সবাই জানে বিরাট-ই ট্রাম্পকার্ড। তিনিই গেমচেঞ্জার। ফাইনালে উঠেও ট্রফি অধরা থাকলে, সেমিফাইনাল ডিঙিয়ে ফাইনালের সিঁড়ি ফসকালে ছোট্ট অথচ গুরুতর ফাঁকটি ভরাট করবেন একজন… তিনি বিরাট কোহলি।

বিরাট কোহলি
শেষ আপডেট: 4 June 2025 11:23
দ্য ওয়াল ব্যুরো: ম্যাচ তখন খাতায়-কলমে শেষ হয়নি। কিন্তু ভবিতব্য নির্ধারিত। অষ্টাদশ এডিশনের আইপিএল জিততে চলেছে রয়্যাল চ্যালেঞ্জার্স বেঙ্গালুরু। প্রথমবারের জন্য।
বাইশ গজে বল হাতে জশ হেজলউড। থেকে থেকে অস্ট্রেলীয় পেসারের পিঠ চাপড়ে যাচ্ছেন রজত পাটিদার। উইকেটের পেছনে দাঁড়িয়ে দলকে চাঙ্গা করে চলেছেন জিতেশ শর্মা।
এতকিছুর মধ্যে বিরাট কই?
প্রশ্নটা সবে জাগতে শুরু করেছে, ঠিক তখনই ক্যামেরাম্যানের লেন্স তাক করল বাউন্ডারি লাইন। দড়ির পেছনে জনগর্জন। সামনে দাঁড়িয়ে বিরাট কোহলি। মাথাটা একটু ঝুঁকল। পরক্ষণে তুলে ফেললেন। আর নজরে এল ভিজে যাওয়া চোখের পাতা। অকম্পিত মুখ। ভেতরে অনুভূতির বারুদ ততক্ষণে ফেটে পড়েছে। বোঝা যাচ্ছে, কোনওমতে আবেগের উচ্ছ্বাস চেপে নিজেকে সামলে রেখেছেন।
শেষ বল অর্থহীনভাবে বাউন্ডারির বাইরে যেতেই মাটিতে হাঁটু মুড়ে বসে পড়লেন বিরাট। শরীর কাঁপছে। দু’হাত ধরে চেপে রেখেছেন মুখ। ছুটে আসলেন সতীর্থরা। জড়িয়ে ধরলেন। হৃদয়চাপা কান্না বদলে গেল প্রাণখোলা হাসিতে। বেদনা… উচ্ছ্বাসে!
এক বছর, দু’বছর নয়। দীর্ঘ আঠারো বছর পরিশ্রম আর সংযমের ফসল এই ট্রফি। লড়াই পরাক্রমী প্রতিপক্ষের বিরুদ্ধে, লড়াই নিজেরও বিরুদ্ধে! কেরিয়ারের বসন্ত যখন, দু’হাতে খুলে রান করছেন, ক্রিকেটের সমস্ত ফর্ম্যাটে অপ্রতিরোধ্য হয়ে উঠছেন তিনি, তখন নিলামে টাকার পাহাড় নিয়ে হাজির হয় হরেক ফ্র্যাঞ্চাইজি। প্রতি বছর।
সবাই জানে বিরাট-ই ট্রাম্পকার্ড। তিনিই গেমচেঞ্জার। ফাইনালে উঠেও ট্রফি অধরা থাকলে, সেমিফাইনাল ডিঙিয়ে ফাইনালের সিঁড়ি ফসকালে ছোট্ট অথচ গুরুতর ফাঁকটি ভরাট করবেন একজন… তিনি বিরাট কোহলি।
চাইলেই অন্য দলে যেতে পারতেন। চাইলেই পারতেন নামের পাশে ‘সফলতম’ তকমা আরও সহজে লাগিয়ে নিতে। কী নেই কেরিয়ার ক্যাবিনেটে? ওয়ান ডে, টি-২০ মিলয়ে দু’দুটো বিশ্বকাপ, দুটো চ্যাম্পিয়ন্স ট্রফি, বিদেশের মাটিতে সিরিজ জয়, বর্ষসেরা ক্রিকেটারের তকমা, র্যাঙ্কিংয়ে শীর্ষ দখল—একজন বিশ্বমানের ক্রিকেটারের ‘কিংবদন্তি’ হওয়ার জন্য যে যে ধাপ পার করা জরুরি, সেই সমস্ত স্তর পেরিয়ে এসেছেন বিরাট। এতদিন অধরা ছিল আইপিএল। ইচ্ছে করলেই অন্য যে কোনও শক্তিশালী দলে নাম লিখিয়ে খেতাব জিততে পারতেন।
কিন্তু বিরাট তা করেননি। তিনি বিশ্বস্ত থেকেছেন। জার্সি বদালাননি। কোনও বছর দল ধরাশায়ী হয়েছে, শুরু থেকেই জঘন্য পারফর্ম করেছে। কোনও বছর অল্পের জন্য সুযোগ হাতছাড়া হয়েছে। তিন বছর ফাইনালে উঠেও খালি হাতে ফিরেছেন। কিন্তু চিন্নাস্বামী স্টেডিয়াম ফাঁকা থাকেনি। প্রতিপক্ষ শিবিরের সমর্থকদের বিদ্রূপ, টিটকিরি সহ্য করেও টিকিট কেটেছেন, জার্সি কিনেছেন অনুরাগীরা। টাঙিয়েছেন ফেস্টুন, ঝুলিয়েছেন টিফো। প্রতি বছর ব্যর্থতা, হতাশা, কান্না। তবু ‘এ বছর কাপ আমাদের’ স্লোগানে এতটুকু চিড় ধরেনি, কোহলি কাট আউট এতটুকু মলিন হয়নি।
আঠারো বছরের আগল ভেঙে, যন্ত্রণা মুছে যখন ট্রফি হাতে হই হই করে গ্যালারির দিকে ছুটে গেলেন বিরাট, তখন আমদাবাদ স্টেডিয়ামের চতুর্দিক জুড়ে ক্রমশ জোরাল হচ্ছে ‘আরসিবি আরসিবি’ স্লোগান। দলের সোশ্যাল মিডিয়া পেজও অবরুদ্ধ আবেগ সংযমী ভঙ্গিমায় লিখে জানায়: ‘এটা ভাগ্যের জোরে হয়নি। আঠারো বছরের বিশ্বস্ততার প্রতিদান চোকানো হল মাত্র।‘
আর কোহলি? স্টেডিয়াম-থরথর নিনাদ সামলে অল্প কথায় জানালেন, ‘দলকে সর্বস্ব দিয়েছি। আমার যৌবন, আমার সেরা সময়, আমার অভিজ্ঞতা।‘
তবে শ্রেষ্ঠ মুহূর্ত ধরা থাকল গতকাল। একবার ম্যাচের শেষে, যখন তিনি হাঁটু মুড়ে কান্নায় ভেঙে পড়েছেন। আরেক বার উৎসবের মঞ্চে। যখন যুদ্ধজয়ী রাজার মতো দু’হাতে ট্রফি মেলে ধরেছেন। দু’চোখ বেয়ে তখন কান্নার জল নয়, গড়িয়ে পড়ছে গৌরবের আনন্দ, ঠিকরচ্ছে সাফল্যের আলো।