Date : 14th Apr, 2026 | Call 1800 452 567 | info@thewall.in
'বন্ধু' মোদীকে ফোন ট্রাম্পের! ৪০ মিনিট ধরে হরমুজ প্রণালী নিয়ে কী আলোচনা হল?লোকাল ট্রেনের টিকিটে বিরাট ছাড়! ৫ টাকার টিকিট এখন কত পড়বে? জেনে নিন বিস্তারিতTB Vaccine: যক্ষ্মা প্রতিরোধে কতটা সফল নতুন টিকা? ট্রায়ালের রিপোর্টে আশার আলোর পাশাপাশি উদ্বেগের সুর বিজ্ঞানীদের'বাঙালি ব্রিটিশদের সামনে মাথা নত করেনি, আর এই বহিরাগতরা আমাদের কী করবে?' বিজেপিকে তোপ অভিষেকেরসাইলেন্ট লাং ডিজিজ: কাশি মানেই কি ক্যানসার? দূষণে ফুঁসছে ফুসফুস, কখন দরকার ট্রান্সপ্লান্ট?'ইগো সরিয়ে রাখুন', নিজেদের মধ্যে মতভেদ সরিয়ে এক হয়ে লড়ার নির্দেশ অভিষেকেরভাইরাল ভিডিও হাতিয়ার করে শাহের তোপ! হুমায়ুনকে ‘দিদির এজেন্ট’ বলে কটাক্ষ স্বরাষ্ট্রমন্ত্রীরগরমে মেজাজ হারালেন কর্মীরা! চুঁচুড়ায় নিজের দলের লোকেদেরই বিক্ষোভের মুখে দেবাংশুবার্নল-বোরোলিন বিতর্ক, ‘লুম্পেনদের’ হুঁশিয়ারি দিয়ে বিপাকে ডিইও, কমিশনকে কড়া চিঠি ডেরেক ও’ব্রায়েনেরভাঁড়ে মা ভবানী! ঘটা করে বৈঠক ডেকে সেরেনা হোটেলের বিলই মেটাতে পারল না 'শান্তি দূত' পাকিস্তান

‘এভাবেই’ ফিরে আসা যায়! কীভাবে ঘন জঙ্গলের মতো চক্রব্যূহ ফেঁদে কার্লসেনকে কিস্তিমাত গুকেশের?

ক্লাসিকাল দাবায় অপ্রতিরোধ্য ম্যাগনাস কার্লসন বরাবরের মতো এবারের চ্যাম্পিয়নশিপও শুরু করেছিলেন স্বভাবসিদ্ধ সিজারিয়ান মহিমায়। প্রথমার্ধে গুকেশ খড়কুটোর মতন উড়ে গেলেও দ্বিতীয়ার্ধে ফিরে আসেন নতুন এক স্ট্র‍্যাটেজি নিয়ে।

‘এভাবেই’ ফিরে আসা যায়! কীভাবে ঘন জঙ্গলের মতো চক্রব্যূহ ফেঁদে কার্লসেনকে কিস্তিমাত গুকেশের?

গ্রাফিক্স: শুভ্র শর্ভিন

শেষ আপডেট: 4 June 2025 11:37

স্যমন্তক মিশ্র


‘বোর্ডের যা অবস্থা দাঁড়ায় তাতে ১০০ বারের মধ্যে ৯৯ বারই আমার হারার কথা! কিন্তু আজ ভাগ্য সঙ্গে ছিল।’

নরওয়ের আন্তর্জাতিক দাবায় প্রাক্তন বিশ্বসেরা ম্যাগনাস কার্লসেনকে হারানোর পর সাংবাদিকদের প্রশ্নের জবাবে এভাবেই নিজের জয় ব্যাখ্যা করেন ডি গুকেশ। সদ্য আঠারোয় পা রাখা দাবা-প্রতিভা এর আগে প্রতিবার কার্লসেনের কাছে হেরেছেন। এবার জিতলেন। জিতে পয়মন্ত ভাগ্যের কথা টানলেন।

কিন্তু সত্যি কি তাই? শুধুই নিয়তির ফাঁদে বন্দি হলেন কার্লসেন? গুকেশের দেওয়া চাল, সংযমী প্রতীক্ষা কিংবা নিশ্ছিদ্র রণকৌশলের কি কোনও মূল্য নেই?

