দুনিয়ার সেরা হওয়ার পর আরও উন্নতির খিদে—এই দুইয়ের তালমিলই এখন গুকেশের পরীক্ষার ময়দান। আর সেই লড়াইয়ের মধ্যেই লুকিয়ে তাঁর পুনর্জন্মের ইঙ্গিত।
.jpeg.webp)
গ্রাফিক্স: দিব্যেন্দু দাস
শেষ আপডেট: 9 November 2025 13:40
দ্য ওয়াল ব্যুরো: বিশ্বজয়ের বছরপূর্তির আবহে যেন অনেকটাই ক্লান্ত দেখাচ্ছে দোম্মারাজু গুকেশকে। গেলবছর বিশ্বচ্যাম্পিয়ন হওয়ার পর চলতি মরশুমে তাঁকে বারবার থমকে যেতে দেখা গেছে। কোথাও লিড নিয়ে পিছলে যাওয়া, কোথাও অচেনা প্রতিপক্ষের কাছে হোঁচট খাওয়া—তরুণ প্রতিভার এই ওঠানামা নিয়ে প্রশ্নও কম নয়। ঠিক কী হচ্ছে গুকেশের (D Gukesh) সঙ্গে? মানসিক ক্লান্তি, না চাপের ভারে জড়তা?
সমস্ত সওয়ালের জবাব দিলেন তাঁর দীর্ঘদিনের কোচ গ্রেজেগর্জ গায়েভস্কি (Grzegorz Gajewski)। ভারতীয় এই তরুণ দাবাড়ুকে বিশ্বচ্যাম্পিয়নের আসনে বসানোর পেছনে যাঁর ভূমিকা ছিল সবচেয়ে বড়, তিনিই অনুদ্বিগ্ন মেজাজে বলছেন: ‘এটা এক ধরনের ট্রানজিশনাল ফেজ!’ এরপর জুড়ে দিয়েছেন, ‘কেউ যখন সারাজীবন একটা লক্ষ্য অর্জনের জন্য খেটে যায়, আর একদিন সেই লক্ষ্য ছুঁয়ে ফেলে, তখন হঠাৎ করে একধরনের শূন্যতা তৈরি হয়। নতুন প্রেরণা খুঁজে পাওয়া কঠিন হয়ে যায়। গুকেশ এখন সেই জায়গায় দাঁড়িয়ে!’
গায়েভস্কির কথায়, ‘আমরা ভুলে যাই, গুকেশ এখন কেবল ১৯। প্রতিযোগিতাটা ভয়ানক। অন্যরাও সমান আগ্রহ নিয়ে কাজ করছে। সবাই তাঁকে হারানোর জন্য তৈরি। সে সবসময় জিতবে—এমন ভাবা অযৌক্তিক।’
এই কথাগুলিই বুঝিয়ে দেয়, কীভাবে গুকেশের মনে চলছে এক অদৃশ্য রূপান্তর, ভাঙাগড়া। বিশ্বচ্যাম্পিয়ন হওয়ার পর থেকে যেভাবে প্রত্যাশা আর মিডিয়ার আলো তাঁর উপর পড়েছে, তাতে চাপ বেড়েছে অনেকটাই।
গত কয়েক মাসে গুকেশকে দেখা গিয়েছে বিভিন্ন ফর্ম্যাটে—ক্লাসিক্যাল, র্যাপিড, ব্লিটজ, এমনকি ফ্রিস্টাইলেও। অনেকেই মনে করছেন, এটাই তাঁর ফোকাসে ব্যাঘাত ঘটাচ্ছে। কিন্তু গায়েভস্কি তেমনটা মানতে নারাজ। বলেছেন, ‘এটা কোনও নতুন পরিবর্তন নয়। আগেও ও প্রচুর খেলত। এখন শুধু টুর্নামেন্টের ধরন পালটেছে। বড় ক্লোজড ইভেন্টে সুযোগ মিলছে, আমন্ত্রণ আসছে। তাছাড়া র্যাপিড-ব্লিটজেও উন্নতি করলে ক্লাসিক্যাল খেলায় সুবিধা। কারণ সময়ের চাপে সিদ্ধান্ত নেওয়ার দক্ষতা বাড়ে!’
যদিও কোচের স্বীকারোক্তি, গুকেশের আক্রমণাত্মক খেলার সঙ্গে ‘গ্রাইন্ডিং’ বা দীর্ঘ কৌশলগত লড়াইয়ের অভ্যেস এখনো ততটা তৈরি হয়নি। সেটাই এখন কাজের মূল দিক।
এ বছর গুকেশের সময়টা মোটেই সহজ ছিল না। টাটা স্টিল টুর্নামেন্টে (Tata Steel Chess) শিরোপার কাছাকাছি পৌঁছে থেমে যাওয়া, আবার বিশ্বকাপে (FIDE World Cup) তৃতীয় রাউন্ডে ফ্রেডেরিক ভানের (Frederik Svane) কাছে হেরে বিদায় তৈরি করেছে প্রশ্ন, ‘চ্যাম্পিয়ন তাঁর ফর্ম কোথায় হারালেন?’
যদিও কোচের যুক্তি, এটা মানসিক রিসেটের সময়। বলেন, ‘এখনও ও-র মধ্যে প্রচুর শক্তি, প্রচুর খিদে! কিন্তু একটা লক্ষ্য পূরণ হয়ে গেলে মস্তিষ্ককে নতুনভাবে সাজাতে হয়। এটাকে আমরা মানসিক পুনর্গঠন বলি!’ গায়েভস্কি জানালেন, গুকেশ ভ্রমণের ক্লান্তি, জেট ল্যাগ সব সামলে নিজের রুটিন নিয়ে খুব সচেতন। ঘুম, ডায়েট, ট্রেনিং—সবই পরিকল্পিত। কিন্তু আত্মপ্রত্যয়ের জ্বালানিটা আগের মতো জ্বলছে না। ‘ওর ভেতরে এখন একধরনের ভারসাম্য খোঁজ চলছে!’ মন্তব্য কোচের।
গুকেশ এখন আর তরুণ চ্যালেঞ্জার নন, বিশ্বচ্যাম্পিয়ন। তাই প্রতিপক্ষের আচরণও পালটেছে। আগে যাঁরা ঝুঁকি নিতেন, এখন তাঁরা সাবধানে খেলছেন। সুযোগ কমছে। ফলে গুকেশকেই ঝুঁকি নিতে হচ্ছে আর সেখানেই বাড়ছে ভুলের সম্ভাবনা। ‘এখন ওর বিরুদ্ধে কেউই হালকা খেলতে চায় না!’ গায়েভস্কি বলেন। জুড়ে দেন, ‘সবাই ওর প্রতি সম্মান দেখাচ্ছে। এই পরিস্থিতিতে শান্ত থেকে নিজের ছন্দ খুঁজে পাওয়া সবচেয়ে কঠিন!’
তবে কোচ আশাবাদী। তাঁর বিশ্বাস, গ্রিসের ইউরোপিয়ান ক্লাব কাপে (European Club Cup) ভারতীয় দাবাড়ুর সোনা জেতা—একটা টার্নিং পয়েন্ট। বলেছেন, ‘ওর ভিতরে আগুনটা এখনও আছে। সময় লাগছে শুধু দিকটা ফের ঠিক করতে!’ দুনিয়ার সেরা হওয়ার পর আরও উন্নতির খিদে—এই দুইয়ের তালমিলই এখন গুকেশের পরীক্ষার ময়দান। আর সেই লড়াইয়ের মধ্যেই লুকিয়ে তাঁর পুনর্জন্মের ইঙ্গিত।