চন্দ্রকান্ত ও তাঁর স্ত্রী পদ্মা যন্ত্রণা ও অনিশ্চয়তার ভয়কে বাগে না আনলে হয়তো বছর আঠারোর দাবাড়ুর কাছে কিস্তিমাত খেতেন না কার্লসেন। নরওয়ের প্রকাণ্ড হলের বাইরে বাবাকে জড়িয়ে ধরে কাঁদছেন ডি গুকেশ… এমন স্মরণীয় মুহূর্তও কোনওদিন জন্ম নিত কি?

ডি গুকেশ
শেষ আপডেট: 15 June 2025 17:13
দ্য ওয়াল ব্যুরো: পরপর দুটো কাহিনি। একটা ছোটগল্প। তীক্ষ্ম, লক্ষ্যভেদী এবং মশলাদার।
অন্যটা উপন্যাস। পাতায় পাতায় জ্যান্ত জীবন... জীবন্ত সংঘর্ষের কলতান!
প্রথম গল্পটা সকলের জানা। নরওয়ে দাবা প্রতিযোগিতায় ম্যাগনাস কার্লসেনকে অপ্রত্যাশিত কায়দায় কিস্তিমাত করলেন ডি গুকেশ। তারপর পরাজয় মেনে নিতে না পারা দুনিয়ার এক নম্বর দাবাড়ু, যিনি ক্লাসিক্যাল চেজে কার্যত ‘অপরাজেয়’, বিজয়ী প্রতিপক্ষের সঙ্গে হাল্কা করমর্দন করেই ‘ওহ মাই গড’ বলে টেবিল চাপড়ে উঠে গেলেন। ছিটকে মাটিতে গড়াল খানকয়েক গুটি। গুকেশও যেন এই জয় বিশ্বাস করতে পারছেন না! মুখে হাত দিয়ে শুরু করলেন পায়চারি।
গোটা ঘটনাকে নিয়ে বানানো হল মিম। কেউ এই মোদ্দা গল্প নিয়ে নিজেদের মতো কমেডি অভিনয় করলেন। মোট কথা, গুকেশের কার্লসেন-বিজয় দস্তুরমতো ‘খবর’ হয়ে উঠল।
কিন্তু এর আড়ালে একই দিনে আরও একটি ঘটনা ঘটেছিল। টেবিল থাবড়ানো কাণ্ডের খানিক বাদে। রুদ্ধশ্বাস ম্যাচ জিতে অডিটোরিয়ামের বাইরে বেরিয়ে আসছেন গুকেশ। দরজা খুলে গেল। বাইরে সাংবাদিকদের ভিড়। সমর্থকদের ক্যামেরা তাক করা। অথচ সেসবের বিন্দুমাত্র পরোয়া না করে বিজয়ী কিশোর সটান এগিয়ে গেলেন বয়স্ক ভদ্রলোকের দিকে। বিনা ভূমিকায়, বিনা ভণিতায় দুজনে দুজনকে জড়িয়ে ধরলেন। তারপর কাঁদতে শুরু করলেন… শিশুর মতো… ফুঁপিয়ে, অঝোরে।
সেই ভদ্রলোকের নাম রজনীকান্ত। গুকেশের বাবা। পেশায় চিকিৎসক, ইএনটি সার্জেন। অথচ ছেলের কেরিয়ারের স্বার্থে, তাকে দুনিয়ার এক নম্বর দাবাড়ু বানানোর স্বপ্ন বুকে নিয়ে কেরিয়ারকে বিদায় জানান। টাকা রোজগার নয়, জীবনের এক ও একমাত্র টার্গেট হয়ে দাঁড়ায় গুকেশের বিশ্বজয়।'
সন্তানের স্বপ্নপূরণে নিজের লক্ষ্যকে এভাবে তুচ্ছ মনে করতে পারে কজন? রজনীকান্ত সেটাই করে দেখান। আর তাই নরওয়ের অডিটোরিয়ামের বাইরে কয়েকশো ক্যমেরার সামনে সমস্ত জড়তা ভুলে ছেলেকে জড়িয়ে ধরে কেঁদে ফেলেন তিনি।