ক্লাসিকাল দাবায় অপ্রতিরোধ্য ম্যাগনাস কার্লসন বরাবরের মতো এবারের চ্যাম্পিয়নশিপও শুরু করেছিলেন স্বভাবসিদ্ধ সিজারিয়ান মহিমায়। প্রথমার্ধে গুকেশ খড়কুটোর মতন উড়ে গেলেও দ্বিতীয়ার্ধে ফিরে আসেন নতুন এক স্ট্র‍্যাটেজি নিয়ে।

প্রাক্তন বিশ্বচ্যাম্পিয়ন মিখাইল তাল তাঁর খেলার শৈলী বোঝাতে এক গহীন, ঘন অরণ্যের উপমা দেন। এমন গভীর জঙ্গল তিনি তাঁর প্রতিদ্বন্দ্বীর সামনে রচনা করেন, যার সীমানার মধ্যে যুক্তির সোপান তাসের ঘরের মতন ভেঙে পড়ে। সম্ভাবনার অন্তহীন চক্রের মধ্যে প্রতিপক্ষ হারিয়ে ফেলে তার স্বাভাবিক ছন্দ, যুক্তির বিন্যাস।

ম্যাগনাসের বিরুদ্ধে গুকেশ দ্বিতীয়ার্ধে যেভাবে খেলেছেন, তা দেখে কোথাও যেন মিখাইল তালের এই দর্শনের আভাস পাওয়া যায়! চিনা মার্শাল আর্ট ‘তাই-চি’ ও কুংফুর দর্শন বলে: শক্তির মোকাবিলা শক্তি দিয়ে করা অনুচিত। যুদ্ধজয়ে জরুরি—সঠিক টাইমিং ও মোমেন্টাম। যা একজন মার্শাল আর্টিস্ট প্রতিদ্বন্দ্বীর থেকে গ্রহণ করে তাঁর বিরুদ্ধেই কাজে লাগাতে পারেন।

গুকেশ জানতেন ম্যাগনাস অপ্রতিরোধ্য। তাই তাঁকে সরাসরি টক্কর দেওয়ার রাস্তায় হাঁটেননি। বরং, ম্যাগনাসের স্টাইলকে তাঁরই বিরুদ্ধে প্রয়োগ করার নাগাড়ে চেষ্টা চালিয়েছেন। খেলায় মুহুর্মুহু তৈরি করেছেন সম্ভাবনার অন্তর্জাল, যাকে ভেদ করে বেরিয়ে আসা ম্যাগনাসের পক্ষে একসময় শুধু ‘দুরূহ’ নয়, হয়ে ওঠে ‘দুষ্কর’! আর এভাবেই শুধু দ্বৈরথের টেবিলে নয়, দাবার জগতেও জন্ম নেয় ইতিহাস!

রুই লোপেজ ওপেনিং দিয়ে খেলা শুরু করেন গুকেশ। যার বিরুদ্ধে ম্যাগনাস দাঁড় করান বার্লিন ডিফেন্স। অভিজ্ঞতা ও সাফল্যের নিরিখে ম্যাগনাস ওপেনিংয়ে অনেকটাই এগিয়ে ছিলেন। ছ'বছর আগে ওয়ার্ল্ড ব্লিটজ চ্যাম্পিয়নশিপে হিকারু নাকামুরার বিরুদ্ধে তিনি এই ওপেনিংয়েই সফল হন। বিশপ বি৬-এর মাধ্যমে মাগনাস যখন খেলাকে এক নতুন দিকে মোড় দিলেন, গুকেশ সম্পূর্ণত ভরসা রাখলেন গতিশীলতা এবং সেন্টার ডোমিনেশনের উপর।

মডার্ন ওপেনিংয়ের নিয়ম মেনে ম্যাগনাস গুকেশকে সুযোগ দেন সেন্টার ডমিনেশনের। যাতে মিডল গেমে ক্রমাগত সেই সেন্টারে আঘাত হেনে তিনি স্ট্রাকচারাল উইকনেস তৈরি করতে পারেন। খেলা যত মিডল গেমের দিকে এগোতে থাকে, ম্যাগনাস তাঁর পূর্বসূরি হোসে রাউল কাপাব্লাঙ্কার মতো নিপুণ হাতে গোটাতে থাকেন লাটাই!

একটা সময় মনে হচ্ছিল, গুকেশ ম্যাগনাসের চিরাচরিত নাগপাশে ফের একবার অষ্টেপৃষ্ঠে জড়িয়ে পড়েছেন! এদিকে ঘড়ির কাঁটাও এগিয়ে চলেছে। সময় সীমিত। যেখান থেকে তিনি পরিত্রাণের মরিয়া চেষ্টা চালিয়ে চালাতে থাকেন!

