২০২৫ সাল আপাতত ইউরোপের ময়দানজুড়ে স্বপ্নপূরণের উতল হাওয়া চারিয়ে দিয়েছে। একের পর এক দল—কেউ লিগ টেবিলে ‘বামন’, বহু বহু বছর খেতাব জয়ের দূরতম প্রচ্ছায়ায় ছিল না, ঘরে কাপ এনেছে।

গ্রাফিক্স: দিব্যেন্দু দাস
শেষ আপডেট: 6 June 2025 09:51
দ্য ওয়াল ব্যুরো: ২০২৫ সাল আপাতত ইউরোপের ময়দানজুড়ে স্বপ্নপূরণের উতল হাওয়া চারিয়ে দিয়েছে। একের পর এক দল—কেউ লিগ টেবিলে ‘বামন’, বহু বহু বছর খেতাব জয়ের দূরতম প্রচ্ছায়ায় ছিল না, ঘরে কাপ এনেছে। এমন অনেক ‘দৈত্য’ ক্লাব, যাদের বিত্তবান মালিক টিমের পেছনে কাঁড়ি কাঁড়ি টাকা ঢেলেছে, অথচ পরম কামনার খেতাব ঘরে আনেনি, অবশেষে শেষ হাসি হেসেছে!
ক্রিকেটে যেমন আরসিবি, ১৮ বছর বাদে অবশেষে আইপিএল জিতল যারা, ফুটবলের ময়দানে তেমন টটেনহ্যাম। অপেক্ষাপূরণ হতে সময় লাগল ১৭ বছর! একদিকে বিরাট, অন্যদিকে হ্যারি কেন! কোহলি তবু বিশ্বকাপ, চ্যাম্পিয়নস ট্রফির মতো খেতাব জিতেছেন। কিন্তু হ্যারি কেন, বিশ্বফুটবলের সাম্প্রতিক প্রজন্মের অন্যতম রংদার স্ট্রাইকার, এ বছরের আগে একটিও ট্রফি জেতেননি!
এক নজরে দেখে নেওয়া যাক আরসিবি ছাড়া ছোট-বড় মিলিয়ে কোন কোন দল এবং খেলোয়াড় তাদের ইচ্ছেপূরণ করল!
১. পিএসজি: ফরাসি ফুটবল ক্লাব। ঘরোয়া লিগ বরাবর দুধ-ভাত। কিন্তু ইউরোপের মঞ্চে শিকে ছেঁড়েনি। সর্বোচ্চ সম্মান চ্যাম্পিয়নস লিগ… সেটার নাগাল জোটেনি। দলে তারকা এসেছেন, তারকা গিয়েছেন। কিন্তু ভাগ্যলক্ষ্মী সদয় হননি। ২০১১ সালে কাতারের ধনকুবের গোষ্ঠী ক্লাবের মালিকানালাভের পর পরিস্থিতি বদলের চেষ্টা চালান। কিন্তু বিপুল বিনিয়োগ সত্ত্বেও ঘরোয়া মঞ্চে বনের বাঘ আর ইউরোপে ভীতু শেয়াল হয়েই জার্নি খতম করত পিএসজি। প্রতি সিজনে একই গল্প। মেসি, ডি মারিয়া, ইব্রাহিমোভিচ, এমবাপে… কেউ পারেননি ছবিটা পাল্টাতে!

গল্পটা বদলে দিলেন লুই এনরিকে। এর আগে বার্সেলোনার গদিতে বসে দলকে চ্যাম্পিয়ন্স লিগ জিতিয়েছিলেন। কিন্তু তেতো সত্যিটা হচ্ছে, ওই দল ছিল পেপ গোয়ার্দিওলার হাতে গড়া। পিএসজিতে এসে এনরিকেকে সবকিছু শূন্য থেকে শুরু করতে হয়েছে। তরুণ ফুটবলারদের বেছে বেছে টিম বানিয়েছেন। শিবির বদলে রিয়ালে গিয়েছেন কিলিয়ান এমবাপের মতো সুপারস্টার। তবু ইউরোপে প্যারিসের জয়ধ্বজা উড়েছে। অবশেষে! একপেশে ফাইনালে ৫-০ গোলে ইন্টার মিলানকে দুরমুশ করে চ্যাম্পিয়নস লিগ জিতেছে পিএসজি। ইতিহাসে প্রথমবার!
২. হ্যারি কেন: টটেনহ্যাম হটসপারে যখন খেলতেন, গাদা গাদা গোল করতেন। ইংল্যান্ডের জার্সিতেও একই ছবি। কিন্তু তাতেও না দেশ, না ক্লাব—কারও হয়ে ‘মিকি মাউস টুর্নামেন্ট’ পর্যন্ত জেতেননি হ্যারি কেন। ইউরোর ফাইনালে উঠেছেন, চ্যাম্পিয়নস লিগের রানার্স আপ হয়েছেন, প্রিমিয়ার লিগ শেষ করেছেন লেস্টার সিটির পরে… কিছুতেই পয়লা নম্বর আসনটি পাকা হচ্ছিল না।
পাকা করতে গেল বছর চলে আসেন বায়ার্ন মিউনিখে। সবাই ভেবেছিল: এবার আর কেউ জিতুক চায় না জিতুক, হ্যারির হাতে ট্রফি উঠবে। কারণ বুন্দেশলিগা জেতা বায়ার্নের বাঁহাতের খেল! গত ১১ মরশুমে ১১বার-ই খেতাব জিতেছে জার্মানির সর্বকালের সেরা ক্লাব।