সেই সময় গুকেশের মা পদ্মা, পেশায় মাইক্রোবায়োলজিস্ট, হাজির থাকলে নিশ্চয় চোখের জল ধরে রাখতে পারতেন না! স্বামীর আচমকা সিদ্ধান্তে যে তিনিই সায় দিয়েছিলেন। জানিয়েছিলেন, কোনও অসুবিধে নেই। টাকাপয়সার কথা ভেবো না। আমি আছি।
২০১৮ সালে স্ত্রীর বরাভয় পেয়েই তো গুকেশকে নিয়ে বিশ্বভ্রমণে বেরিয়ে পড়েন রজনীকান্ত। কখনও সাংহাই, কখনও টোকিও। যখন যেখানে দাবা প্রতিযোগিতার আসর বসেছে, যোগ দিয়েছেন কিশোর গুকেশ। আর হলের বাইরে রুদ্ধশ্বাস অপেক্ষায় প্রতীক্ষা করে গিয়েছেন তাঁর বাবা রজনীকান্ত।
কেমন ছিল লড়াইয়ের দিনগুলো? ২০১৭ সাল। গুকেশের বয়স তখন মাত্র ১১ বছর। বুকে চৌষট্টি খোপের বেতাজ বাদশা হওয়ার খোয়াব, অথচ সংসারে আচমকা টানাটানি। গুকেশের কথায়, ‘আমরা খুব একটা বড়লোক কোনওদিনই ছিলাম না। তাই টাকাপয়সা নিয়ে মাঝেসাঝে সমস্যার মুখে পড়তে হয়েছে। গোড়ায় এতকিছু বুঝতাম না। কিন্তু ২০১৭-১৮ সাল নাগাদ পরিস্থিতি এমন হয় যে, ট্যুরের আয়োজনের জন্য বাবা-মায়ের বন্ধুদের থেকে টাকা ধার নিয়ে হচ্ছিল। বিলাসিতা যতটুকু ছিল, সব উবে যায়। কিন্তু সবচেয়ে বেশি ত্যাগ ও যন্ত্রণা যদি কেউ স্বীকার করে থাকেন, তিনি আমার বাবা।‘
ছেলের বক্তব্যে আজও চোখের পাতা ভিজে আসে রজনীকান্তের। বলেন, ‘শুরুতে শুরুতে যখন গুকেশ নিজের কেরিয়ার দাঁড় করাচ্ছে, আমি নিজের কাজ করার সময় পেতাম। শুধু সপ্তাহের শেষে টুর্নামেন্ট পড়লে ওর সঙ্গে যেতে হত। কিন্তু এরপর যখন রেটিং বাড়তে থাকল, বিদেশ থেকে ডাক এল, তখন আমাদের দুজনের মধ্যে একজনকে ত্যাগ স্বীকার করতেই হত। আমি সেই দায়িত্ব নিই। এগিয়ে আসি। অন্যদিকে আমার স্ত্রী সংসার সামলানোর ভূমিকা বেছে নেয়।‘
এরজন্য প্রবল আর্থিক বাধার মুখে পড়তে হয়েছে দম্পতিকে। রোজগারের টাকায় কুলোত না যখন, হাত পড়ত জমানো টাকায়। তা সত্ত্বেও পিছিয়ে আসেননি কেউই। কিন্তু কেন? কিসের জোরে এতকিছু সহ্য করে গেলেন?
রজনীকান্ত বলেন, ‘আমরা এতকিছু করছিলাম। কারণ গুকেশ গ্র্যান্ডমাস্টার হওয়ার খুব কাছাকাছি পৌঁছে যায়। তার উপর কোভিডের সময় টুর্নামেন্ট বন্ধ। ফলে আমি ও আমার স্ত্রী আবার নিজেদের পেশায় ফিরে টাকা রোজগার করে পরিস্থিতি কিছুটা হলেও বাগে আনি।‘
চন্দ্রকান্ত ও তাঁর স্ত্রী পদ্মা যন্ত্রণা ও অনিশ্চয়তার ভয়কে বাগে না আনলে হয়তো বছর আঠারোর দাবাড়ুর কাছে কিস্তিমাত খেতেন না কার্লসেন। নরওয়ের প্রকাণ্ড হলের বাইরে বাবাকে জড়িয়ে ধরে কাঁদছেন ডি গুকেশ… এমন স্মরণীয় মুহূর্তও কোনওদিন জন্ম নিত কি?