আর ঠিক সেই সময় দাবার বোর্ডে ঘটে যায় এক বিপরীত সমীকরণ। ম্যাগনাস বুঝছিলেন, জয় তাঁর নাগালে। কোনোরকম ঝুঁকি না নিয়ে তিনি তাই মেশিনের মতো নিখুঁতভাবে গুকেশের প্রতিটি চালের বিষদাঁত ভাঙতে শুরু করেন। আর দ্বৈরথের সেই তুঙ্গ মুহূর্তে গুকেশ তাঁর গিয়ার বদলে ফেলেন। জি৩ নাইট, যা এতক্ষণ ধরে সেন্টার স্ট্রাকচার রক্ষায় গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা নিচ্ছিল, তাকে বিসর্জন দেন। আর এর ফলে খেলায় আচমকা নতুন সম্ভাবনার জটিলতা দানা বাঁধে!

ম্যাগনাস পোড় খাওয়া দাবাড়ু। অত্যন্ত সতর্কভাবে তিনি গুকেশের বাড়ানো প্রলোভন প্রত্যাখ্যান করেন। আর জয়কে আরও নিশ্চিত করতে সেন্টারের উপর তাঁর গুটির প্রভাব বাড়াতে শুরু করেন। খেলা যত এন্ডগেমের দিকে এগিয়ে যায়, ম্যাগনাস তাঁর সেন্টার পন-কে সামনে রেখে গড়ে তোলেন সুনিশ্চিত জয়ের স্ট্রাটেজি। লক্ষ্য একটাই: ক্রমাগত সামনে এগোনো… পন প্রমোশন পদ্ধতিতে এতক্ষণ অন্ধকারে থাকা জয়ের  নিশান খুঁজে পাওয়া।

এই রণকৌশলের পরিণতি গুকেশ খুব ভালভাবে অনুধাবন করে ফেলেছিলেন। অথচ ম্যাগনাস তার আন্দাজটুকু পাননি। তাই এন্ডগেম শুরুর পরই গুকেশের চেনা ফাঁদে নিজের অজান্তেই পা দিয়ে ফেলেন। খেলার নির্ণায়ক মুহূর্তে ম্যাগনাস গুকেশের হাতে ই-৪ (e4) স্কোয়ারের নিয়ন্ত্রণ তুলে দেন। যার জেরে গুকেশের নাইট একটি সেন্টিলাইজড পজিশনে বসার সুযোগ পেয়ে ম্যাগনাসের রাজাকে সেন্টার থেকে বিচ্ছিন্ন করে ফেলে! ম্যাগনাস নিজের নাইট স্যাক্রিফাইস করে সেন্টার পনের মাধ্যমে খেলাকে নিজের নিয়ন্ত্রণে আনার এক অভিনব রণচাতুর্য ও সৃষ্টিশীলতা দেখালেও গুকেশ ও তাঁর অপ্রতিরোধ্য নাইট শেষ পর্যন্ত ম্যাগনাসের এই এন্ডগেম স্ট্র‍্যাটেজিকে নির্বিষ করে ফেলে! জেতার পথ ম্যাগনাস দেখেছিলেন ঠিকই। তবে গুকেশ তা দেখে ফেলেন আরও এক ধাপ এগিয়ে।

আর এই কারণেই ম্যাচ শেষে গুকেশ ৯৯ শতাংশ পরাজয় আর সুপ্রসন্ন ভাগ্যের কথা তুলেছেন। কিন্তু একজন বিশ্লেষকের জায়গা থেকে দেখলে যেটা খুব পরিষ্কার, সেটা হল: খেলার গুরুত্বপূর্ণ পর্ব থেকেই ডি গুকেশ নির্দিষ্ট সময়ের মধ্যে ক্রমাগত তাঁর সমস্ত সেরা মুভ খুঁজে পেয়েছেন। চাপের মুখে গুকেশের সৃষ্টিশীলতা, পরিস্থিতির সঙ্গে যুঝে চলার জেদ অনেকটাই ম্লান করেছে কার্লসেনের চিরাচরিত আধিপত্য। এর ফলেই লড়াইয়ের নির্ণায়ক মুহূর্তে এন্ডগেমের অধীশ্বর হয়েও ম্যাগনাস ব্লান্ডার করে বসেন!

গভীর ঘন অরণ্য থেকে অক্ষত, অজেয় বীর হিসেবে একজনই বেরোতে পারতেন। দিনটা ছিল গুকেশের। তাই তিনিই ব্যূহ ভেদ করে সেরার শিরোপা মাথায় বেরিয়ে এসেছেন।


```