কিন্তু বিধি বাম! গতবারই ফিনিক্স পাখি হয়ে ওঠে বায়ার্ন লেভারকুসেন। বায়ার্ন মিউনিখের মৌরসিপাট্টায় থাবা বসায়। জিতে নেয় ঘরোয়া লিগ। এমনকি ঘরোয়া কাপও। চ্যাম্পিয়নস লিগ থেকেও অর্ধচন্দ্র খেতে হয়।
এ বছর আশ মিটেছে হ্যারির। জিতেছেন বুন্দেশলিগা। বায়ার্নে আসা সার্থক। জীবনের প্রথম খেতাব বলে কথা!
৩. নিউক্যাসল ইউনাইটেড: ১৯৫৫ সাল। ওই বছরই শেষ কোনও মেজর খেতাব (এফএ কাপ) জিতেছিল ইংল্যান্ডের ঐতিহাসিক ক্লাব নিউক্যাসল। তারপর অ্যলান শিয়ারারের মতো তারকা, ববি রবসনের মতো কোচও ভাগ্য ফেরাতে পারেননি। চলতি সিজনে সেই গেরো কেটেছে। ৭০ বছরের প্রতীক্ষা শেষ! লিভারপুলকে ফাইনালে ২-১ গোলে হারিয়ে লিগ কাপ জিতেছে ‘ম্যাগপাই’রা!

৪. ক্রিস্টাল প্যালেস: নিউক্যাসল তবু প্রিমিয়ার লিগের উপরের সারির দল। ক্রিস্টাল প্যালেস মোটামুটি প্রতি মরশুমেই অবনমন এড়ানোর লড়াইয়ে থাকে। তারাও এ বছর খেতাব জিতেছে। তাও যে সে ট্রফি নয়—ইংল্যান্ডের বনেদি টুর্নামেন্ট এফএ কাপ। সেটাও ঐতিহাসিক ওয়েম্বলি স্টেডিয়ামে, পেপ গোয়ার্দেওলার ম্যাঞ্চেস্টার সিটির বিরুদ্ধে! এর আগে একই প্রতিযোগিতার ফাইনালে দু’দুবার (১৯৯০, ২০১৬) উঠেছিল প্যালেস। কিন্তু প্রতিবার খালি হাতে ফিরতে হয়েছে। এবছর অন্য ছবি। ইতিহাসে প্রথমবার এফএ কাপ জিতে নিল লন্ডনের ক্লাব!

৫. টটেনহ্যাম হটস্পার: আরসিবির চেয়ে এক বছর কম… ১৭ বছরের অপেক্ষা সহ্য করেছে টটেনহ্যাম। জোসে মোরিনহো, অ্যান্তনিও কন্তে কেউ পারেননি ক্লাবকে সাফল্য এনে দিতে। অসাধ্যসাধনটি করলেন তুলনায় ম্রিয়মান ম্যানেজার অ্যাঞ্জ পস্তেকগলু। ‘আমি বরাবর দ্বিতীয় মরশুমে ট্রফি জিতি’—উচ্চারণ করে ক্লাব সমর্থকদের স্বপ্ন দেখান।

সেই স্বপ্ন রেখেছেন ইউরোপা লিগ জিতে। হারিয়েছেন ম্যাঞ্চেস্টার ইউনাইটেডকে। এত আলোর আড়ালে চলে গিয়েছে প্রিমিয়ার লিগ ১৭ নম্বরে শেষ করার লজ্জার রেকর্ড! কিন্তু ক্লাব সমর্থকেরা আপাতত সেসব নিয়ে ভাবতে নারাজ। আর্সেনালের আগে ইউরোপীয় খেতাব জয় আনন্দকে কয়েক গুণ বাড়িয়ে তুলেছে বৈকী!