৩৮ বছর বয়সে জোকোভিচ কেবল একজন অভিজ্ঞ খেলোয়াড় নন, এক চলমান ‘ল্যাবরেটরি’! যেখানে শরীর, মন আর বিজ্ঞান একসঙ্গে কাজ করে।
.jpeg.webp)
নোভাক জোকোভিচ
শেষ আপডেট: 3 February 2026 17:02
দ্য ওয়াল ব্যুরো: বয়স ৩৮। এই বয়সে যেখানে টেনিস দুনিয়ার বেশিরভাগ কিংবদন্তি স্মৃতিচারণে ব্যস্ত, সেখানে এখনও কোর্টে দাপট দেখাচ্ছেন নোভাক জোকোভিচ (Novak Djokovic)। কেবল টিকে থাকা নয়—অনেক ক্ষেত্রে নিজের থেকে ১৫–২০ বছর কম বয়সি প্রতিপক্ষকে শারীরিক ও মানসিকভাবে চ্যালেঞ্জের মুখে ফেলছেন। প্রশ্ন একটাই—এটা কি শুধুই প্রতিভা? নাকি পরিকল্পিত জীবনযাপন, শরীরবিজ্ঞান আর মানসিক অনুশীলনের ফল?
বিশেষজ্ঞদের নজরে জোকোভিচের দীর্ঘায়ু কেরিয়ার আসলে সচেতনভাবে গড়ে তোলা এক ‘হাই-পারফরম্যান্স লাইফস্টাইল’। ডায়েট থেকে শুরু করে ঘুম, ট্রেনিং, রিকভারি, এমনকি চিন্তার ধরন—সবকিছু নিয়ন্ত্রিত।
ডায়েট বদলের টার্নিং পয়েন্ট
কেরিয়ারের শুরুর দিকে সার্বিয়ান তারকা মাঝেমধ্যে ম্যাচ চলাকালীন হঠাৎ ক্লান্ত হয়ে পড়তেন। শ্বাসকষ্ট, এনার্জি ড্রপ—সব মিলিয়ে বড় ম্যাচে প্রায়শই সমস্যা দেখা দিত। ২০১০ সালে পুষ্টিবিদ ডা. ইগর সেটোয়েভিচের (Dr. Igor Cetojevic) সঙ্গে কাজ শুরুর পর ছবিটা পাল্টে যায়।
পরীক্ষায় ধরা পড়ে, গ্লুটেন, ডেয়ারি আর রিফাইন্ড সুগার শরীরের পক্ষে মারাত্মক ক্ষতিকর। গ্লুটেন বাদ দেওয়ার পর শ্বাসপ্রশ্বাসের সমস্যা, ডেয়ারি ছাড়ায় শরীরের প্রদাহ কমে। পাশাপাশি হজমশক্তির উন্নতি। আর চিনি বাদ দেওয়ায় ম্যাচের মাঝখানে এনার্জি ‘ক্র্যাশ’ প্রায় উধাও!
ধীরে ধীরে জোকোভিচ দিকে যান প্ল্যান্ট-ডমিন্যান্ট ডায়েটের। পুরোপুরি ‘ভেগান’ না হলেও তাঁর খাবারের তালিকার বড় অংশই উদ্ভিদজাত। যুক্তি স্পষ্ট: মাংস হজম করতে শরীরের অতিরিক্ত শক্তি লাগে—যা কোর্টে ফোকাস ধরে রাখায় খরচ করা ভালো।
ফাস্টিং, হাইড্রেশন আর ‘গ্রিন ফুয়েল’
জোকোভিচের ডায়েটে শুধু ‘কী খাবেন’ নয়—‘কখন খাবেন’—এটাও সমানভাবে গুরুত্বপূর্ণ। নিয়মিত ইন্টারমিটেন্ট ফাস্টিং (Intermittent Fasting) মেনে চলেন। সাধারণত ১৬ ঘণ্টা উপবাস। এতে শরীরের ‘অটোফ্যাজি’ প্রক্রিয়া সক্রিয়—পুরনো, ক্ষতিগ্রস্ত কোষ পরিষ্কার হয় বলেই ‘জোকারে’র বিশ্বাস।
জোকোভিচের দিন শুরু হয় কুসুম গরম জল, লেবু আর সামান্য লবণ দিয়ে। তারপর ‘গ্রিন স্মুদি’—সেলারি জুস, স্পিরুলিনা, শাকপাতা। হালকা, কিন্তু পুষ্টিতে ভরপুর। এতে ভিটামিন মেলে, হজমে চাপ পড়ে না। এই অভ্যাসের ফল—ঘুম গভীর, সারাদিন এনার্জি থাকে অটুট! যে কারণে পাঁচ সেটের লড়াইয়ের পরেও তাঁকে ফ্রেশ দেখায়।
পেশি নয়, অগ্রাধিকার মোবিলিটি ও রিকভারি
জোকোভিচের ট্রেনিংয়ে ভারী মাসল বানানোর চেষ্টা নেই। তাঁর লক্ষ্য—ফ্লেক্সিবিলিটি, জয়েন্ট সেফটি আর শরীরের ইলাস্টিসিটি। প্রতিদিন যোগা, ডায়নামিক স্ট্রেচিং। হাঁটু, পা আর কোমরের ওপর আলাদা জোর। কারণ, টেনিসে হঠাৎ দিক বদল আর স্লাইডই সবচেয়ে বড় ঝুঁকি।
রিকভারির প্রশ্নে তিনি একেবারে আধুনিক। হাইপারবারিক চেম্বার, ক্রায়োথেরাপি, আইস বাথ—সবই রুটিনের অংশ। এগুলো ল্যাকটিক অ্যাসিড কমাতে, ইনফ্ল্যামেশন নিয়ন্ত্রণে রাখতে সাহায্য করে। সহজ কথায়, ম্যাচ শেষ হলেও শরীর দ্রুত ‘রিসেট’ হয়ে যায়।
মানসিক শক্তি: আসল গেমচেঞ্জার
জোকোভিচ নিজেই বলেছেন—মেডিটেশন তাঁর কাছে ফিটনেস ট্রেনিংয়ের মতোই জরুরি। প্রতিদিন অন্তত ১৫ মিনিট ধ্যান। লক্ষ্য একটাই—মনোযোগের নিয়ন্ত্রণ। চাপ এলে তিনি তা দমন করেন না। বরং, মেনে নিয়ে ছেড়ে দেন। এতে বড় পয়েন্টে ‘মেন্টাল স্পাইরাল’তৈরি হয় না। দিনের শুরুতে কৃতজ্ঞতা বা প্রার্থনার অভ্যাসে মানসিক ভারসাম্য গড়ে ওঠে। এই মানসিক প্রস্তুতিই জোকোভিচকে আলাদা করে তুলেছে। যখন অন্যরা ক্লান্ত, বিরক্ত বা ভঙ্গুর—তখনও ঠান্ডা মাথায় ম্যাচের নিয়ন্ত্রণ ধরে রাখেন তিনি।
৩৮ বছর বয়সে তাই জোকোভিচ কেবল একজন অভিজ্ঞ খেলোয়াড় নন, এক চলমান ‘ল্যাবরেটরি’! যেখানে শরীর, মন আর বিজ্ঞান একসঙ্গে কাজ করে। বয়স তাঁর ক্ষেত্রে সংখ্যা মাত্র। জোকোভিচের লাইফস্টাইল ফর্মুলা ভবিষ্যতের অ্যাথলিটদের জন্য রীতিমতো পাঠ্যবই হয়ে উঠতে পারে।