিটি টুর্নামেন্ট আতশকাচের নিচে।
এশিয়া কাপ নয়, বিশ্বকাপ নয়—এবার মঞ্চ ছিল ফিডে গ্র্যান্ড সুইস (FIDE Grand Swiss)। সমরখন্দে ১১ রাউন্ডে তিন হারের সঙ্গে চার ড্র—এই দুর্বল পারফরম্যান্সে গুকেশ খোয়ালেন ১৬ রেটিং পয়েন্ট।
অনেকের চোখে যেন ছবিটা পরিচিত। আগেও দেখা মিলেছে। ‘ডিং লিরেন সিনড্রোম’। মানে, চ্যাম্পিয়ন হওয়ার চাপ সামলাতে না পেরে দ্রুত ‘ফ্রিফল’। বিশ্বচ্যাম্পিয়ন হয়েও ডিং লিরেন (Ding Liren) বরাবর আন্ডারডগ। শিরোপা জয়ের চাপ সামলাতে হত। যা যুঝে উঠতে না পেরে কার্যত উবে যান। গুকেশের ক্ষেত্রেও কি বিষয়টা এতখানি সাদা-কালো?
এর জবাব খুঁজতে হলে, প্রথমেই বুঝতে হবে, গ্র্যান্ড সুইস মোটেও দুধেভাতে প্রতিযোগিতা নয়, দাবার সবচেয়ে কঠিন টুর্নামেন্টগুলির একটি। নিয়ম এমন, যে প্রতিটি রাউন্ডে সমান পয়েন্টধারী প্রতিদ্বন্দ্বীর মুখোমুখি হতে হয়। ফলে একটানা শীর্ষে থাকা কার্যত অসম্ভব। বড় উদাহরণ ইরানের পারহাম মাগসুদলু। চার রাউন্ড টপে থাকার পর নিমেষে নেমে এলেন ২৭তম স্থানে। গুকেশও ছয় পয়েন্টে শেষ করেছেন, ঠিক একই জায়গায় প্রজ্ঞানন্দ এবং প্রাক্তন বিশ্বচ্যাম্পিয়ন ফাইনালিস্ট ইয়ান নেপোমনিয়াচ্চিও রয়েছেন। তাহলে কি তাঁদের ক্ষেত্রেও ‘অবনতি’-র অভিযোগ উঠবে?
আসলে বিশ্বচ্যাম্পিয়নশিপ বা ক্যান্ডিডেটস টুর্নামেন্টে গুকেশ প্রতিপক্ষকে জানতেন ভেতর থেকে। নিখুঁত ওপেনিং রিপার্টোয়ার সাজিয়ে নামতেন খেলায়। গ্র্যান্ড সুইসে সে সুযোগ নেই। প্রতিদিন রাতে জানা যাচ্ছে কার সঙ্গে খেলা। ঠিক পরদিন বিকেলেই বোর্ডে মুখোমুখি! যে খেলোয়াড় হিসেব–নিকেশের সূক্ষ্মতায় নিজেকে গড়ে তুলেছেন, তাঁর কাছে এই পরিস্থিতি নিঃসন্দেহে অস্বস্তিকর। তাই এখানে ভুলচুক বাড়লেও বিশ্বচ্যাম্পিয়নশিপে তা পুনরাবৃত্ত হওয়ার প্রশ্নই ওঠে না।
অবশ্য এটাও সত্যি, চলতি বছর গুকেশের কাছে উত্থান-পতনময়। বন্ধুর। ওয়াইক আন জি-তে (Tata Steel) শেষ রাউন্ড অবধি খেতাবের লড়াইয়ে ছিলেন। নরওয়ে চেসেও (Norway Chess) দুরন্ত ছন্দে। ক্রোয়েশিয়ার সুপারইউনাইটেড র্যাপিড–ব্লিটজ (SuperUnited Rapid and Blitz) জিতেছেন। আবার একই বছরে বড়মাপের হারের কারণে শিরোনামে!
এসবের মধ্যে মিশে রয়েছে ম্যাগনাস কার্লসেনকে ক্ল্যাসিক্যাল ও র্যাপিড—দুই ফরম্যাটেই হারানোর সাফল্য। ফাবিয়ানো কারুয়ানা (Fabiano Caruana)-কে একাধিকবার কিস্তিমাত দেওয়া। এগুলো কি কোনও পতনোন্মুখ দাবাড়ুর চরিত্রলক্ষণ হতে পারে?
সমরকন্দের বিতর্কিত পরাজয়ের দিকেই না হয় তাকানো যাক। ১৬ বছরের অভিমন্যু মিশ্রর (Abhimanyu Mishra) বিরুদ্ধে খেলায় গুকেশ ওপেনিংতেই (১২তম চাল) জি-পন (g-pawn) এগিয়ে মারাত্মক ভুল করে বসেন। মিডল গেমে পরিস্থিতি সামলে তবু ড্র করার মতো জায়গায় পৌঁছে গিয়েছিলেন। সেখানেও আক্রমণাত্মক খেলতে গিয়ে হার মেনে নেন। কারুয়ানার কথায়, ‘এটা ৯৯ শতাংশ ড্র ছিল। কিন্তু গুকেশ লড়াই চালিয়ে গেলেন, হয়তো ভেবেছিলেন প্রতিপক্ষকে সময়ের চাপে ফেলবেন!’ এই রণকৌশল ভুল, নিঃসন্দেহে। কিন্তু একইসঙ্গে লড়াইয়ের মানসিকতাও কি স্পষ্ট বোঝা যাচ্ছে না? তাঁর খেলায় ভুল হচ্ছে, কিন্তু প্রতিটি ম্যাচেই জেতার খিদে স্পষ্ট। জয়-পরাজয়ের ওঠাপড়া স্বাভাবিক। বিশেষ করে ১৮–১৯ বছরের তরুণদের ক্ষেত্রে তো বটেই।
পরবর্তী বিশ্বচ্যাম্পিয়নশিপ লড়াই শুরু হতে এখনও এক বছরেরও বেশি সময় বাকি। এর মধ্যে র্যাপিড, ব্লিটজ, এমনকি ‘ফ্রিস্টাইল চেসে’ নিজেকে ঝালিয়ে নিচ্ছেন। উদ্দেশ্য পরিষ্কার—শুধু ক্ল্যাসিক্যাল নয়, দাবার প্রতিটি ফরম্যাটে ভারসাম্য খোঁজা। হাতে সময় যথেষ্ট।
অতএব, সমরখন্দের খানাখন্দে খানিক হোঁচট খেলেও এখনই আতঙ্কের কিছু নেই। গুকেশ কেবল খেতাব নয়, মানসিকতার দিক থেকেও বিশ্বচ্যাম্পিয়ন। তাঁর কাছে এই মুহূর্তে প্রতিটি লঘু ভুল শিক্ষা, প্রতিটি নির্মম পরাজয় অভিজ্ঞতা। তবু প্রত্যেক ম্যাচে আক্রমণাত্মক খেলতে চাওয়ার মানসিকতা প্রমাণ করে, স্রেফ ‘টিকে থাকা’র জন্য বোর্ডে বসেন না—গুকেশ খেলেন লড়াই করতে। আর এটাই আগামীর আকাশপ্রদীপ।